২০ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ট্রেনের টিকেট বিক্রির শেষ দিনে নানা অভিযোগ


ট্রেনের টিকেট বিক্রির শেষ দিনে নানা অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পাওয়া না পাওয়া আর ক্ষোভের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাঁচদিনব্যাপী ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি। মঙ্গলবার শেষ দিনে কমলাপুর রেল স্টেশনজুড়ে ছিল জনসমুদ্র। ৩১ আগস্টের অগ্রিম টিকেট পেতে অন্তত ২০ ঘন্টা আগে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন অনেকেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে কয়েকটি কাউন্টারের টিকেট শেষ হয়ে যায়। এ নিয়ে তুমুল হইচই চলে। টিকেট প্রত্যাশীদের অভিযোগ শেষ দিনে নানা অনিয়ম হয়েছে। এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে টিকেট শেষ হয়ে যাওয়ার কথা বলায় ক্ষিপ্ত হন সবাই। যদিও রেল বিভাগের লোকজন বারবারই বোঝানোর চেষ্টা করছেন কোন অনিয়ম হয়নি। যতক্ষণ টিকেট আছে সবাই পাবেন।

সকালে রেল স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্টারের সামনে থেকে টিকেট ক্রেতাদের সারি স্টেশন চত্বর ছাড়িয়ে মুল সড়ক পর্যন্ত এসেছে। ফলে টিকেট বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছেন কাউন্টারের কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রতিটি কাউন্টারের সামনে একাধিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যেন লাইন ভেঙ্গে কেউ টিকেট সংগ্রহ করতে না পারে। ২৩টি কাউন্টার থেকে অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয়।যার মধ্যে ২টি কাউন্টার নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। কাউন্টার দুটি থাকলেও নারীদের উপস্থিতিও ছিল অনেক বেশি। তাই দীর্ঘ সময় পরে নারীরা টিকেট পান।

দিনাজপুরগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেটের জন্য লাইনে অপেক্ষা করেন বেসরকারি চাকরিজীবী অহিদ মিয়া। তিনি বলেন, ঈদের সময় ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে তখন ট্রেনে ওঠাই মুশকিল। এসব জেনের ট্রেনের টিকেট কাটতে এসেছি কারণ সড়ক পথে অতিরিক্ত যানজট হওয়ার শঙ্কা আছে এবার। কিন্ত আজ টিকেট কাউন্টারে এতো ভিড় যে েিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।

অন্যদিকে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের এসি টিকেট শেষ জেনে কাউন্টারে কর্মরতদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়েছেন নাজমুল হাসান। তারসঙ্গে যোগ দেন অনেকেই। সকলে সমন্বরে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তারা জানান, ভোরে এসে টিকেটের লাইনে দাঁড়িয়েছি। কাউন্টের পৌঁছানোর আগেই শুনলাম এসি টিকেট শেষ। এটা কেমন কথা হল। তাহলে এতো কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে লাভ কি?

এ বিষয়ে কাউন্টারের কর্মকতরা জানান, ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে এসি টিকেটের। সবাই এসি চায়। তাই সবচেয়ে আগে এসি টিকেট শেষ হয়ে যায়।

কমলাপুর রেল স্টেশনের ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্তী জানান, আজ বিক্রি হচ্ছে শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ আগস্টের টিকেট। সারা দিনে বিক্রি হবে ২৫ হাজার ১০২টি টিকেট। এছাড়া অন্যান্য চলতি ট্রেন মিলিয়ে টিকেট বিক্রি হবে ৫০ হাজার। কিন্তু আজ কমলাপুরে টিকেট প্রত্যাশী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। যতজন লাইনে দাঁড়িয়েছে তাদের সবাইকে আমরা টিকেট দিতে পারবো না, কারণ আমাদের সম্পদ সীমিত। এর মধ্যেই আমরা যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, মোট টিকেটের ৬৫ শতাংশ দেয়া হচ্ছে কাউন্টার থেকে। বাকি ৩৫ শতাংশের মধ্যে ২৫ শতাংশ দেয়া হচ্ছে অনলাইন ও মোবাইলে। ৫ শতাংশ ভিআইপি ছাড়াও রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৫ শতাংশ। তাই সংকট হবে। এ নিয়ে হইচই করলে তো কোন লাভ নেই। কারন টিকেট তো আমাদের হাতে নেই। আমরা বানাতেও পারি না।

তিনি আরও বলেন, এবারের ঈদে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার যাত্রী আনা নেয়া করবে রেলওয়ে। আগামী ২৯ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর এবং ঈদের পর ৩ সেপ্টেম্বও থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সাত জোড়া বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে। ঈদ উপলক্ষে এসব ট্রেন নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের ট্রেনের টিকেটের জন্য এদিন ভিড় ছিল বেশি। রাজশাহীর ধূমকেতু এক্সপ্রেসের টিকেটের জন্য সোমবার সকাল থেকে স্টেশনে অপেক্ষায় থাকার কথা জানালেন জুবায়ের ও সালাম। তারা জানান, প্রায় ২৭ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সকালে টিকেট পেয়েছেন তিনি। কষ্ট হলেও খুশির ঝিলিম ছিল দু’জনের চোখে মুখে। জানান, অনেকদিন পর বাড়ি যাব। টিকেট পেয়ে খুব আনন্দ লাগছে। ট্রেনে ঝুঁকি কম বলে টিকেটের জন্য এতো কষ্ট করি।

চট্টগ্রামের মহানগর প্রভাতীর টিকেটের জন্য সোমবার থেকে স্টেশনে অপেক্ষায় থাকার কথা জানালেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রতন পন্ডিত। সড়কপথের ‘ঝামেলা এড়াতে’ ঈদের ছুটিতে ট্রেনে বাড়ি যাওয়ার কথা বললেন তিনি। পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা যেতে লাগে ৮-৯ ঘণ্টা। আর জ্যামে পড়লে তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে কষ্ট করে হলেও ট্রেনের টিকেট নিতে এসেছি।

প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবারও যাত্রীদের অভিযোগ ছিল এসি টিকেট নিয়ে। রাজশাহীর ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরার টিকেট চেয়েছিলেন লুৎফর রহমান নামের এক যাত্রী। তবে টিকেট পাননি তিনি।

তিনি জানান, আমি সিরিয়ালের শুরুতেই ছিলাম। আমার সিরিয়াল নম্বর ১৫। কিন্তু দুটি এসি টিকেট চাইলে আমাকে দেয়া হয়নি।

স্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্তী জানালেন, গতবছরের চেয়ে এবার অগ্রিম টিকেট প্রত্যাশীর ভিড় বেশি বলে তাদের মনে হয়েছে। আর ৩১ আগস্টের টিকেটের জন্য এবার সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়েছে মঙ্গলবার।

মিলছেনা অনলাইন টিকেট ॥ মোট টিকেটের মধ্যে ২৫ ভাগ অনলাইন এবং মোবাইলের মাধ্যমে কেনার সুযোগ থাকলেও ঈদের অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরুর পর ১৯ অগাস্ট থেকে এই টিকেট কিনতে পারছেন না কেউ। অনলাইন ও মোবাইলে টিকেট কিনতে গিয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন টিকেট কিনতে আগ্রহীরা। এই ২৫ ভাগ টিকেট কালোবাজারে চলে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করছেন তারা।

তবে এই টিকেটগুলো বাইরে বিক্রির সুযোগ নেই দাবি করে রেলের মহাপরিচালক বলছেন, ঈদের এই সময়ে টিকেট কিনতে চাপ বাড়ায় তাদের সার্ভার হ্যাং করতে পারে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, গত ঈদুল ফিতরেও অনলাইন ও মোবাইলে টিকেট কিনতে পারেননি তারা। এবার কোরবানির ঈদের টিকেট গত ১৯ অগাস্ট ছাড়ার পর থেকে একই সমস্যা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে রেলওয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে ট্রেনের অগ্রিম টিকেট কেনা যায়। একই সময়ে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও আগাম টিকেট কেনা যায়।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে রেলওয়ের ই-সেবা সাইটে গিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কেনার চেষ্টা করেন অনেকেই। বাস্তবতা হলো টাক েেকটে রাখলেও কাঙ্খিত টিকেট পাননি একাধিক ব্যক্তি। তারা জানান, একাউন্ট ডেবিট করার এসএমএস ও মেইল কনফার্মেশন সাথে সাথেই আসে। কিন্তু টিকেট কনফার্মেশন লিঙ্ক ওপেন হওয়ার আগেই সাইটটি ডিসকানেক্ট হয়ে যায়। টিকেটের মূল্য বাবদ ৭৪৫ টাকা ই-সেবাডটসিএনএসবিডি এর অনুকূলে টার্মিনেট দেখাচ্ছে, কিন্তু টিকেট তো পেলাম না। সোমবার কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজারের কক্ষে অভিযোগ নিয়ে আসেন পুলিশ পরিদর্শক আবুল বাশার। তিনি অনলাইন এবং মোবাইলে টিকেট কেনার চেষ্টা করেও সফল হননি। তিনি বলেন, জয়পুরহাট যেতে নীলসাগর, দ্রুতযান ও একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কেনার চেষ্টা করেছেন তিনি। মোবাইল এসএমএস এবং ইন্টারনেটে টিকেট কিনতে না পারায় রেলওয়ের যাত্রীদের ফেইসবুক গ্রুপের পেইজ বাংলাদেশ রেলওয়ে ফ্যানস ফোরামে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে।

মুনতাসির রাহি নামে একজন লিখেছেন, অনলাইনের ২৫ ভাগ টিকেট কি সিএনএস চুরি করছে নাকি রেলের লোক? ঠিক ৮টায়ও সব টিকেট সোল্ড আউট। সিএনএস এর কানো জবাবদিহি নাই? এভাবে রেল লাভের মুখ আগামী ৫০ বছরেও দেখবে না। শামীম লিমন নামে আরেকজন লিখেছেন, অনলাইনে টিকেট কি আজও দিছে? আজ চেষ্টা করলাম ৩০ তারিখের টিকেটের জন্য। কিন্তু চরম হতাশ। নাজমুল হাসান নিপুন নামে একজন লিখেছেন, অনলাইন সিস্টেমের কী হয়েছে? অনলাইন সিস্টেম এখন কার দখলে? আমরা সাধারণ মানুষদের কি অনলাইনে টিকেট কাটার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে?

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, সবাই একসঙ্গে সাইটে ‘ইন’ করতে চাওয়ায় সমস্যা হতে পারে। আমাদের সার্ভারের ক্যাপাসিটি আমরা দেখছি সমস্যা হচ্ছে কি না? অনলাইনের সিস্টেম ঠিক আছে। সেটাতে এদিক সেদিক করার কোনো সুযোগ নাই।

ট্রেনের কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আসন সংরক্ষণ ও টিকেটিং (সিএসআরটি) ব্যবস্থা পরিচালনা করছে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম বা সিএনএস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ই-টিকিট বিক্রি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজও করছে এ প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি মোবাইল ও ইন্টারনেটে টিকেট বিক্রি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের দায়িত্বও পালন করছে সিএনএস।

এ বিষয়ে কথা বলতে কমলাপুরে সিএনএসের কার্যালয়ে গেলে সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীরা বলেন, ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া যাবে না। কর্মকর্তারাও কেউ নেই বলেও জানানো হয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: