১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, চালের দাম কমছে


জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির চাল আসতে থাকায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় চালের দাম কমতে শুরু করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে মজুদকৃত ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্দ করেছে। একই দিন গাজীপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে সাত চাল ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। চলমান চাল সঙ্কট সামাল দিতে সরকারী পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারীভাবেও চাল আমদানি শুরু হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই চালের বাজার স্বাভাবিক হবে বলে পাইকাররা জানিয়েছে।

এদিকে চালের বাজারে চলা দুঃসময়ের মধ্যেই নীলফামারীর কৃষকরা আগাম জাতের ধান কাটা শুরু করেছে। এই জেলায় এবার ৯০ হাজার মেট্রিক টন আগাম জাতের ধান উৎপাদন হবে বলে জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। জেলার গ্রামগুলোতে ধান ওঠানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। খবর স্টাফ রিপোর্টারের।

চট্টগ্রাম থেকে হাসান নাসির জানান, মজুদদারীর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আমদানির নতুন চাল আসতে থাকায় প্রতিদিনই কমছে চালের দাম। সঙ্কট সামাল দিতে সরকারী পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারীভাবেও চাল আমদানি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে ৭৭ হাজার টন চাল বোঝাই তিনটি জাহাজ। এছাড়া আরও চাল রয়েছে পাইপ লাইনে, যেগুলো আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ বাড়তে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই চালের বাজার স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এদিকে, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে গুদামে অবৈধভাবে মজুদকৃত ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্ধ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে ছিল ৩টি চালের জাহাজ। এর মধ্যে দুটি জাহাজে রয়েছে ৫১ হাজার টন সরকারী চাল। একটি জাহাজের খালাস কাজ প্রায় শেষ। বাকি জাহাজ থেকেও দ্রুততার সঙ্গে চাল খালাস করা হবে। উপজেলা পর্যায়ে খোলা বাজারে চাল বিক্রি শুরু হওয়ায় এগুলো গুদামজাত না করে সরাসরি পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া সাইলো জেটিতে রয়েছে ২৬ হাজার টন চালের আরেকটি জাহাজ। এগুলো আমদানি হয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে। বেসরকারী পর্যায়েও চাল আসছে।

খাদ্য অধিদফতর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক জহিরুল ইসলাম (সরবরাহ ও সংরক্ষণ) জনকণ্ঠকে জানান, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী খাতে যে পরিমাণ চাল আমদানি হচ্ছে তাতে করে অল্প সময়ের মধ্যে মূল্য পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম থেকে জি টু জি ভিত্তিতে যে ৩ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে সর্বশেষ দুটি চালান এখন চট্টগ্রাম বন্দরে। এগুলোর খালাস কাজ চলছে । সরকার মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া সঙ্কট বিবেচনায় বেসরকারী আমদানিকারকরাও চাল আনছেন। চাল আমদানির ওপর থেকে শুল্ক হার তুলে দেয়ায় আমদানিকারকরা উৎসাহিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম জানান, বর্তমানে চালের দাম নি¤œমুখী। মানভেদে প্রতি বস্তা চালের মূল্য কমেছে ১শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা পর্যন্ত। বাজারে এখন দেশী চালের মজুদ নেই। যা আছে তার সবই আমদানির চাল। বেশিরভাগ চাল আসছে মিয়ানমার এবং ভারত থেকে। পরিবহন খরচ এবং সময় ব্যয় কম হওয়ায় আমদানিকারকরা এ দুই দেশ থেকে দ্রুততার সঙ্গে চাল আমদানি করতে পারেন। ফলে আপদকালীন অবস্থা সামাল দিতে এ দুই দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে চাল আমদানি হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, সরকারী অভিযানের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হলে বাজারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। খাতুনগঞ্জের পাইকাররা জানান, মিয়ানমার থেকে যে চাল আসছে তার মূল্য তুলনামূলক কম। থাইল্যান্ড থেকেও চাল আসছে। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আমদানির মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ১৬৭০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এর মূল্য ছিল ১৭৭০ টাকা। ভারত থেকে আসা আতপ চালের মূল্য প্রতি বস্তা ১৯শ’ টাকা। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই মূল্য ছিল ২ হাজার ১৫০ টাকা। সে হিসেবে আতপ চালের মূল্য কমেছে প্রতি কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে পাইকারি বাজারে মূল্য কমলেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব এখনও ততটা পড়েনি। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, তারা এখনও আগের মূল্যে কেনা চাল বিক্রি করছেন। নতুন করে কম মূল্যে চাল কেনা হলে বিক্রিও করা যাবে কমদামে। বাজারে এখন দেশী চালের সরবরাহ নেই বললেই চলে। পুরোটাই আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। আগামী আমন মওসুমের ফসল আসার আগ পর্যন্ত বিদেশী চালের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

অতি বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দেশে সৃষ্টি হয়েছে খাদ্য সঙ্কটের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্য বৃদ্ধির জন্য তাদের ঘাড়ে দায় চাপানো হলেও এর জন্য সরকারের আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ না করাও কম দায়ী নয়।

৮০ হাজার বস্তা চাল জব্ধ

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী সাগরিকা বিসিক শিল্প এলাকার একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্ধ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলীর নেতৃত্বে একটি টিম গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালায়। আহমেদ ট্রেডিং নামের প্রতিষ্ঠানের এ গুদামে পাওয়া যায় বিশাল মজুদ। অধিক মুনাফার উদ্দেশে চালগুলো বাজারে না ছেড়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার তারেককে গ্রেফতার এবং গুদামটি সিলগালা করে দেয়।

গাজীপুর ॥ দুইটি ভ্রাম্যমাণ আদালত বৃহস্পতিবার চালের দোকানে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৭ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে। গাজীপুরের সদর উপজেলা ও কালীগঞ্জ উপজেলা এলাকার বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

গাজীপুর জেলা বাজার কর্মকর্তা মোঃ আব্দুস সালাম জানান, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আশরাফ উদ্দিনের নেতৃত্বে গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। অভিযানকালে দোকানে থাকা চাল কেনার রসিদ ও রেজিস্টার খাতা প্রদর্শন করতে না পারা এবং দোকানে মূল্য তালিকা টানানো না থাকায় ওই বাজার এলাকায় চালের খুচরা ব্যবসায়ী হাজী স্টোরের মালিক মোহাম্মদ আলী, মারুফ স্টোরের মালিক রাকিবুল হাসান, রায়হান স্টোরের মালিক মোঃ রায়হান, রাজাবাড়ি স্টোরের মালিক স্বপন চন্দ্র ঘোষ ও আফজাল স্টোরের মালিক আমান উল্লাহ আমানকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানকালে গাজীপুর জেলা বাজার কর্মকর্তা মোঃ আব্দুস সালামসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে একই দিন কালীগঞ্জ গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ সোহাগ হোসেনের নেতৃত্বে কালীগঞ্জ বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। অভিযানকালে নির্দিষ্ট মজুদের চেয়ে অধিক চাল মজুদ করার অপরাধে ভোক্তা অধিকার আইনের ২০০৯ এর ৪৫ ধারা মোতাবেক মেসার্স গৌরাঙ্গ ভা-ারকে ৩০ হাজার টাকা এবং মেসার্স জামান স্টোরকে ২০ হাজার টাকা অর্থদ- করা হয়। সূত্র আরও জানায়, ব্যবসায়ীদের কাছে সর্বোচ্চ ১৫ টন চাল মজুদ থাকার কথা। কিন্তু মেসার্স গৌরাঙ্গ ভা-ারে ৬৫.৭ টন এবং মেসার্স জামান স্টোরে ২৯.২৫ টন চাল মজুদ পাওয়ায় যায়। পরে দিনের মধ্যে মজুদকৃত চাল অন্য ব্যবসায়ীদেরকে দিয়ে দেয়ার শর্তে মুচলেকা নেয়া হয়।

নীলফামারী ॥ চালের বাজারের দুঃসময়ে আগাম জাতের ধান কাটাই মাড়াইয়ে সুসংবাদ বয়ে এনেছে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর কৃষকরা। জেলা সদর, কিশোরীগঞ্জ, সৈয়দপুর ও ডিমলা উপজেলায় চলছে উৎসবমুখর পরিবেশে এই ধান কাটাই মাড়াই। বৃহস্পতিবার বিকেলে কিশোরীগঞ্জ উপজেলায় চাঁদখানা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদখানা গ্রামে ধানের আনুষ্ঠানিক কাটা মাড়াইয়ের মাঠ দিবস করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। মাঠ দিবসের ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) আব্দুল হান্নান, রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ্ আলম, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দফতরের উপপরিচালক গোলাম মোহাম্মদ ইদ্রিস, অতিরিক্ত উপপরিচালক কেরামত আলী, কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক। জেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম ধান কাটাই মাড়াই যেন এলাকার কৃষককুলকে আনন্দে আত্মহারা করে ফেলেছে। কৃষি বিভাগ সূত্র মতে এই ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ৯০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এতে চাল পাওয়া যাবে ৬০ হাজার মেট্রিক টন।

এর আগে ওই গ্রাম ঘুরে আগাম জাতের ধান উঠানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। কৃষকের সঙ্গে ব্যস্ততা দেখা গেছে কৃষি শ্রমিকদের। কৃষকরা বলছেন, ‘চালের বাজারে দুঃসময়ে আগাম ধান উঠাতে পেরে আমরা আনন্দিত। পাশাপাশি আগাম ধান উঠায় ওই জমিতে আলুসহ ভুট্টা আবাদ করা সম্ভব হবে।’

শুধু উত্তর চাঁদখানা গ্রাম নয় ওই উপজেলার সদর ইউনিয়ন, পুটিমারি, বাহাগিলি, নিতাইসহ অন্যান্য ইউনিয়নে দেখা গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি জমিতে আগাম জাতের আমন ধানের আবাদ।

উত্তর চাঁদখানা গ্রামের কৃষক আকবর আলী (৪৫) জানান, এবার তিন বিঘা জমিতে আগাম জাতের ধান আবাদ করেছেন তিনি। ধান লাগানোর ৯০ দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার শুরু করেছেন ওই ধানের কাটা মাড়াই। গত চার বছর ধরে ওই তিন বিঘা জমিতে আগাম ধান আবাদের পর আগাম আলু, এরপর ভুট্টা অথবা গমের আবাদ করে অনেক লাভবান হয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আলু লাগেবার আগোত ধান ওঠে। ধান কাটি এলা জমিত আগাম আলু লাগাইম, পড়ি থাকা জমির চাইতে ধানের জমিত আলু বেশি হয়। আলু অঠেয়া ভুট্টা লাগাইম। আগাম আলুর আবাদোত বেশি লাভ হয়।’

তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ওই জাতের ধানের আবাদে খরচ হয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, ফলন পাচ্ছি অন্তত ১৫ মণ করে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম প্রায় সাড়ে সাতশ’ টাকা। এরপর গরুর খাদ্য হিসেবে ধানের খড় বিক্রি হবে প্রতি আটি দুই টাকার উর্ধে। এতেও আয় আসবে প্রায় তিন হাজার টাকা।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: