২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রিপোর্টারের ডায়েরি


ঈদযাত্রায় বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরী

১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। অন্য সব ঈদের মতো এবারও এক দিন আগে ঘরে ফেরার যাত্রায় শরিক হয়েছি। সকাল ৭টার বাসের টিকেট আগেই কাটা ছিল। সময়মতো বাসেও উঠেছি। বাসটি গাবতলী পার হতেই সময় লাগল দেড় ঘণ্টা। গাবতলী পার হতেই রাস্তা একেবারে ফাঁকা। মনে হলো সহজেই পৌঁছে যাব গন্তব্যে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। সাভার পার হয়েই আবার ধীরগতিতে চলা শুরু। নবীনগর পার হতে লাগল আরও দেড় ঘণ্টা। নবীনগর পার হতে দেড় ঘণ্টা সময় লাগলেও জ্যামের কোন কারণ খুঁজে পেলাম না। তবে মনে হলো ট্রাফিক সিস্টেমের অব্যবস্থাপনার কারণেই এতক্ষণ আটকে থাকতে হয়েছে।

নবীনগর পার হওয়ার পর আবার রাস্তা ফাঁকা। পরিবহনের চাপ নেই বললেই চলে। মনটাও বেশ ফুরফুরে। পাটুরিয়া ফেরিঘাট ছাড়া রাস্তায় আর কোথাও তেমন জ্যামে পড়তে হয়নি। যত বিপত্তি এবার ফেরি পারাপারে। পারের অপেক্ষায় কয়েক শ’ গাড়ি। অপেক্ষার ক্ষণ গণনা শুরু তখন থেকেই। ঠিকমতো বাড়ি পৌঁছাতে পারব তো?

বেলা দেড়টার মতো হবে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই জানাল সন্ধ্যার আগে ফেরি পার হতে পারবে না। পুলিশ জানাল আগের রাত থেকেই এই অবস্থা। দ্রুত পারের আশা ক্ষীণ। তাই বিকল্প চিন্তা করতে হলো। লঞ্চে নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে কোন পরিবহন ধরা। কাছে মাত্র একটি ব্যাগ। কাঁধে ঝুলিয়ে রওনা হলাম। বাস থেকে নামতেই মোটরসাইকেল পার্টি হাজির। টাকার বিনিময়ে যাত্রী পরিবহন করছে তারা। ৫শ’ টাকা দিয়ে ফেরিঘাট পর্যন্ত এসেছি। এবার মোটরসাইকেলকে পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাট পর্যন্ত আরও ৫০ টাকা গুনতে হলো। আর ২৫ টাকা দিয়ে লঞ্চ পার হতে হলো। দৌলতদিয়া বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে আরও ২শ’ টাকা দিয়ে পাংশা (অন্য সময়ে ভাড়া ৫০ টাকা)। এরপর আরও ৪০ টাকা ব্যয় করে খোকসায় পৌঁছাতে হলো। অথচ অন্য সময় ঢাকা থেকে মাত্র ৩শ’ টাকা ভাড়া দিয়ে সরাসরি বাড়ি যাওয়া যায়। ঈদের সময় অতিরিক্ত ৯শ’ টাকা খরচ করে বাড়ি পৌঁছাতে হলো। যা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা।

শুধু আমি নই, আমার মতো অনেক ভুক্তভোগীকে একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অথচ সরকার এ বিষয়ে একটু নজর দিলেই নাগরিকদের ভোগান্তি যেমন কমানো যেত। ঈদ উপলক্ষে আয়ের একটি বড় অংশই গ্রামে ব্যয় করতে পারত। কিন্তু ঈদের যাত্রা মসৃণ না হওয়ায় সবই ভেস্তে যাচ্ছে। আয়ের একটি বড় অংশ রাস্তায় ব্যয় করতে হচ্ছে।

বাড়তি টাকা খরচ করে আমার পক্ষে কয়েক ঘণ্টা আগে ঘরে ফেরা সম্ভব হলেও অন্যদের অবস্থা ছিল ভিন্ন। বহু নারী-পুরুষকে দেখেছি তাদের ব্যাগ, পুঁটলি এবং বাচ্চাদের নিয়ে কি নরক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। বাসের ভাড়া দ্বিগুণ তিনগুণ হওয়ায় অনন্যপায় হয়ে এদিক-ওদিক চেয়েছি। পকেট হাতড়েছে। বাধ্য হয়েই ঈদের খরচের টাকা যাত্রা পথেই খরচ করতে হয়েছে এই আশায় যেÑ সময়মতো ঘরে ফিরতে পারলেই শান্তি। শুধু ঘরে ফেরা নয়, কর্মস্থলে ফেরার পথেও একই অভিজ্ঞতা। তিন ঘণ্টা ঘাটে আটকে থাকার পর ফেরি পার হতে হয়েছে। তারপর ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছি।

গত বছরও ঈদের সময় একই ধরনের ভয়ানক অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছি। রাতের কোচে যাত্রা। ১০টায় রওনা হয়েছি। রাত ১১টার পরে গোয়ালন্দ মোড় পার হতেই থেমে গেল বাসের গতি। আর এগোতে চায় না। প্রচ- গরমে সবাই অতিষ্ঠ। সারারাত এভাবেই কষ্ট সইতে হয়েছে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের। অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে লাগেজ মাথায় নিয়ে ফেরি ঘাটে যেতে দেখলাম। হয়ত পরদিন সকালে তাদের অফিস ছিল। যে কোনভাবেই ঢাকা পৌঁছাতে হবে। তাই এত কষ্ট। আমার পক্ষে ব্যাগ এ্যান্ড ব্যাগেজ নিয়ে এভাবে রওনা হওয়া সম্ভব ছিল না। অন্যদের মতো প্রতীক্ষায় থাকতে হলো। প্রতীক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চায় না। এক ঘণ্টা পর পর কিছু দূর যায় আবার বন্ধ হয়ে যায় বাসের গতি। এভাবে একটু একটু করে সকাল ৯টায় ফেরি ঘাটে পৌঁছাই। সারা পথ বাসে পাশাপাশি হেঁটেছি। চোখের সামনে একটু একটু রাতে প্রহর শেষ হতে দেখেছি। এক পর্যায়ে রাত শেষ হতেই মাইকে শোনা গেলে ভোরের আজান। চলতে চলতে সূর্য উঠলো। বাড়তে থাকে রোদের উত্তাপ। আগের দিন রাত ১০টায় রওনা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল বেলা ১টায়।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু এবার নয়। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরেই সয়ে যেতে হচ্ছে। তবু প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিকারের উদ্যোগ নেই। শুধু ঈদ সামনে এলেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। মিডিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়ে রিপোর্ট প্রকাশে। অথচ ঘটনা প্রতি বছর ঘটতে দেখা যায়। তবুও প্রতিকার নেই। অন্য দেশ হলে এই ধরনের ঘটনায় দু-তিন মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকে। যা আমাদের দেশে কখনও কল্পনা করা যায় না। শুধু ভোগান্তিই সয়ে যেতে হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিমত আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়া হলে এই ধরনের ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব।

শাহীন রহমান

সদা-সতর্ক দৃষ্টি চারদিকে

১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। পবিত্র ঈদ-উল-আযহার আগের দিন। পত্রিকা অফিস ঈদের ছুুটি। কিন্তু পাঠকের সুবিধার জন্য অনলাইন সংস্করণ যথারীতি চালু আছে। তাই সাংবাদিক হিসেবে আমার কোন ছুটি নেই। সদা-সতর্ক দৃষ্টি চারদিকে। খবর পেলাম, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জের তাড়াশে যাচ্ছেন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকা কাজীপুরে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করে তাড়াশের আসান বাড়ি গ্রামে যাবেন রুপার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত করতে। রুপা এ সময়ের একটি আলোচিত নাম। টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যাকা-ের শিকার জাকিয়া সুলতানা রুপা। রুপার এই খবর প্রচ- ঝড় তুলেছে গণমাধ্যমে।

এ কারণেই সম্ভবত সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ঈদের আগের দিন যাচ্ছেন রুপার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানানোর জন্য। আমিও প্রস্তুত। বেশ ক’জন সাংবাদিক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে রওনা হলাম তাড়াশের উদ্দেশে। মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিলাম না যানজটের কারণে। কিন্তু আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় বুঝলাম ‘কত ধানে কত চাল।’ সড়কে চলাচলে যাত্রী এবং গাড়ির কী দুরবস্থা হয় তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিশেষ করে ভুইয়াগাতি থেকে নিমগাছি হয়ে তাড়াশ পর্যন্ত সড়ক যেন স্থানে স্থানে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বিকেলে প্রায় চারটার দিকে এসে পৌঁছালেন তাড়াশের আসান বাড়িতে। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই তিনি দেখা করলেন রুপার ভাই হাফিজুল, মা হাসনা হেনা, ছোট বোন পপি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে।

সে এক করুণ দৃশ্য। রুপার মা-ভাই মন্ত্রীর আগমনে যেমন খুশি হয়েছেন। তেমনি মন্ত্রী মহোদয়কে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পরিবারের সবাই। তাদের বিচার পাবার অদম্য শক্তি আরও বেড়ে যায়। মন্ত্রী রুপার হত্যাকারী নরপশুদের বিচার যেন দেশের প্রচলিত আইনে নয়- দ্রুত বিচার আইনেই বিচার হবে এবং পশুদের উপযুক্ত শাস্তি হবে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলেও তিনি বিচারকদের কাছে প্রত্যাশা করেন। কোন আইনজীবী যেন টাকার বিনিময়ে নরপশুদের হয়ে আদালতে না দাঁড়ান সে আহ্বানও জানান মন্ত্রী। তিনি রুপার ছোট বোন পপিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার ঘোষণা দেন এবং নগদ এক লাখ টাকা সহায়তা দান করেন।

পরে তিনি শোক ও প্রতিবাদ সভায় যোগ দেন। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন এমপি, জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা, পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদসহ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবাদ সভা শেষে আবারও একই পথে রওনা হয়ে রাত ৮টায় সিরাজগঞ্জ শহরে পৌঁছলাম।

-বাবু ইসলাম, সিরাজগঞ্জ