২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সেনাবাহিনী নামছে


মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে গণহত্যা, নিপীড়ন নির্যাতন থেকে প্রাণ রক্ষায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্তের বিভিন্ন পথে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে দুই দেশের জিরো পয়েন্টে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে বিশেষ করে আসছে সমুদ্র পথে টেকনাফ উপকূল দিয়ে। কেননা, রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সেনা বর্বরতা এখনও থামেনি। প্রতিনিয়তই রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ কাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। বিশেষভাবে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম কোনভাবেই শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। আর আশ্রয় ব্যবস্থাটি রয়েছে আরও বিপর্যয়ে। এ অবস্থায় সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও আশ্রয় প্রদান কাজে সেনাবাহিনী নামছে। ইতোমধ্যে বুধবার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ক্যাম্প ও অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর একাধিক টিম রেকি করেছে। সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাচ্ছেন। তিনি উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন। আজ কক্সবাজারে প্রশাসনের একটি সমন্বয় সভা হবে। ওই সভায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচিত হবে বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অপরদিকে, মঙ্গলবার রাতেও রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গুলিবর্ষণ হয়েছে। সীমান্তের এপার থেকে গুলির শব্দ শুনেছেন এলাকাবাসী। রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতি যে একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপ নেবে তা এখন নিশ্চিত। সরকারী-বেসরকারী ছাড়াও বিদেশী ত্রাণসামগ্রীও আসছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে সোচ্চার ভূমিকায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সরব ভূমিকায় রয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস। এর পাশাপাশি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও মিয়ানমার সরকার তাদের রোহিঙ্গাবিরোধী তৎপরতায় অনড় অবস্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় পৌনে ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সামরিক অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৬ হাজার।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রাণে বাঁচাতে সরকার মানবিক দিকটিকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিচ্ছে। সীমান্ত পথ রোহিঙ্গাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যাতে জঙ্গী তৎপরতায় যুক্তরা অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারাও যেভাবে নেমেছে তাতে এদের আশ্রয় ও ত্রাণ সহায়তা দানে অবস্থা গলদর্ঘম। সিভিল প্রশাসন সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়ে মাঠে থাকলেও পুরো বিষয়টি শৃঙ্খলায় আনতে হিমশিম খাচ্ছে। বিষয়টি সরকার পক্ষে অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর পর তিনি নিউইয়র্ক থেকে যথাশীঘ্র রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত ও ত্রাণ সহায়তায় সেনা মোতায়েনের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে বুধবারই সেনাবাহিনীর পক্ষে সীমান্তের রোহিঙ্গাদের আশ্রয় পয়েন্টগুলোতে রেকি কার্যক্রম চালানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ভারে জর্জরিত কক্সবাজারের পুরো অঞ্চল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে টেকনাফ থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পর্যন্ত। বান্দরবানের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বুধবার জানানো হয়েছে, বান্দরবান জেলাজুড়ে ৫০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে রয়েছে হাজারে হাজারে অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে দীর্ঘ সময় নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, টেকনাফ থেকে উখিয়া পর্যন্ত জনপদজুড়ে সর্বাধিক রোহিঙ্গার অবস্থান রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এখনও রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত রয়েছে। তবে অধিক হারে আসছে নাফ নদীর মোহনা দিয়ে সমুদ্র পথে। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে রোহিঙ্গাদের লাশও। বুধবার ভেসে আসা আরও এক রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে এক ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হয়ে আছে। বিভিন্নভাবে তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছলেও তা চাহিদার তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। এছাড়া ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচী বুধবার পর্যন্ত পূর্ণ শৃঙ্খলায় আসা যায়নি। বিক্ষিপ্তভাবে চলছে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ। ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। তবে এ সংখ্যা এ পর্যন্ত ৩ বলে জানা গেছে। সরকারী-বেসরকারী এবং বিদেশ থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ বিতরণ সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় কোনভাবেই আনা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বুধবার সেনাবাহিনীর কয়েকটি টিম সীমান্ত এলাকাজুড়ে রেকি করেছে। এরপর সুনির্দিষ্ট একটি কর্মসূচী নিয়ে এ কাজে নামবে সেনা সদস্যরা। আশা করা হচ্ছে, এরপর থেকে ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচী পূর্ণমাত্রায় গতি পাবে।

সেনা মোতায়েন নিয়ে সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বুধবার কক্সবাজারে একটি হোটেলে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে রয়েছেন। নিউইয়র্ক থেকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে সেনাবাহিনী নিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। মন্ত্রী আশা করছেন, সেনা মোতায়েনের পর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ কাজে একদিকে যেমন শৃঙ্খলা আসবে, তেমনি পুনর্বাসন কাজও দ্রুত এগিয়ে যাবে। দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের পাশে তিনি সকলের প্রতি দলমত-নির্বিশেষে আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাখাইনে গণহত্যা ও বর্বর নির্যাতনে টিকতে না পেরে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি আশ্রয় দেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঢল এত বেশি যে, দ্রুততম সময়ে এ সমস্যা সমাধান করা কঠিন। তার ওপর কদিন ধরে ভারি বর্ষণে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরও মানবেতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াই।’ তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের শুরু থেকে ত্রাণ বিতরণে সেনাবাহিনী নিয়োগের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে সেনাবাহিনী জড়িত হলে সামগ্রী প্রক্রিয়ায় দ্রুত উন্নতি হবে আর পাশাপাশি ত্রাণ নিয়ে কোন ধরনের দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না।

টানা বর্ষণে অবনতি

এদিকে বুধবার পর্যন্ত কখনও টানা ও কখনও থেমে থেমে ভারি বর্ষণে সীমান্তের উভয় পাশে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আরও সঙ্কটাপন্ন হয়েছে। সীমান্তের ওপারে জিরো পয়েন্টে এবং এপারের জিরো পয়েন্ট ছাড়াও শরণার্থী ক্যাম্প এবং আশ্রিত কেন্দ্রগুলোতে লাখ লাখ রোহিঙ্গার জীবনযাত্রা মানবেতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। টেকনাফ থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত ৩০টিও বেশি পাহাড়ের বন জঙ্গলের গাছপালা কেটে এবং এর পাশাপাশি পাহাড় কেটে যেনতেনভাবে যে সব আশ্রয়স্থল রোহিঙ্গারা গড়ে তুলেছে সেখানকার পরিস্থিতি মারাত্মক অবস্থায় রয়েছে। যত্রতত্র পাহাড় কাটার ফলে পাহাড় ধসের আশঙ্কাও করছেন পরিবেশবিদরা। বিশেষ করে উখিয়ার বালুখালী পাহাড়টি ব্যাপক ধস সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেননা, পুরো পাহাড়টিজুড়ে রয়েছে বালি। এ বালির পাহাড় যখন ক্রমাগতভাবে কেটে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে এখন সেখানে চলছে ভারি বর্ষণ। ফলে ইতোমধ্যেই পাহাড়ের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্ষিপ্তভাবে মাটি ধসতে শুরু করেছে। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে পারে।

১৪ হাজার শেড ॥ সরকার আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় শিবির গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে ২ হাজার একর খাস জমি বরাদ্দ দিয়েছে। উখিয়ার বালুখালির বিশাল পাহাড়ী এলাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে ১৪ হাজার শেড নির্মাণ করা হবে। নির্মাণ কাজে সহায়তা দেবে আন্তর্জাতিক রিফিউজি বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর (ইউনাইটেড নেশন হাইকমিশন ফর রিফিউজি)। ৬ ইউনিটে বিভক্ত করে এসব শেড নির্মিত হবে। এতে প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আশ্রিয়স্থল গড়ে তোলা হবে। কিন্তু আরও লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র কোথায় প্রতিষ্ঠা করা হবে তা এখনও নিরূপিত হয়নি।

রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধার

টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ জালিয়াপাড়া উপকূল হতে আরও এক রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয় মেম্বার ফজলুল হক জানান, আনুমান পয়ত্রিশ বছরের এক রোহিঙ্গার মরদেহ ভেসে আসলে পুলিশে খবর দেয়া হয়। পুলিশের সহায়তায় মঙ্গলবার লাশটি উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১১৬ জন রোহিঙ্গার লাশ নাফ নদী ও সাগর উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

বিদেশ পাড়ি দেয়ার গোপন তৎপরতা

মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে আসছে। বাংলাদেশে এসে বহু রোহিঙ্গা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পাসপোর্ট করে বিদেশে পাড়ি দেয়ার ঘটনা অহরহ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র পথে বহু রোহিঙ্গা মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে এদের একটি অংশ গোপনে সমুদ্র পথে বিদেশ পাড়ি দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। এ কাজে তৎপর রয়েছে মানব পাচারকারী চক্রের হোতারা। বিভিন্ন সূত্রে তথ্য মিলেছে, আগের মতো ন্যায় ছোট ছোট নৌকাযোগে রোহিঙ্গারা সেন্টমার্টিন ও শাহপরীরদ্বীপ এলাকা থেকে গভীর সমুদ্রে গিয়ে সেখানে মানব পাচারকারীদের নিয়োজিত বড় আকৃতির ট্রলারযোগে বিদেশ পাড়ি জমানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে বিজিপি, পুলিশ বা কোস্টগার্ড সূত্রে এখনও সুনির্দিষ্ট সত্যতা মেলেনি। সেন্টমার্টিন দ্বীপে রয়েছে নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটি। এছাড়া কোস্টগার্ডের অবস্থানও রয়েছে। বুধবার নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে তারা আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এরপরও বিশাল সমুদ্র এলাকা জুড়ে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ফাঁকফোকরে রোহিঙ্গাদের পাচার করার তৎপরতায় সক্রিয় হতেও পারে। কিন্তু বুধবার পর্যন্ত এ ধরনের কোন কাজ হয়নি বলে তারা নিশ্চিত।

