২২ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৯ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বঙ্গবন্ধুর খুনীরা যে গর্তেই লুকিয়ে থাকুক ধরে এনে সাজা কার্যকর করা হবে ॥ আনিসুল হক


বঙ্গবন্ধুর খুনীরা যে গর্তেই লুকিয়ে থাকুক ধরে এনে সাজা কার্যকর করা হবে ॥ আনিসুল হক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীরা যে গর্তেই পালিয়ে থাকুক না কেন তাদের খুঁজে বের করে এনে সাজা কার্যকর করা হবে। শনিবার দুপুরে রাজধানীর ধানম-িতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ‘পথচলা ও প্রতিবন্ধকতা’ সংক্রান্ত এক সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তৃতা করছিলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ একুশ বছরেও কোন সরকারই এ নৃশংস হত্যাকা-ের বিচারের জন্য কোন মামলা করেনি বরং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ বন্ধ করে রেখেছিল। শুধু তাই নয়, হত্যাকা-ে জড়িতদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। খুনীদের বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দিয়েছিল। খুনের আলামত নষ্ট করেছিল। এর ফলে খুনীরা বিদেশে শক্তভাবে শেকড় গেড়েছে এবং তাদের ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে।

সেন্টার ফর রিসার্চ এ্যান্ড ইনফর্মেশনের (সিআরআই) ট্রাস্টি রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি বলেন, সিআরআই টিমকে ধন্যবাদ। তাদের সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে আলোচনার সময় আবারও সামনে চলে আসে ইনডেমনিটি বিল প্রসঙ্গ। সময় হঠাৎ মনে আসে, এ বিল সম্পর্কে আসলে আমি কিভাবে জেনেছিলাম। আমার মা শেখ রেহানা এবং খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশে ছিলেন। এ কারণে আমার জন্ম ১৯৮০ সালে লন্ডনে। এরপর ১৯৮২-৮৩ সালে কিছুদিনের জন্য ঢাকায় এলাম। তখন বেশ ছোট ছিলাম। বাবার পিএচডি শেষ হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে আমরা বাংলাদেশে ফেরত এলাম। আমি এখানে এসে একটি স্কুলে ভর্তি হলাম। বনানীতে কেজি ওয়ান, কেজি টু। খুব ভাল লাগত স্কুল। অনেক বন্ধু ছিল। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরা ছিল এ স্কুলে। হঠাৎ করে মা একদিন বললেন, আমার স্কুল বদলাতে হবে। আমি তখন খুব মন খারাপ করলাম। মার সঙ্গে রাগ করলাম। কেন স্কুল বদলাতে হবে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডরা এখানে পড়ছে। তখন মা বলল, এখানে খুনীদের বাচ্চারা পড়ালেখা করছে।

আমি তখন ছোট ছিলাম, অত কিছু বুঝতাম না। আসলে সে সময় এ হত্যাকারীদের কিছু শিশুসন্তান ও আমার স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। স্কুল থেকে বেশ কয়েকবার আমাদের অনুসরণ করে বাসা পর্যন্ত মানুষজন আসে। এ ছাড়াও প্রতিদিন স্কুল গেটে তাদের মুখোমুখি হতে হয়। আর আগের বক্তারাই বলেছেন, সে সময় ফ্রিডম পার্টির মানুষজন কিভাবে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করত। সে কারণেই মা আর আমাকে ওই স্কুলে পড়াতে রাজি হননি।

তখন মার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এরা কোন খুনী? আর যদি খুনী হয়, সবাই জানে, তাহলে তারা এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিভাবে? শিশু হিসেবে আসলে তখন ভাল-মন্দের বাইরে কিছু ভাবতে পারছিলাম না। মা তখন আমাকে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের কথা বলেন। ওই ছোট বয়সেই আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এটা আবার আইন হতে পারে নাকি? একজনকে খুন করে তার বিচার না করার জন্য আইন আবার কিভাবে হয়?

আমার মা-খালা ছোটবেলা থেকেই ১৫ আগস্ট সম্পর্কে আমাদের বলে দিতেন। কোন কিছু লুকিয়ে রাখতেন না। ফলে ছোটবেলা থেকেই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা জানতাম। তারা আমাদের বলতেন, এটা তোমাদের পরিবারের ইতিহাস। জানতে হবে। আর সে কারণেই এ সময় থেকে আমার মাথায় এ অর্ডিন্যান্সের কথা ছিল। এরপর এমন অবস্থা সৃষ্টি হলো যে আমার মা-খালারা দেখলেন এখানে থাকাই তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল। যারা আমার মা-খালাকে চেনেন, তারা জানেন। এ দুজন নিজেদের নিয়ে কখনও ভয় পেতেন না। কিন্তু আমরা তখন ছোট ছিলাম। আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা আবারও দেশের বাইরে চলে গেলেন। এরপর ১৯৯৩ সালে আমরা বাংলাদেশে ফেরত এলাম। তখন আমার বয়স ১২-১৩। বন্ধুদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলাপ হতো। বন্ধুরা তখন অনেকে জেনারেল জিয়ার কথা বলতেন। উনি এই, উনি সেই। যে ব্যক্তি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স পাস করে সে কিভাবে ভাল হতে পারে। এটা আবার কোন্ ধরনের ন্যাশনাল হিরো?

এ সময় অনেকেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স সম্পর্কে জানত না। ’৭৫ সাল নিয়ে সঠিক তথ্য জানত না। অনেক বিষয়েই তারা জানত না। এ সময় আমি আর আমার কিছু বন্ধু বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতাম। অন্যদের বোঝাতাম। এটা আমাদের জন্য সংগ্রাম ছিল।

আমার এখন ভাল লাগছেÑ কারণ আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার সবাইকে জানাতে হতো, এটা জানো নাকি, ওটা জানো নাকি। কিন্তু বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম আমাকে গবেষণা করে আমার নানা সম্পর্কে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে। আমি তাদের কাছ থেকে নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছি। এটা ভাল লাগছে। আজকে মঞ্চে যারা উপস্থিত তারা অনেকেই হয়ত বঙ্গবন্ধুর দেখা পেয়েছেন। কিন্তু আমি তার দেখা পাইনি। আর আমরা যারা দেখা পাইনি তাদের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানা। তার সম্পর্কে জানা এবং অন্যদের জানানো।

জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিচারে প্রকৃত ভূমিকা রাখতে মিডিয়া ব্যর্থ হয়। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। কিন্ত ভবিষ্যত প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের প্রতি মানুষের মাঝে ঘৃণা জাগাতে সমর্থ হবে। তিনি আরও বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে জাগ্রত করতে না পারলে সত্যকে শ্রদ্ধা করা যায় না।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, খুনী নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। তিনি কানাডায় অবস্থানের জন্য সেখানকার আদালতে আবেদন করে হেরে গেছেন, এখন শুধু একটি গ্রাউন্ডে নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছেন। সেটি হলোÑ তিনি কানাডায় আবেদন করেছেন যে, তাকে বাংলাদেশ ফেরত পাঠালে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে। কানাডায় যেহেতু মৃত্যুদ- নিষিদ্ধ তাই কানাডা বাংলাদেশকে বলেছে, তাকে ফেরত দিলে মৃত্যুদ- দেয়া যাবে না। মন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, এ শর্ত কি মানা সম্ভব? তাকে তো আমাদের উচ্চ আদালত মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছে। তিনি বলেন, তারপরও সরকার তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আনিসুল হক বলেন, কে এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তাকে ফেরত আনার জন্য আদালতে রিভিউ করা হয়েছে এবং আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার বন্ধ করতে যারা আইন প্রণয়ন করেছিল বাংলাদেশের জনগণ তাদের শাস্তি দেবে বলে আমার বিশ্বাস। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল আদালতে সবকিছুর বিচার হয় না। কিছু কিছু বিচার সমাজেও করতে হয়। কারণ সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার রহস্য উন্মোচনে আরও গবেষণা ও আলোচনা হওয়া উচিত।

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- প্রতিরোধ করতে অনেকেই তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা কেন ব্যর্থ হয়েছেন এ প্রশ্নের জবাব তাদেরই দিতে হবে।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, জাতীয় সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, ঢাবি উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর দেলোয়ার হোসেন, দৈনিক জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় ও আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি আলোচনায় অংশ নেন।