১৮ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাখাইন থেকে ফের দলে দলে আসছে রোহিঙ্গারা


মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ কারফিউ জারি করে সশস্ত্র সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর রাখাইন রাজ্য থেকে আবারও দলে দলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে এসেছে তিন শতাধিক। এর আগের সপ্তাহে দুই শতাধিক। সব মিলে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা নরনারী ও শিশুর অবৈধ আগমন ঘটেছে কক্সবাজার অঞ্চলে। আবার বিজিবি সদস্যরা পুশব্যাক করেছে দুই শতাধিক।

সীমান্তের ওপার থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফের গোলযোগ দেখা দেয়। সশস্ত্র একটি সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হাতে ৬ বৌদ্ধ নারী- পুরুষের প্রাণহানির ঘটনার পর এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখানকার মংডু ও বুচিদং শহরে সেনা মোতায়েন এবং ১২ আগস্ট থেকে জারি করা হয় কারফিউ। এর দুদিন পরই রাচিদং শহরেও অনুরূপ ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা পুরুষদের ওপর মারধরসহ নানামুখী অত্যাচার শুরু হয়েছে। ভীতসন্ত্রস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আবারও পালানোর পথ বেছে নিয়েছে। যার কারণে ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হয়েছে। টেকনাফের হ্নীলা, নাইক্ষ্যংপাড়া, লেদা, উনচিপ্রাং, হোয়াইকং এলাকা দিয়ে অবৈধ পথে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে। বিজিবি সদস্যরা একই পথে এদের পুশব্যাকের তৎপরতায় লিপ্ত। তারপরও ফাঁকফোকর গলিয়ে এরা চলে আসছে। টেকনাফের শাপলাপুর, উখিয়ার বালুখালি ও কুতুপালং বস্তিতে এরা আশ্রয় নিয়েছে।

অপরদিকে, এদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠী ওপার থেকে রোহিঙ্গাদের আসার পথ বাতলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এদের আশ্রয়ের জন্য নিজেদের উদ্যোগে আশ্রয়স্থলও নির্মাণ করা হয়েছে। টেকনাফ বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, টেকনাফ সীমান্তজুড়ে বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করায় সে দেশের সরকারের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এ ধরনের সেনা সমাবেশ বৃদ্ধির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদও জানানো হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের পাুলিশ প্রধান কর্নেল সেই লুইনের একটি বক্তব্য পাওয়া গেছে। সেটি হচ্ছে, রাখাইনের সশস্ত্র বিদ্রোহীরা সর্বশেষ যে হত্যাকা-টি ঘটিয়েছে, সে কারণে ওসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের দমনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের খবরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যখনই রোহিঙ্গাদের অবৈধ পথে প্রবেশের বিষয়টি ঘটছে প্রথমে পুশব্যাক করা হচ্ছে। গেল জুলাই মাসের তথ্য দিয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২২ নৌকাযোগে দুই শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের একটি দলকে আটকে দিয়ে তাদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন জানিয়েছেন, আবারও নতুন করে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটছে বলে জানতে পেরেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মিয়ানমারের বুচিদং থেকে বুধবার বাংলাদেশে চলে এসে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয়গ্রহণকারী মোঃ তাহের জানিয়েছেন, সেখানার সেনা সদস্যরা জঙ্গীদের তল্লাশির নামে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে অভিযান চালাচ্ছে। সঙ্গে চলছে নানামুখী নির্যাতন। তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা নির্যাতিত হয়েই এদেশে পালিয়ে এসেছেন।

গত শনিবার মংডু ও বুচিদংয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বলবত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। রোহিঙ্গারা দিনেরবেলায়ও বের হচ্ছে না। যেসব রোহিঙ্গা কাঁথা, বালিশ ও হাঁড়িপাতিল নিয়ে সীমান্তমুখী হচ্ছে মিয়ানমারের বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ) তাদের বাধা দিচ্ছে না। রোহিঙ্গা সদস্যদের অনেকে বলেছেন, মিয়ানমার সরকারের পক্ষে বাংলাদেশে চলে আসতে তাদের কোন বাধা দেয় না। কিন্তু ফিরে যেতে চাইলে দমন-নিপীড়ন চালায়। এছাড়া শত নির্যাতনের পরও যারা বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি নিয়ে থাকতে চাইছে তাদেরকে প্রতিনিয়ত নানামুখী পন্থায় নির্যাতন চালাচ্ছে।

রাখাইনে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়াসহ এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বিভিন্ন দেশকে যুক্ত করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। শরণার্থী আসিফ মুনীর বলেন, মিয়ানমার কোন ধরনের নমনীয় অবস্থান দেখাচ্ছে না। আমরা চাই দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান না হলে, ত্রিপক্ষীয় কিংবা বহু পাক্ষিক আলোচনা হোক। দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্তর্জাতিক মহল এ বিষয়ে কার্যকর কোন ভূমিকাই রাখছে না।

রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারের অজুহাতে মিয়ানমার গত সপ্তাহখানেকের মধ্যে রাচিদং, বুচিদং ও মংডুতে সহস্রাধিক সৈন্য মোতায়েন করেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। দেশটির মায়ু নদীর আশপাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেনাবাহিনী। সম্প্রতি ৬ বৌদ্ধ নারী-পুরুষ হত্যাকা-ে রাখাইনে চরমপন্থী সংগঠন আল ইয়াকিন, আরএসও এবং আরসার (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) জড়িত সন্দেহ করে ওসব সংগঠন সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে আসছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। গত বছরের ৯ অক্টোবর পুলিশের তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা, অস্ত্র লুট ও ৯ পুলিশকে হত্যা ঘটনার জের ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। প্রাণে বাঁচতে ইতোমধ্যে একলাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সভাপতি দুদু মিয়া জানান, গত তিন দিনে রাখাইন থেকে অন্তত ৫০ পরিবারের প্রায় দেড় শ’ রোহিঙ্গা টেকনাফ পৌঁছেছে। এরা বস্তি ও আশপাশের গ্রামে আপাতত আশ্রয় নিয়েছে। উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তির সভাপতি আবু সিদ্দিক জানান, সেখানে গত দুই দিনে আশ্রয় নিয়েছে নতুন আসা ৫০ রোহিঙ্গা। আরাকান বিদ্রোহী সংগঠনের কতিপয় নেতা আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংস্থার সঙ্গে চক্রান্ত করে মিয়ানমার থেকে ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: