২১ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জঙ্গী সাইফুলের দশ বারো সহযোগীর কোড নাম মিলেছে


শংকর কুমার দে ॥ রাজধানীর পান্থপথে ওলিও হোটেলে আত্মঘাতী হয়ে নিহত হওয়া নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য সাইফুল ইসলামের সঙ্গে থাকা আরও দশ-বারো জঙ্গীর কোড নাম পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। নিহত সাইফুল বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিহত হওয়ার সময় তার মোবাইল ফোন সেটটি ভেঙ্গে চর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলেও তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট থেকে সহযোগী জঙ্গীদের নামগুলোও উদ্ধার করেছে তদন্তকারীরা। আত্মঘাতী জঙ্গীরা কোথায়-কখন-কিভাবে হামলা করবে তদন্তে পাওয়া গেছে তার কোড নাম। জঙ্গী সাইফুল রাজধানীর পান্থপথে হোটেলে ওঠার সময়ে তার নাম ব্যবহার করেছিল খায়রুল। কিন্তু ভুলবশত স্বাক্ষরের সময়ে সাইফুল নাম লেখায় তাকে শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। শোক দিবসের নিরাপত্তায় থানা পুলিশের ব্লক রেইডের সময়ই জঙ্গী সাইফুল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে আটকা পড়ে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, আত্মঘাতী জঙ্গী সাইফুলের জঙ্গী হামলার পরিকল্পনা ও আত্মঘাতী হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে নব্য জেএমবি জঙ্গী সংগঠনটির তৎপরতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তার মোবাইল ফোনের কললিস্টে তার সহযোগী যেসব জঙ্গীর নাম পাওয়া গেছে তাদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে চিহ্নিত করার জন্য মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা। সাইফুল যখন আত্মঘাতী হয় তখন তার সহযোগী জঙ্গীরা আশপাশেই ছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। সহযোগী জঙ্গীরা রাজধানী ঢাকা কিংবা আশপাশের এক বা একাধিক জঙ্গী আস্তানায় আত্মগোপন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। শোকের দিবস ১৫ আগস্টে ধানম-ির ৩২ নং বাড়িতে ও শোক র‌্যালিতে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা করতে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে উঠেছিল নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য জঙ্গী সাইফুল। মঙ্গলবার সকালে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের চতুর্থ তলায় পুলিশের ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামের জঙ্গী অভিযানের সময় আত্মঘাতী হয় জঙ্গী সাইফুল ইসলাম।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়াও বলেছেন, রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে জঙ্গী সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আরও কয়েক সহযোগী ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশে এদের অবস্থান ছিল। প্রাথমিকভাবে জঙ্গী সাইফুলের সহযোগীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তার সহযোগীদের ধরতে গোয়েন্দারা কাজ করছেন। সাইফুল নব্য জেএমবির সদস্য ছিল। সাইফুল মাত্র কিছুদিন আগেই জেএমবিতে যোগ দিয়েছিল। তাকে ইত্তেহাদী হামলার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছিল। হোটেল ওলিওর ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে সাইফুলের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। তাই কম সময়ের মধ্যেই তার পরিচয় জানা গেছে বলে ডিএমপি কমিশনারের দাবি।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নিহত সাইফুলের মোবাইল ফোন সেটটি ভেঙ্গে গেলেও তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করে ঘটনার দিন ঘটনাস্থলের আশে পাশে যেসব সহযোগী ছিল তার নাম পাওয়া গেছে। এই নামের তালিকা থেকেই নিশ্চিত হয়েই সাইফুলের সঙ্গে যে সহযোগী ছিল তা জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করে কিছু কোড নেম পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এসব কোড নেম খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। তবে ঘটনার দিন বা আগে নিহত সাইফুলের সঙ্গে কার কি কথা হয়েছিল তার অডিও পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। নিহত সাইফুল সম্পর্কে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জামায়াতÑশিবিরের ক্যাডাররাই এখন নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়ে আত্মঘাতী হচ্ছে। নিহত সাইফুল ইসলামও শিবির ক্যাডার ছিল বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। একুশ বছর বয়সী সাইফুলের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায় সাহস ইউনিয়নের নোয়াকাটি গ্রামে। তার বাবা আবুল খায়ের মোল্লা নোয়াকাটির মাঠেরহাট মসজিদের ইমাম। আবুল খায়েরের এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সাইফুল সবার বড়। পাইকগাছার একটি মাদ্রাসা থেকে হাফিজি পাস করে সে। খুলনার বিএল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিল সাইফুল। জঙ্গী বিরোধী অপারেশনের সময় সাইফুল তার শরীরে বাঁধা সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। তদন্তকারীদের কাছে যে প্রশ্ন সামনে এসেছে তা হচ্ছে, জঙ্গীদের ব্যবহারের জন্য বোমাগুলো তৈরি করছে কারা? নব্য জেএমবির শীর্ষ অনেক নেতা বোমা তৈরিতে দক্ষ। দক্ষ বোমা প্রস্তুতকারী জঙ্গীরা গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে হয় ধরা পড়েছে, নয়ত অভিযানে নিহত হয়েছে। কিন্তু এরপরও জঙ্গীদের বোমাগুলো তৈরি করছে কারা সেই প্রশ্ন সামনে রেখেই বোমা প্রস্তুতকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলছেন, নিহত সাইফুলের সঙ্গে সহযোগী ছাড়াও অন্তত ৪-৫ জনের নাম পাওয়া গেছে, যারা বোমা তৈরিতে দক্ষ এবং দীর্ঘ দিন ধরে পলাতক। পলাতক বোমা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম হলো হাদিসুর রহমান সাগর। হাদিসুর রহমান সাগর হচ্ছে, গুলশান হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড। এ ছাড়াও সাগর পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত নূরুল ইসলাম মারজান ও সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া আরেক মাস্টারমাইন্ড হাতকাটা সোহেল মাহফুজের আত্মীয়। সাগর বেশ কয়েক বছর ধরে পলাতক থেকে নব্য জেএমবির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। তবে শোক দিবসের আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার ছক কষার সঙ্গে পলাতক সাগরের কোন যোগাযোগ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।