১৯ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

আইএসআইর নীলনক্সায় রোহিঙ্গা ইস্যু তৈরি, ষড়যন্ত্রের অংশ


শংকর কুমার দে ॥ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের নীলনক্সা অনুযায়ী মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যুটি তৈরি করেছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তারা। পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারত ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার এক ছক কষা কৌশল। বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকারকে পরিবর্তন করতে চায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এজন্য আওয়ামী সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে তারা। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এ ধরনের তথ্য পেয়ে ঢাকার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে ঢাকার গোয়েন্দারা জানান, চীনের সঙ্গে ভারতের পুরনো বিরোধ ও মিয়ানমারের তেল-গ্যাস, খনিজ ব্যবসায় জড়িত স্বার্থ কাজে লাগিয়েছে আইএসআই। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সঙ্গে যোগাযোগ করে মিয়ানমারের পুলিশ, সেনা ক্যাম্প ও চৌকিতে হামলা চালিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তৈরি করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এ ধরনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারে গিয়ে স্টেট কাউন্সিলর আউং সান সুচির সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সময়ে হঠাৎ মিয়ানমার সফর নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি হলেও এর নেপথ্যে ছিল তাদের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দাদের কথা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রমতে, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন, ধর্ষণ, খুনের ঘটনা ঘটানোর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই গত ২৯ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর আউং সান সুচির সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমারে গিয়ে সুচির সঙ্গে দেখা করে কথা বলার বিষয়টি তখন সব মহলকেই বিস্মিত করে। ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সন্ত্রাসবাদবিরোধী নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে একমত হন তারা। এটা কেবল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের লড়াইয়ের জন্য নয়, ভারতের আশঙ্কা রোহিঙ্গাদের মধ্যে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ঢুকে পড়ার আশঙ্কা নিয়েও।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশই একযোগে কাজ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সুসম্পর্ক কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না পাকিস্তান ও তার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এটাকে সামনে রেখেই আইএসআই মিয়ানমারের রাখাইনে হামলার ছক কষে। এরই জেরে এখন বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ঢুকিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক করার চেষ্টা চলছে। অপরদিকে ভারতের ভুখ-ে রোহিঙ্গাদের ঢুকিয়ে তাদের মাধ্যমে সেনা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী, জঙ্গী সংগঠন আইএস জঙ্গী, লস্কর-ই-তৈয়বার মতো জঙ্গীদের ঢুকিয়ে নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব খবর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জানতে পেরে ভারত সরকারের টনক নড়ে। ভারত তখন থেকেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমার- দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখে রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে। এতে পাকিস্তান ও আইএসআই আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশ, ভারত, ও মিয়ানমার এ অঞ্চলে হুমকি মোকাবেলায় তথ্য আদান-প্রদানের দিকে এগোচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী হলেও সুফল বয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে জানতে পারে যে, আরাকানে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সামরিক শাখার প্রধান হাফিজ তোহা আইএসআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। আরসার সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে আইএসআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যাতে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা মারা যায়। আগস্টের শেষ সপ্তাহে তোহা ও আইএসআইয়ের মধ্যে ফোনালাপ হয়। ওই ফোনালাপে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আরসা সামরিক শাখার প্রধান হাফিজ তোহার আঁকা মূল মুজাহিদীন (এএমএম) প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর এ জঙ্গী নেতা পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নেয়। লস্কর-ই-তৈয়বা তাকে প্রশিক্ষণ দেয়। গত বছরের ৯ ও ১০ অক্টোবর এবং চলতি বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে হামলার পেছনে তোহার হাত রয়েছে। রাখাইন রাজ্য এবং বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের আঁকা মূল মুজাহিদীনে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে- এমন খবর ভারত পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ করে চট্টগ্রামের পার্বত্যাঞ্চলে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আইএসআইয়ের ব্রিগেডিয়ার আশফাক এবং মেজর সালামাত আরসা সামরিক শাখার প্রধান হাফিজ তোহার আঁকা মূল মুজাহিদীনকে (এএমএম) সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠন জেএমবিসহ জঙ্গী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে মদদ দিচ্ছে। ব্রিগেডিয়ার আশফাক বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির উগ্রপন্থী একাংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাতে ব্রিগেডিয়ার আশফাক লন্ডনে অবস্থানকারী বিএনপির কোন কোন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছে- এমন খবর খতিয়ে দেখছেন ঢাকার গোয়েন্দারা। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা চায় বিএনপি ক্ষমতায় আসুক। আইএসআই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জেএমবির যোগসূত্র স্থাপন করে এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যেই নীলনক্সা নিয়েই আইএসআই সামনে এগোচ্ছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: