২০ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাজনৈতিক দলগুলোকে ইসির আস্থায় আনার পরামর্শ


স্টাফ রিপোর্টার ॥ আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রধান দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ইসির আস্থায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বের করতে হবে। এছাড়া প্রবাসীসহ সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, নির্বাচনী আইনের সঠিক ব্যবহার, নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার রোধ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিকরা। বুধবার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইসির সম্মেলন কক্ষে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা। সংলাপে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক এবং সিনিয়র সাংবাদিকসহ ২৬ জন গণমাধ্যম প্রতিনিধি অংশ নেন। আজ বৃহস্পতিবার ইলেক্ট্রনিক এবং অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইসি।

গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে বুধবার প্রথম দিনের সংলাপে আগামী জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং না ভোটের বিধান রাখার পক্ষে বিপক্ষে মত দিয়েছেন অনেকে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে যারা মত দিয়েছেন তাদের অভিমত হলো পুলিশ, বিডিআর র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হচ্ছে ইসি। এজন্য আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন না করলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। অন্য পক্ষের মত হলো সেনাবাহিনী জাতীয় দুর্যোগকালীন বা জাতীয় বিপর্যয়ের সময়েই কেবল ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোন প্রয়োজন নেই। অন্যান্য আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব। এছাড়া সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে অন্য আর একটি পক্ষের মত হলো নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হবে। এটা করতে নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে তাহলে ইসি অবশ্যই সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেবে। আর যদি তারা মনে করে সেনাবাহিনী ছাড়াই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব তাহলে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই।

এছাড়াও না ভোটের বিধান নিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে পক্ষে বিপক্ষে জোরালো মত এসেছে। এক পক্ষ মত দিয়েছে ভোটে না ভোটের বিধান রাখা উচিত হবে না। এই বিধান রাখা হলে প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। বিগত নির্বাচনে না ভোটের বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু না ভোটের পক্ষে কতজন ভোটার ভোট দিয়েছেন তা জানার সুযোগ হয়নি। না ভোটের বিধান রাখায় জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। অন্য পক্ষের মত হলো একজন ভোটারের তার প্রার্থী পছন্দ না হলেও তার অধিকার রয়েছে এর বিপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার।

এছাড়া সাংবাদিকরা নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার রোধে ইসির কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছেন। নির্বাচনী ব্যয় সীমা যথাযথভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়াও তারা পরামর্শ দিয়েছেন এই মুহূর্তে ব্যাপকভাবে সামীনা নির্ধারণ করা হলো আইনী জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে ইসি। শুধুমাত্র ছিট মহলের ক্ষেত্রে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন নেই।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল একটি ভাল গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সুষ্ঠু নির্বাচনের উপায় বের করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। কেবলমাত্র প্রয়োজন হলেই কমিশন সেনাবাহিনী ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া তিনি নির্বাচনের সব পর্যায়ে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার পরিচয়ে কেউ যাতে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে আস্থা অর্জন এবং দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা তা বড় দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি না ভোটের বিপক্ষে মত দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা বলেন।

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনই সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কমিশনের আস্থায় আনতে হবে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এক্ষেত্রে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনের আগে তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগামী সিটি নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য টেস্ট কেস। এর ওপর তাদের পরবর্তী সফলতা নির্ভর করছে।

শ্যামল দত্ত বলেন, নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ইসির স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। এমন আচরণ করতে হবে যাতে জনগণের আস্থা তৈরি হয়। আস্থা অর্জনে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। নির্বাচনের পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের জন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, “সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির বিষয়ে মতামত দিয়েছি। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে কমিশনকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান জানান, জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন সমর্থন করেন না তিনি। সেই সঙ্গে নাম সর্বস্ব পর্যবেক্ষক সংস্থাকে যেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ না দেয়া হয়। তিনি বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর জানান, এখন থেকেই সবার জন্যে সমান সুযোগ তৈরি করতে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইভিএম নিয়ে সব দলের সঙ্গে আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, বিদ্যমান সীমানাতেই ভোট করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জনসংখ্যার ভিত্তিতেই সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী কোন দল যাতে নিবন্ধন না পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জামায়াত যাতে অন্য কোন নামে বা অন্য কোন ফরমেটে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে আইনী উদ্যোগ নিতে হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং দেন ইসি সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সব পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত জানার জন্য ধারাবাহিকভাবে সংলাপের আয়োজন করেছে। এই সংলাপ থেকে যেসব মতামত কিংবা সুপারিশ আসবে, সেসব বিষয় নিয়ে ইসি কমিশনাররা আলাদাভাবে বসে তাদের করণীয় নির্ধারণ করবেন। সংলাপের মাধ্যমে কমিশন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি এবং কীভাবে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে, তা নির্ধারণই এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য।

এছাড়া তিনি সাংবাদিকদের পরামর্শ সম্পর্কে বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নামে দেশী-বিদেশী সংস্থার প্রভাব ঠেকানো, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ইংরেজী থেকে বাংলায় সহজপাঠ্য করে লেখা, ভোটে যেন কোন প্রার্থী একক প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন কমিশনকে সে বিষযে নজরদারি করা; নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া; নির্বাচনে অতিরিক্ত টাকা কিংবা পেশিশক্তির ব্যবহার যাতে না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা; নির্বাচনে কোনভাবেই যেন ধর্মের ব্যবহার না করা হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা; অনলাইনে; প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ব্যবস্থা করা; নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করার সুপারিশ এসেছে বুধবারের বৈঠক থেকে। বুধবারের সংলাপে যেসব সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন নূরুল কবীর, সাইফুল আলম, আশিস সৈকত, মোস্তফা কামাল, মতিউর রহমান চৌধুরী, খন্দকার মুনীরুজ্জামান, শ্যামল দত্ত, নাঈমুল ইসলাম খান, নঈম নিজাম, আনিস আলমগীর, মোঃ শফিকুর রহমান, ফরিদা ইয়াসমিন, সামশুল হক, মনজুরুল আহসান বুলবুল, ওমর ফারুক, মোঃ আব্দুল্লাহ, মাহফুজউল্লাহ, কাজী সিরাজ, আনিসুল হক, আমানুল্লাহ কবীর, গোলাম মর্তুজা, বিভুরঞ্জন সরকার, মাহবুব কামাল, সোহরাব হাসান, কাজী রোকনুদ্দীন আহমদ প্রমুখ।