১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

পলাতক খুনীরা


বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনীদের দ্রুত ধরে এনে রায় কার্যকরের দাবি আবারও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এই দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা, সেমিনার, মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক ঘটনা। একটা কালো অধ্যায়। এখনও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক ছয় খুনীর রায় কার্যকর বাকি। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। কেবল আগস্ট মাস এলেই যেন বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় দেখা দেয়। আইনমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের জন্য সরকার কাজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, খুনীরা কে কোন্ দেশে অবস্থান করছে তা চিহ্নিত করা গেছে। খুনীদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে।

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। এরা হলো কর্নেল (অব.) ফারুক, কর্নেল (অব.) শাহরিয়ার রশীদ, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন (ল্যান্সার), মেজর (অব.) বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) মহিউদ্দিন (আর্টিলারি)। খুনীদের একজন আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুইয়েতে মারা যায়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ছয় খুনী এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা হলো লে. কর্নেল (বরখাস্ত) আবদুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) নূর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। জানা যায়, লে. কর্নেল রশিদ অবস্থান করছেন লিবিয়ার বেনগাজি শহর ও পাকিস্তানে। মেজর ডালিম ব্যবসাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কেনিয়া, লিবিয়া ও পাকিস্তানে আসা-যাওয়া করে। ক্যাপ্টেন মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম বর্তমানে পাকিস্তান ও লিবিয়ায় রয়েছে। লে. কর্নেল রাশেদ যুক্তরাষ্ট্রে এবং মেজর নূর চৌধুরী পালিয়ে আছেন কানাডায়। নিজেদের রক্ষা করতে বারবার এরা বিভিন্ন দেশ বদল করছে।

১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে পলাতক খুনীদের ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে নবায়ন প্রক্রিয়া আপডেট করেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবার নতুন করে নবায়ন করা হয়। এর আগে বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বন্দী বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে ব্যাঙ্কক থেকে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে মহিউদ্দিন আহমেদকে (ল্যান্সার) দেশে ফেরত আনা হয়। প্রশ্ন হলোÑ কয়েকজনের অবস্থান নিশ্চিত হবার পরও কেন তাদের দেশে ফেরত আনা যাচ্ছে না? কেন দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর বন্দী বিনিময় চুক্তি হচ্ছে না?

বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ খোদ সরকারের ভেতরে এখনও খুনীদের সহায়তাকারীরা ঘাপটিমেরে আছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে ফিরিয়ে আনার কোন তৎপরতা শুরু হলেও এক পর্যায়ে তা থেমে যায়। একথা সত্য যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার মোটিভ এখনও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজা হয়নি। কেবল হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত ও বিচার করা হয়েছে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের মূল নায়কদের আজ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়নি বা যায়নি। এমন কি খুনীদের পুনর্বাসনকারীদের চিহ্নিত করা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যে কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের বহু অজানা ঘটনা গত ৪২ বছরেও প্রকাশ হয়নি।

বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। জননন্দিত নেতা হিসেবে তাঁর তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালবাসা এবং দায়বোধ তাঁকে মহীরুহে পরিণত করেছিল। ব্যক্তি শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা। সেই মহান নেতার চিহ্নিত-সাজাপ্রাপ্ত হত্যাকারীরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আর কথায় নয়, এখনই আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুনীদের ধরে আনার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হোক, তাদের সাজা কার্যকর করা হোক। শুধু তাই নয়, হত্যার নেপথ্যের মূল নায়কদের এবং এ দেশে তাদের পুনর্বাসনকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক- এই প্রত্যাশা সবার।