১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সিডনিতে বাংলাদেশ মিশন ॥ জয়তু বঙ্গবন্ধু


মাঝে মাঝে ভাল খবর আসে হাওয়ায় উড়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যারা পছন্দ করেন না তারাও জানেন, তিনি কিছু করতে চাইলে সেটা হয়। ভয় পাওয়ার আদমি তিনি নন। সব বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি থাকা দরকার; না থাকলেও সময় এবং পরিবেশের কারণে রাজনীতির দুুর্বলতায় সেটা রাখতে হয় তাঁকে। এই যে এখন তিনি সিডনিতে বাংলাদেশ মিশনের জন্য সায় দিলেন, অনুমোদন দিলেন; এর জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের কৃতজ্ঞতা থাকবে আজীবন। সিডনি এখন নয় নয় করে হাজার হাজার বাংলাদেশীর পদভারে কম্পিত এক শহর। আগে, মানে একুশ বছর আগে, যেখানে একটি বা দুটি বাংলা দোকান, তাও ভারতীয় পণ্যে ঠাসা সেখানে এখন অজস্র বাংলাদেশী দোকান এবং বাংলাদেশী পণ্য ভারতীয় দোকানের সামনের সারিতে জায়গা করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতি এবং জায়গা করে নেয়ার পরও যারা আওয়ামী লীগ বলতেই সমালোচনা আর বিদ্রƒপ করেন তাদের কাছে জানতে চাই, খালেদা জিয়ার সরকার কি সিডনির বাংলাদেশীদের জন্য এমন কিছু করার কথা ভেবেছিল কখনও?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত যতটা আনন্দের ততটা চিন্তার কারণও বটে। চিন্তার কারণ এজন্যে এখন আমরা কোথাও ঐক্যবদ্ধ না। এখানে দেশের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন আছে কি নেই সে তর্কে না গিয়েও বলি, চলছে, সমানে চলছে দলবাজি। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে একাধিকবার দেশ শাসনে থাকার সুবাদে গড়ে উঠেছে সুবিধাবাদী মহল। আগে যারা করতেন তারা তো আছেনই, যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। এই সেদিন আরেকটি আওয়ামী লীগের জন্ম হলো সিডনিতে। অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগ নাম হলেও, মূলত সবই সিডনিকেন্দ্রিক। যেহেতু এখানেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশীদের বসবাস, এই শহরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় রাজনৈতিক কর্মকা-। ভাবতেও অবাক লাগে, কেন এ দ্বিধাবিভক্তি। যারা নতুনভাবে করলেন তাদের আগে আরও একটি দল ভাঙ্গনের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগের শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেটিসহ মোট তিনটি আওয়ামী লীগ থাকার কি আদৌ কোন যুক্তি আছে? একসময় আমরা বলতাম কেবল বঙ্গবন্ধু পরিষদই যথেষ্ট। এর সঙ্গে যেহেতু জাতির জনকের নাম ইমেজ সংস্কৃতি ও সম্ভাবনা জড়িত এটি থাকলেই বিদেশে যথেষ্ট। সেই গৌরব এখন অস্তমিত। ভাঙ্গনের শিকার বঙ্গবন্ধু পরিষদগুলোতে এখন পরিষদ আছে, বঙ্গবন্ধু নেই। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল নামের সংগঠনটি অলিম্পিক পার্কে মেলা করে আর অন্যটি জলাশয়ের ধারে। এই যা পাই আমরা!

যারা এখানে মূল আওয়ামী লীগ বলে দাবি করেন তাদের কারণেই এই বিভক্তি। আমি কোন ডিটেলসে যাব না। শুধু মনে করব, এদের আচরণে আমরা যে পরিমাণ অপমানিত হই বিএনপি বা জামায়াতও তা করে না। বরং তারা বাহ্যিকভাবে সম্মানের সম্পর্ক বজায় রাখে। আর মূল নামে পরিচয় দেয়া আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের যে প্রহার করেন না এটাই ভাগ্য। এই মারমুখিতা ঢাকার নেতাদের প্রশ্রয় ও সুযোগ দেয়ার কারণে বাড়ছে। খোদ দেশে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠতায় এক ছাদের তলায় থাকলেও কেউ কারও না। সে আঁচ, সেই ভাঙ্গন এসে লাগে বিদেশে। যে কারণে যার যার লবিং আর নেতার কারণে সার্বিক টিকে থাকে বটে, তবে ঐক্য টেকে না।

আজ যখন সিডনিতে মিশন হবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, আমরা স্বাভাবিকভাবেই ভয়ার্ত এর দলীয়করণ নিয়ে। কারণ যারা এতদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির নামে বিদেশে দেশের রাজনৈতিক দল করছেন তারা নিশ্চয় ছেড়ে কথা বলবেন না। তাদের একটা ধারণা বদ্ধমূল, সরকারী দল করাই মানে পদ-পদবি পাওয়া। সেটা হতে পারে। যদি যোগ্য মানুষ থাকেন কেন তিনি পদ পাবেন না? তবে এটা মনে রাখতে হবে এমন পদ-পদবি কচুপাতার পানি। আরেক সরকার এলে তখন পালানোর পথ থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে সে ভুল করবেন বলে মনে করি না। তাছাড়া যিনি দল করেন, তিনি তো বলেই দিয়েছেন তিনি একটি দলের। সাধারণ মানুষ তো আওয়ামী লীগের ভোটার আর সমর্থক, তারা তো দল করেন না। তাই তারা চান সুন্দর স্বাভাবিক নম্র আচরণ। মেধাবী মানুষের হাতে এর দায়িত্ব না গেলে সিডনির মিশন দেশ ও দলকে ভোগাবেই। যতদূর জানি এর মূল দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ হাইকমিশনের হাতে।

হাইকমিশনার মহোদয় নিঃসন্দেহে অভিজ্ঞ ও সফল কূটনীতিক। কিন্তু এ যাবৎ যা দেখছি তাতে মনে হয় তাদের সীমা গুটিকয় ব্যক্তি আর পরিচিতি বলয়ের বাইরে পা রাখতে পারেনি। ফলে কিভাবে আশা করব, সিডনি মিশনের বিষয়ে তারা উদার বা অকৃপণ হবেন?

মূলত আমরা কি চাই? কি চায় পরবাসী বাংলাদেশীরা? তাদের চাওয়া খুব সীমিত। তারা ভিসা বা পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে সহজ সমাধান চায়। চায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সেবা। কেউ যেন তাদের আগের মতো ইলিশ মাছ বা শুঁটকি নিয়ে আসতে না বলে। কেউ যেন তাদের ফোন ধরে বিরক্তি প্রকাশ না করে। কেউ যেন তাদের ধমকের সুরে ভয় লাগিয়ে না দেয়। কথাগুলো অনুমান না। হাইকমিশনার যখন সিডনিতে মতবিনিময়ের জন্য এসেছিলেন তখন কজন সাধারণ অথচ প্রয়োজনীয় বাংলাদেশী সরাসরি এসব বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় বললাম এ কারণে, এরাই দেশে টাকা পাঠায়। এরাই দেশের মাল বিদেশে এনে ব্যবসা করে, এরাই টকা দিয়ে সাহায্য করে। এরা দেশে জমি বা সম্পত্তি বানানোর জন্য দল করে না। আমরা কিভাবে তাদের বিশ্বাস করব যাদের উদ্দেশ্য দলের নাম ভাঙ্গিয়ে আখের গোছানো। আমি একথা চোখ বুজে বলতে পারি, দল বড় দল ভারি বলে আওয়ামী লীগের সমস্যাও গভীর। এখানে নানা মুনি, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ছদ্মবেশী মোশতাক, সুযোগসন্ধানী তরুƒণ সবাই আছে। কাজেই মিশন যেন তার খপ্পরে না পড়ে।

আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার অনুমোদন পাবার একটা কথা বার বার মনে পড়ছিল কতটা সার্থক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি যখন দেশ স্বাধীনের ডাক দিয়েছিলেন দেশের চতুর মানুষরা ধরে নিয়েছিল হবে না। দেশ স্বাধীন করার সামর্থ্য নেই আমাদের। তারপর যখন স্বাধীন হলো; এরা বলল, পারবে নাÑ দেশ শাসন এত সহজ কিছু না। আর এখন তার কন্যার উন্নয়ন বা শক্তিকেও এরা নিতে পারেন না। অথচ এরাই সুবিধাভোগী। দেশের মতো বিদেশেও এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের প্রথম কাজ হবে আওয়ামী লীগের আমলে বলে এ মিশনের বিরোধিতা ও খুঁত ধরা। তারপর তারা শুরু“ করবে বদনাম দেয়ার ষড়যন্ত্র। এসব মাথায় রেখেও বলি, কত বিশাল এক মানুষের জন্ম হয়েছিল পদ্মা পারে। যাঁর আলো, যার আভা, যার দ্যুতি আজ সিডনি তথা প্রশান্তপারেও আমাদের পতাকা আর অস্তিত্বকে বড় করে তুলছে।

বঙ্গবন্ধু আপনি আমাদের বাতিঘর। আপনি আমাদের প্রণতি গ্রহণ করুন, শুভ হোক সিডনিতে বাংলাদেশ মিশনের জন্মলগ্ন।