২০ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সেই মৃত্যু- রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায়


সেই মৃত্যু- রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায়

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ‘পঙ্গুত্বের জীবন যে কী কষ্টের, কী যে ভয়াবহ’- সে কথা পঙ্গু না হলে জানা যায় না। আমার সুন্দর জীবনটা হারিয়ে গেছে। জোড়াতালি দেয়া হাত-পা নিয়ে বেঁচে আছি। সেই মৃত্যু রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। গ্রেনেডের ঘাতক স্পিøন্টারের সঙ্গেই আমাদের নিত্য বসবাস। বিভীষিকাময় সেই ভয়াল দিনটির কথা মনে হলে এখনও মৃত্যু যেন হাতছানি দেয়। বিভীষিকাময় ঘটনাটির নারকীয় স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় সবসময়। তখন জীবনযন্ত্রণা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আরও শক্ত করে। মাথা, বুক, দুই পা, পেট-সর্বাঙ্গে বিঁধে আছে অসংখ্য ঘাতক স্পিøন্টার। শরীরের যেখানেই হাত দেই সেখানেই ঘাতক গ্রেনেডের স্পিøন্টার। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলছে আমাদের নিত্যজীবন।

শনিবার জনকণ্ঠের কাছে এভাবেই আবেগজড়িত কণ্ঠে ১৩টি বছর ধরে সর্বাঙ্গে বিঁধে থাকা ২১ আগস্টের গ্রেনেডের স্পিøন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার কথা জানালেন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী ও বর্তমানে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাসিমা ফেরদৌসী।

১৩ বছর ধরেই হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার কিংবা লাঠি তার একমাত্র অবলম্বন। প্রতিনিয়ত ভয়াল স্পিøন্টারের যন্ত্রণায় দগ্ধ হলেও মনোবল ও সাহস আগেও হারাননি, এখনও অটুট আছে তার। ক্র্যাচ ও লাঠির ওপর ভর করেই সংসদসহ দলীয় কর্মসূচীতে অংশ নিচ্ছেন প্রায় প্রতিদিনই। জীবম্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা নাসিমা ফেরদৌসী তাকে এমপি করে মূল্যায়ন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি যেমন কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, ঠিক তেমনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল নায়ক নরঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দৃঢ়কণ্ঠেই। বলেন, হামলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না করতেন তবে যেটুকু পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারছি, তাও পারতাম না। জার্মানিতে ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ, থেরাপি ও ব্যায়াম দিয়েছেন। অপরাশেন করে স্পিøন্টার বের করতে গেলে যেটুকু হাঁটতে পারছি সেটুকুও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই শুধু কিছু ওষুধ আর থেরাপি চলবে যতদিন বেঁচে থাকব।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে পরিচালিত এ ভয়াল গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি দেখতে দেখতে ১৩টি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিভৎস ও ভয়াল স্মৃতি এতটুকু ম্লান হয়নি সর্বাঙ্গে বিঁধে থাকা স্পিøন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকা আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীর। সেই মৃত্যু-ধ্বংস-রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে। তারা জীবিত থেকেও যেন মৃত। প্রত্যেকের শরীরেই বীভৎস ক্ষতের চিহ্ন। বরং জীবনযন্ত্রণা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাদের আরও শক্ত করে। স্পিøন্টারের বিষক্রিয়ায় শরীরেও দেখা দিয়েছে নানা উপসর্গ। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনও বেঁচে আছেন আহত নেতাকর্মীরা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ এ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে নারী নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এ নারকীয় বীভৎস হামলার ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এর বিচার শেষ হয়নি, শাস্তি পায়নি নরপিশাচ ঘাতকরা।

১৩ বছর আগে ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আহত অধিকাংশ নেতাকর্মীর অনুভূতি প্রায় একই রকম। সময়ের সঙ্গে কষ্টের তীব্রতা এতটুকুও কমেনি তাদের। এ ভয়াবহ রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার অনেকেই আজ পঙ্গু। কেউ চলৎশক্তিহীন। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। অনেকে প্যারালাইজড হয়ে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করছেন, অনেকের জীবনেই এখন ক্রাচই চলাফেরার নিত্যসঙ্গী। অনেকেরই শরীরে রয়ে গেছে অসংখ্য স্পিøন্টারের অস্তিত্ব। অনেকেরই শরীরে দগদগে ক্ষতের চিহ্ন জানান দিচ্ছে সেই ভয়াল দিনের মরণছোবলের বীভৎসতা। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকা আওয়ামী লীগের বেশকিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তারা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গত ১৩ বছর ধরে তাদের দুঃসহ জীবনযাপনের করুণ অবস্থার বর্ণনা দেন।

নাসিমা-দিপ্তী-কাজল-রুমা-পারভীনদের মতো আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ নেতাও দেশে ঘাতক গ্রেনেডের স্পিøন্টার নিয়েও রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রবীণ নেতা আবদুর রাজ্জাক, ঢাকার প্রথম মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সর্বাঙ্গে বিঁধে থাকা স্পিøন্টারের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাসিম এমপি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু এমপিসহ বেশ কজন নেতা-মন্ত্রী ও এমপির দেহেও বিঁধে অসংখ্য ঘাতক স্পিøন্টার। আমৃত্যু তাদের মতো সকল নেতাকর্মীকেই এ জীবনযন্ত্রণা ভোগ করেই পথ চলতে হবে। শুধু এসব নেতাই নন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাকেই গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে যন্ত্রণাদগ্ধ রাজনৈতিক জীবন চালাতে হচ্ছে।

জীবনযন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকলেও ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আহত নেতাকর্মীরা এখন ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। যে দলটিকে নিশ্চিহ্ন করতে ঘাতকরা গ্রেনেড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই দলটি টানা দ্বিতীয়বারের মতো ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। গ্রেনেডের আঘাতে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, ছন্দপতন ঘটিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের- তাদের সবারই এখন প্রত্যাশা- বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে, অধিকাংশ যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। রায়ও কার্যকর হয়েছে। এখন দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ২১ আগস্টের ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হোক।

খোঁজ নিয়ে ও কথা বলে জানা গেছে, ভয়াল গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুজাল ছিন্ন করে প্রাণে বেঁচে গেলেও স্পিøন্টার আহত নেতাকর্মীদের পিছু ছাড়েনি। দীর্ঘ ১৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও এসব মানুষের দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। আমৃত্যু এমন জীবনযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, এটা ভেবেই অসহায়-বেদনার্ত আহাজারি আহত প্রত্যেকের মাঝে। কারোর চোখ নেই, কেউ কানে শোনেন না। কেউ হাত-পা বাঁকা করে সব সময় চলাফেরা করছেন, শরীর সোজা করে এখনও শুতে পারেন না অনেকেই। এমনকি তাদের দেহে একটু স্পর্শ করলেই ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ওঠেন।

আহত অনেক নেতাকর্মীই আলাপকালে তাদের দুঃসহ জীবনযাত্রার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলেননি। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে এ ভয়াল গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা অবস্থাতেও শেখ হাসিনা আহত সবার দেখভাল করেছেন, গুরুতর আহতদের দফায় দফায় বিদেশ পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসা করিয়েছেন। ক্ষমতায় আসার পরও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে এবং বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে আহতদের চিকিৎসা, ওষুধপত্রসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে সবার কণ্ঠেই ছিল ২১ আগস্টের ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার।