১৯ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আর্জেস গ্রেনেড রহস্য দীর্ঘ ১৩ বছরেও উদ্ঘাটিত হয়নি


শংকর কুমার দে ॥ বহুল আলোচিত ২১ আগস্টের পরদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর থেকে উদ্ধার করা আর্জেস গ্রেনেড রহস্য দীর্ঘ ১৩ বছরেও উদ্ঘাটিত হয়নি। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আরও একটি বড় ধরনের নাশকতার নীলনক্সার ছক কষা হয়েছিল বলে মনে করেন গোয়েন্দারা। কারণ ওই সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পাঁচ আসামি। নিষিদ্ধ সংগঠন হরকত-উল-জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি) সদস্যদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব শূন্য করার জন্য একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামি, হুজিসহ জঙ্গী সংগঠনের বন্দীদের মুক্ত করার জন্য গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি-না সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে সিআইডি।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলার পরপরই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় একটি আর্জেস গ্রেনেড। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে উদ্ধার হওয়া সে গ্রেনেডের রহস্যের জট খোলেনি। কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কিভাবে কারা গ্রেনেডটি কারাগারের ভেতরে নিয়ে গেল তার কূল-কিনারা করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। গ্রেনেড উদ্ধারের ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা মামলার কয়েক আসামিকে কারাগারের ওই গ্রেনেডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল তখন। কিন্তু রহস্যের জট খোলেনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনায় গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি ওই ঘটনার চার দিনের মাথায় দায়সারাভাবে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেনেডটি বাইরে থেকে ছোড়া হয়েছিল। আজও জানা যায়নি কে বা কারা কারাগারের ভেতরে গ্রেনেড ছুড়েছিল। এ ঘটনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন লালবাগ থানায়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলার পরদিন ২২ আগস্ট রবিবার সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ ও ৯০ নম্বর সেলের মাঝামাঝি ড্রেনের পাশে একটি আর্জেস ৮৪ মডেলের গ্রেনেড পড়ে থাকতে দেখেন পরিচ্ছন্নকর্মী মিন্টু। এরপর তিনি এক কারারক্ষীকে ডেকে আনেন। ওই কারারক্ষী গ্রেনেডটি দেখেই উর্ধতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। এরপরই কারাগারের ভেতরে শুরু হয় ছোটাছুটি। খবর পেয়ে ওই দিন দুপুরে সেনাবাহিনীর একটি বিস্ফোরক দল গ্রেনেডটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্যই সেদিন কারাগার থেকে গ্রেনেড উদ্ধার নাটক সাজানো হয়েছিল।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে গ্রেনেড রাখার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বরখাস্ত করা হয় ডেপুটি জেলার এনামুল কবির, কারারক্ষী আবদুল ওয়াহেদ, কারারক্ষী মাহফুজুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন (১), দেলোয়ার হোসেন (২), আবদুল ওহাব, লোবেল মিয়া ও চান মিয়াকে। এছাড়াও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয় রাতে দায়িত্বরত কারারক্ষী নজরুল ইসলাম, গোয়েন্দা কারারক্ষী মোহাম্মদ নজরুল ও জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে। গ্রেনেড উদ্ধারের পরই আত্মগোপনে চলে যান কারারক্ষী সোহেল। কারাগারের ব্যারাকে সোহেলের রুম তল্লাশি করে সে সময় উদ্ধার করা হয়েছিল দুই লাখ টাকা। অনুপস্থিতির কারণে সোহেলকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

সিআইডি সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পুনঃতদন্ত শুরু হয়। সিআইডি কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশীট দাখিলের পরই কারাগার থেকে গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনা তদন্ত করা হবে। সে সময় সিআইডি গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে সিআইডির কাছে রিপোর্টও দিয়েছিল। সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বর্ধিত তদন্ত শেষ হলেই জেলখানা থেকে উদ্ধার করা গ্রেনেডরহস্য জানা যাবে। এখন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার চার্জশীট দাখিল, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে শেষ হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে উদ্ধার হওয়া গ্রেনেড ঘটনার রহস্য দীর্ঘ ১৩ বছরের মধ্যে উদ্ঘাটিত হয়নি।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনার মামলা সিআইডি তদন্ত করছে। অতিদ্রুত গ্রেনেডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করেছে, তারাই কারাগারে গ্রেনেডটি রেখেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে কে বা কারা কি উদেশে গ্রেনেড রেখেছিল তা রহস্যাবৃত থাকায় নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে সিআইডি কর্মকর্তার দাবি।