১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

‘যাচাই’ করে বাংলাদেশে আসা শরণার্থী ফেরাতে রাজি সুচি


‘যাচাই’ করে বাংলাদেশে আসা শরণার্থী ফেরাতে রাজি সুচি

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির নেত্রী আউং সান সুচি।

তিনি বলেছেন, যে শরণার্থীরা মিয়ানমারে ফিরতে চায়, ওই চুক্তির আওতায় আমরা যে কোন সময় তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত। আর যে শরণার্থীরা মিয়ানমার থেকে গেছে বলে চিহ্নিত হবে, কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে আমরা তাদের গ্রহণ করব। খবর এএফপি ও বিবিসি অনলাইনের।

রাখাইনে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মধ্যে মঙ্গলবার মিয়ানমারের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে এ কথা বলেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর সুচি। সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ না নেয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনায় থাকা সুচি মঙ্গলবারই প্রথম রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে জাতির সামনে বক্তব্য দিলেন।

রাখাইনে বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে সেনাবাহিনীর চলমান অভিযানে গত প্রায় এক মাসে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ ওই অভিযানকে বর্ণনা করছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে।

রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের যেসব অভিযোগ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রয়েছে, সেসব প্রসঙ্গ ভাষণে এড়িয়ে গেছেন সুচি। তিনি শুধু বলেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ওই অঞ্চলে আর কোন সহিংসতা বা দমনাভিযান চালানো হয়নি। অবশ্য বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বরও সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে ধোঁয়ার কু-লী উঠতে দেখা গেছে।

রাখাইনের পরিস্থিতির কারণে ওই রাজ্যের মুসলমানদের পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার কথা স্বীকার করলেও সুচি ইংরেজীতে দেয়া তার আধা ঘণ্টার বক্তৃতায় কোথাও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তিনি সরাসরি কিছু বলেননি।

সুচি বলেন, আমরা সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনী সহিংসতার নিন্দা জানাই। রাখাইন রাজ্যজুড়ে আইনের শাসন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে তিনি এও বলেছেন, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ রয়েছে। সবার অভিযোগই শুনতে হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়ার পরই পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, যারাই এ দেশের আইনের বিরুদ্ধে যাবে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিবিসি লিখেছে, চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সুচি তার বক্তৃতায় বলেছেন, রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মিয়ানমার সরকার কী করছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানুক।

রাখাইন থেকে মুসলমানরা কেন পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে, তা মিয়ানমার সরকার খুঁজে বের করতে চায় জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইন পরিদর্শনে যাওয়ারও আমন্ত্রণও তিনি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের বিষয়ে মিয়ানমার সরকার ভীত নয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমার একটি নবীন ও ভঙ্গুর দেশ। তারা অনেক সমস্যার মোকাবেলা করছে। সব সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। কিছু সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না।

সুচি বলেছেন, রাখাইনের সঙ্কট নিরসনে কোফি আনান কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তা দ্রততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চায় তার সরকার। তবে তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ১৮ মাস হতে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। রাখাইনের সবার দুর্দশার বেদনা আমরা গভীরভাবে অনুভব করছি। তিনি দাবি করেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে এবং বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।

সুচির ওই ভাষণের পর রাখাইনের ওই অঞ্চলে যাওয়ার পূর্ণ সুযোগ চেয়েছে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল, যাতে নিজেদের চোখে বাস্তবতা দেখে তদন্ত করা যায়।

মিয়ানমার স্টেট কাউন্সিলর বলেন, আমরা শান্তি চাই, ঐক্য চাই। যুদ্ধ চাই না। আমরা শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাখাইনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। অন্যকে দোষারোপ করা কিংবা দায়িত্ব এড়ানো মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশ্য নয়।

সুচি দাবি করেছেন, রাখাইন থেকে সবাই পালিয়ে যাননি, অধিকাংশ মুসলমানই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মানে, পরিস্থিতি ততটা খারাপ হয়তো নয়। রাখাইনে যারা থেকে গেছেন এবং যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের সবার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সুচি, যাতে এই সঙ্কটের মূল খুঁজে বের করা যায়।

সুচি বলেছেন, রাখাইনের মুসলমানদের জীবনমানের উন্নয়নে সম্প্রতি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে তার সরকার। দারিদ্র্যপীড়িত ওই এলাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, ‘যাচাই বাছাই করে’ তাদের সবাইকেই ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে তার এই ভাষণ প্রসঙ্গে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লরা হাই বলেন, এটা ইতিবাচক যে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছেন। তবে এর পেছনে যে দেশটির সামরিক বাহিনী আছে, তা তিনি সুস্পষ্টভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: