২০ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া ৪শ’ জামায়াতীর ওপর নজরদারি


গাফফার খান চৌধুরী ॥ আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া জামায়াত-শিবিরের চার শতাধিক নেতাকর্মীর ওপর কঠোর নজরদারি চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের তরফ থেকেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। যোগদানকারী জামায়াত নেতাকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারাও রয়েছেন নজরদারিতে। যোগদানের পর পদ-পদবি পাওয়া জামায়াত নেতাদের পৃথক তালিকা করা হয়েছে। পদ-পদবি পাইয়ে দেয়ার পেছনে হাত থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে দলের তরফ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। নজরদারির মধ্যে থাকা জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর অধিকাংশই ব্রাক্ষণবাড়িয়া, যশোর, সাতক্ষীরা ও কুমিল্লার। যোগদানকারী অনেকের বিরুদ্ধেই এখনও জামায়াত, জামায়াতে ইসলামের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ জামায়াতপন্থী বিভিন্ন সংগঠন এবং জামায়াতের সমমনা ১২ টি ইসলামী দলের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ রয়েছে। যদিও জামায়াতে ইসলামের তরফ থেকে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে বলা হচ্ছে; দলত্যাগী নেতাকর্মীর সঙ্গে দলের কোন যোগাযোগ নেই। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এমন খবর মিলেছে। গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সারাদেশে ব্যাপক তা-ব চালায় বিএনপি-জামায়াত-শিবির। যশোরে শত শত হিন্দুর বাড়িঘর, মন্দির ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার পর আগুন দেয়। হতাহতসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব মন্দির, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিজিবিকে দিয়ে গড়ে দেন। এমন ঘটনার পর থেকেই সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। অভিযানে গ্রেফতার নাশকতাকারীদের মধ্যে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক জানান।

সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কৌশল পাল্টায় জামায়াত-শিবির। তারা গ্রেফতার এড়াতে দলে দলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দিতে থাকেন। এরমধ্যে ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা ও যশোরের জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদানের হার সবচেয়ে বেশিী।

পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, যেসব এলাকায় জামায়াত-শিবির সবচেয়ে বেশি তা-ব চালিয়েছে সেসব এলাকার জামায়াত-শিবিরের সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। তবে যোগদানকারীরা তাদের খোলস পাল্টালেও চরিত্র পাল্টায়নি। তারা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার সঙ্গে ব্যাপক সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে ব্যবসা করছে। কিন্তু তারা আগের মতোই জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রীতিমতো গুপ্তচরবৃত্তি করছে। দলের ভেতরের খবর জামায়াতকে আগাম জানিয়ে দিচ্ছে।

এমন ঘটনা ছাড়াও সম্প্রতি নানা কারণেই আলোচনায় এসেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও একাধিকবার জামায়াতের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মুমিনুল হক চৌধুরীর মেয়ে রিজিয়া নদভীর মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়ার বিষয়টি। তিনি গুপ্তচরবৃত্তির মতো কর্মকা-ে জড়িত কিনা সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। রিজিয়া এক সময় ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নেত্রী ছিলেন। রিজিয়ার স্বামী আবু রেজা নেজামুদ্দিন নদভীও এক সময় জামায়াতের রাজনীতি করতেন। চার বছর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স এ্যান্ড স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স শাখার সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগে যোগদানকারী জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর ওপর বিশেষ মনিটরিং অব্যাহত আছে। যোগদানকারীর কেউ ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে স্বার্থ হাছিল করছে কিনা, কেউ ক্ষমতাসীন দল বা অঙ্গসংগঠনের পদ পদবি পেয়েছে কিনা সেটি বিশেষভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। যোগদানকারীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবি পাওয়াদের মধ্যে নাশকতার মামলার কোন আসামি বা দাগী অপরাধী আছে কিনা সেটি বিশেষভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়মিত সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়। এছাড়া যোগদানকারীর মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে তাদের বিষয়ে বিশদ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিধায় কতজন নজরদারিতে রয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে এবং কতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তা কৌশলগত কারণে জানানো সম্ভব নয় বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে গোপনে নিজের দলের লোক ঢুকিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে যাচ্ছে।

এ দু’জনের নেতৃত্বেই ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোঃ মজিবুর রহমান মঞ্জু ও ড. মোঃ রেজাউল করিম, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল এ্যাডভোকেট শিশির মনির, আহসান হাবিব ইমরোজ ও ডাঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় নেতা জাহিদুর রহমান (গ্রেফতারকৃত), ডাঃ লকিয়াত উল্লাহ, আলম শরীফ, ড. আবু ইউসূফ ও ব্যারিস্টার জুবায়ের এবং জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট ড. মিনার, সাবেক সচিব ও জামায়াতে ইসলামের থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত শাহ আব্দুল হান্নান ও ড. মিয়া মোহাম্মদ আইয়ুবের বুদ্ধি-পরামর্শ মোতাবেক নতুন জামায়াত তাদের কর্মকা- চালাচ্ছে। জামায়াতের এই নেতারা তুরস্কের ইসলামী নেতাদের সহযোগিতা পেতে দেশটিতে একটি সেমিনারও করেছিল। তুরস্কের ইসলামী নেতাদের সঙ্গে তারা হোয়াটস এ্যাপে একটি গ্রুপ তৈরি করেছে। সেই গ্রুপের মধ্যে নানাভাবে যোগাযোগ অব্যাহত আছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নতুন জামায়াত তাদের কর্মকা- সাজিয়েছে নির্বাচনকে সামনে রেখে। সে মোতাবেক জামায়াত প্রশিক্ষিত সদস্যদের বিভিন্ন কর্মসূচীর আড়ালে ঢাকা ও গাজীপুরে জমায়েত করছে। ৫ থেকে ৭ জনের সমন্বয়ে ছোট ছোট দল করা হচ্ছে। দলগুলো হচ্ছে অনেকটা সিপি গ্যাংয়ের মতো। তাদের আকিদা, নিরাপত্তা, কৌশল, অস্ত্র পরিচালনা ও বিস্ফোরক ব্যবহারে হাতেকলমে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই অনেক দলের প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ হয়েছে। প্রশিক্ষণ মোতাবেক দলগুলোর কাছে সময়-সুযোগমতো অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহ করা হবে। পরবর্তীতে নির্দেশনা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আত্মঘাতী স্টাইলে হামলা চালাবে দলগুলো। গ্রুপগুলোর নাম রাখা হচ্ছে সাংকেতিক ভাষায়। গ্রুপগুলোর হত্যার টার্গেটে রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। হত্যার পর আইএস’র নামে দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশ করে ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এজন্য প্রযুক্তিগত দিকেও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ চলছে। এসব কর্মকা-ে নানাভাবে মদদ যোগাচ্ছে জামায়াতপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এসব নেতার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত ইসলামী ও সমমনা ১২ দলীয় মোর্চার অনেক নেতাও সম্প্রতি মদদ যোগাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।