৬ জেলা প্রশাসককে

জরুরী চিঠি

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে ছয় জেলা অর্থাৎ কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, ফেনী, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকদের কাছে পত্র দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন। বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আটক করা যাবে না, বরং উদ্ধার করে তাদের উখয়া, কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে ফেরত পাঠাতে হবে। আচরণ করতে হবে মানবিক।

এদিকে বুধবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে মিয়ানমার নাগরিকদের চিহ্নিতকরণ সংক্রান্তে উঠে আসে বিষয়টি। সভায় জানানো হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসহ ত্রাণ সহায়তা তদারকির জন্য উপসচিব পর্যায়ের ১০ কর্মকর্তাকে পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের জন্য ২৫০ জন অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। ৫ ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা এবং বর্ডার লাইনে নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফের খাদ্য বিভাগীয় গুদামগুলোতে শরণার্থীদের জন্য প্রাপ্ত অনুদানের সকল পণ্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সভায় এও বলা হয়েছে, যে কোন স্থানে রোহিঙ্গাদের পাওয়া যাবে তাদের ধরা পড়েছে বলা যাবে না, বলতে হবে উদ্ধার। বিভাগীয় পর্যায়ের এ সমাবেশে সিএমপি কমিশনার মোঃ ইকবাল বাহার, রেঞ্জ ডিআইজি এসএম মনিরুজ্জামান, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা, সৈয়দা সরোয়ার জাহান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোঃ জিল্লুর রহমান চৌধুরী, নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুব আলম তালুকদার, বিজিবির রিজিয়ন ডেপুটি কমান্ডার কর্নেল আনিসসহ বিভিন্ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এক লাখ রোহিঙ্গার খাবারের ব্যবস্থা

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় রাখার উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট বাসস্থান, খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ও সরকারী সহযোগিতা নিশ্চিত করতে চলছে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন। কিন্তু রোহিঙ্গারা নির্ধারিত ক্যাম্প এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গেলে সরকারী সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নিজ দেশে ফেরত যেতেও সমস্যায় পড়বে। তারা লুকিয়ে কোথাও আশ্রয় নিলেও আমৃত্যু কোন পরিচিতি ছাড়াই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে থাকবেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র এক লাখ রোহিঙ্গার প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থা করছে জেলা প্রশাসন। বাকিদের খাবারের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন-ব্যক্তির ত্রাণ সাহায্যের ওপর। গত ২৬ আগস্ট থেকে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ মানুষকে প্রতিদিন খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সরকার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহিদুর রহমান আমরা এক লাখ মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। চাল-ডাল এখনও আমাদের কিনতে হচ্ছে না। এগুলো জেলা প্রশাসনে আসা ত্রাণ সহায়তা থেকে চলছে। মশলা জাতীয় দ্রব্য ও তেল কিনতে হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন বেসরকারীভাবে অন্য যে ত্রাণ আসছে, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। উখিয়ার বালুখালী ও কুতুপালং এলাকায় গড়ে ওঠা নতুন বস্তিতে আটটি লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। রান্না করা খাবার রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

সুচির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর গত ২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীর নৃশংস নির্যাতন শুরু করার তিন সপ্তাহ পর বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন দলের প্রধান নেত্রী আউং সান সুচি। তার এই বক্তব্য মিথ্যা, সামরিক বাহিনীকে আড়াল করার চেষ্টায় সত্যকে লুকানোর প্রয়াস বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। প্রায় আধা ঘণ্টার ভাষণে সুচি সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। তিনি রাখাইনের ভয়াবহ মানবিক সংকটময় পরিস্থিতিকে মিয়ানমারের অনেক সমস্যার একটি বলে অভিহিত করেছেন।

রাখাইন রাজ্যে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সামরিক বাহিনীর অভিযান বন্ধ আছে বলে সুচি তার বক্তব্যে জানালেও রোহিঙ্গা নেতা আবু সিদ্দিক দাবি করেন, সোমবার রাতেও নাইক্ষ্যংছড়ির আসারতলী সীমান্তের সাতমারাঝিরি বরাবর ওপারের চেংছড়িতে বিনা উস্কানিতে গুলি চালানো হয়েছে। সোমবার দুপুরে মংডুর নন্দাখালী ও বলিবাজারে রোহিঙ্গা বসতি-দোকান জ্বালিয়ে দিয়েছে-সেনা সদস্য ও রাখাইনরা। বুচিদংয়ে বুজরাংশং ঘাঁটির সামরিক সদস্যরা সোমবার দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করার পর হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে সীমান্তের ওপার থেকে তথ্য মিলেছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: