১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চীন ও রাশিয়ার মনোভাব পাল্টাতে কূটনৈতিক তৎপরতা সরকারের


তৌহিদুর রহমান ॥ রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীন ও রাশিয়ার মনোভাব পরিবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এই সঙ্কট নিরসনে প্রথম দিকে ভারত নীরবতা পালন করলেও দেশটির মনোভাব এখন অনেকটাই বদলেছে। তবে রোহিঙ্গা সঙ্কটে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানায়।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চীন ও রাশিয়ার বিশেষ সহায়তা চায় বাংলাদেশ। এই দুটি রাষ্ট্রই বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। তবে মিয়ানমারের ওপর চীনের ব্যাপক প্রভাবের কারণেই দেশটির সহায়তা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। আর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে রাশিয়ার সমর্থন প্রত্যাশা করেছে সরকার।

২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিসংতার জের ধরে বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা নাগরিক অনুপ্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আকাশসীমাও লঙ্ঘন করে মিয়ানমার। এরপরেই ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াংকের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারকরা বিষয়টি নিয়ে দুই দফা বৈঠক করেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরে চীনের সহায়তা চাওয়া হয়। চীনের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে বেজিংকে বিস্তারিত জানাবেন বলেও আশ্বাস দেন।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে চীনের সহায়তা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। তবে সরকারের কূটনৈতিক চেষ্টার অংশ হিসেবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হলে, চীন এ বিষয়ে নীরব থেকে কোন পক্ষেই যায়নি। এর আগে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনার সময় চীন বিরোধিতা করেছিল।

রাখাইনে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের জন্য প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের চলমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাশিয়ার কাছে পুরোপুরি ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। নিউইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লেভরভের সঙ্গে এক বৈঠকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাশিয়া যেন যুক্ত হয়, ঢাকা এই অনুরোধ করেছে। তবে রাশিয়া বলেছে, তারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখবে। তবে এই বৈঠকের আগেই রোহিঙ্গা সঙ্কট একেবারেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে জানিয়েছিল রাশিয়া। তারা বলেছিল, সার্বভৌম কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে তা বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে গোলযোগ ডেকে আনতে পারে। এটা বলে রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল রাশিয়া। তবে এই ইস্যুতে মস্কোর সঙ্গে ঢাকা কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সঙ্কটের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করেন। এই সফরের সময়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোরালোভাবে মোদির কোন অবস্থান না থাকায় বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা করা হয়। পরবর্তীতে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তা বাড়ানো হয়। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ও দুই দেশের মধ্যে গভীর সম্পর্কের জন্য এই ইস্যুতে দিল্লীর কাছে ঢাকার প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। দিল্লীও পরে এটি বুঝতে সক্ষম হয়েছে। সে কারণেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৩৬তম অধিবেশনে মিয়ানমারের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের ওপর আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত রাজিবকে চন্দর মিয়ানমারের রাখাইন সহিংসতার প্রেক্ষিতের বিপুলসংখ্যক নাগরিক প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সেখানে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমারের নিরপত্তা বাহিনীর একাধিক আপরেশনের জন্য অনেক সাধারণ মানুষ বহিরাগত হয়ে গেছে। তবে সেখানের সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরী। আমরা প্রত্যাশা করব, রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানের সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেবে মিয়ানমার সরকার। এছাড়া মিয়ানমারের রাখাইন সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনানের নেতৃত্বে আনান কমিশন বাস্তবায়নের সুপারিশ করে ভারত।

অবশ্য বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন করার প্রেক্ষিতে চিন্তিত নয় বলে ইতোমধ্যেই জানিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, এ বিষয়ে আমি খুব বেশি চিন্তিত নই। কেননা অনেক রাষ্ট্রই মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক রাখায় আগ্রহী। তারা উভয় দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে চলেছে, সামনের দিনেও চলবে। তবে সকল রাষ্ট্রই এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।

এদিকে রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রেক্ষিতে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় সফরের সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দল বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত নিধন চলছে। ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের নেতা এ্যানে মেইনের নেতৃত্বে দলটি গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরের পর জানিয়েছে, রাখাইনে যেটা ঘটেছে, সেটা নিঃসন্দেহে জাতিগত নিধন। এই নিধন বন্ধ করা প্রয়োজন। রাখাইন সীমান্তে মিয়ানমার যে ল্যান্ডমাইন বসিয়েছে, সেটা গভীর উদ্বেগজনক বলেও অভিমত প্রকাশ করেন তারা। এছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্যদূত রুশনারা আলীও ঢাকা সফরের সময় রোহিঙ্গা নির্যাতন বিরোধী বক্তব্য দিয়ে এই ইস্যুতে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন।

এর আগে লন্ডনে যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের দাবি তোলেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে বর্বরতা বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী আউং সান সুচিকে তার নৈতিক পুঁজির ওপর দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানান। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানিয়েছিলেন, রাখাইনে সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, এই নির্যাতন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এটা একটা জাতিকে নির্মূল করার চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি অবশ্যই থামাতে হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতে ফ্রান্সেরও অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় মিয়ানমারের প্রতি হুমকি কিংবা হুঁশিয়ারি না দিয়ে নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকারের প্রতি হুমকি কিংবা হুঁশিয়ারি নয়, প্রয়োজন নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। এছাড়া তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, সঙ্কট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: