মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ আগস্ট ২০১৭, ৯ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

কালো ব্যাজ বুকে নিয়ে জন্মদিনের আলোচনা কষ্টের

প্রকাশিত : ১২ আগস্ট ২০১৭
  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

গত সপ্তাহে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ও প্রয়াণের সহযাত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৮তম এবং তাঁদের জ্যেষ্ঠপুত্র মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের ৬৯তম জন্মদিনের দুটি সেমিনারে অংশ নিতে গিয়ে বলতে পারিনি- ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ বা লং লিভ বঙ্গমাতা, লং লিভ শেখ কামাল’। বরং বলতে হয়েছে ‘আমরা আপনাদেরসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শহীদানের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।’

বঙ্গমাতার জন্ম ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট। খুব ছেলেবেলায় অর্থাৎ শৈশবেই পিতৃ-মাতৃহীন হন এবং মাত্র তিন বছর বয়সে খেলার সাথীর মতো বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে এই পরিবারে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুনের আদর-যতেœ বড় হন। শেখ কামালের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট। লক্ষ্য করার বিষয় হলো ১৯৭৫ সালের এই আগস্ট মাসেই ঘটে ইতিহাসের নির্মম হত্যাকা-। কেবল বঙ্গবন্ধু নন, তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালসহ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাসভবনে অবস্থারত পরিবারের সকলকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশ মিলিটারির বিপথগামী সদস্যরা। অন্য বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়দের। সেদিন দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম ওয়াজেদ আলী মিঞার সঙ্গে জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। ড. ওয়াজেদ সেখানে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণারত ছিলেন।

লক্ষ্য করুন এই শোকের মাসে বঙ্গমাতা ও শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা কষ্টের ব্যাপার। অন্তত কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব ব্যাপার। সবাই তো আর খালেদা জিয়া নন যে, ভুয়া জন্মদিন ঘোষণা করে ১৫ আগস্ট জন্মদিনের উৎসব করবেন। এ দিন সত্যিকার জন্মদিন হলেও তার উৎসব করা উচিত নয়। একজন সাধারণ নাগরিকও এ দিন নিজের সত্যিকার জন্মদিন পালন করে না বা করতে রুচিতে বাধে। তিনি তো আর সাধারণ নারী নন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তার মধ্যে ভব্যতা থাকা উচিত। অবশ্য এর জন্য শিক্ষা, পরিবেশ ও ঐতিহ্য থাকতে হয়।

এই শোকের মাসে দুটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানই আয়োজন করেছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শেখ কামালের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধুরা। এ উপলক্ষে তারা ‘সতীর্থ-স্বজন প্রকাশনা’ নাম দিয়ে ‘সতত প্রেরণাদায়ী বঙ্গমাতা’ ও শেখ কামাল ‘উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত’ শিরোনামে দুটি সংকলনও প্রকাশ করে।

৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত বঙ্গমাতার জন্মদিনের সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা। আলোচনা করেন হুইপ মাহবুব আরা গিনি, কবি কাজী রোজি এমপি, আমি ও কয়েকজন। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন দর্শন আলোচনা বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। তিনি ছিলেন শাশ্বত বাঙালী নারীর প্রতীক। তার সঙ্গে তুলনা হতে পারে কেবল অপর মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের। যদিও দুজন দুই ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত অবরোধবাসী নারীদের মধ্যে শিক্ষার আলো দিয়ে সংসার ধর্মের বাইরেও যে সমাজে, রাষ্ট্রে নারীদের করণীয় আছে তার পথ দেখিয়েছেন, অপরজন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক সংসার এবং রাজনৈতিক সংসার দু’টিই সমভাবে সামলেছেন। বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন। বেগম মুজিব কখনও তাঁকে পিছু টানেননি। বরং শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও যেমন ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংসার ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ছাত্রলীগ নেতাদের দিকনির্দেশনার পাশাপাশি অর্থেরও জোগান দিয়েছেন। সেজন্য নিজে যেমন শাশ্বত বাঙালী মুসলমান গৃহবধূর মতো সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন, পোশাক-আশাকও তেমনি সাধারণ এবং রুচিসম্মত। এক মুহূর্তের জন্যও মাথার কাপড় সরত না। যে কারণে অনেক সময় অর্থাভাবে ছেলেমেয়েদের খাবার থালায় খিচুড়ির বাইরে কিছু দিতে পারেননি। এ জন্য ঐ পরিবারে কোন আফসোস ছিল না। বরং লেখাপড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা প্রাধান্য পেত। এমনকি বঙ্গবন্ধু বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বাঙালী জাতি রাষ্ট্রের পিতা বা রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী হবার পরও অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হবার পরও বেগম মুজিবের পোশাক পাল্টায়নি, গায়ে বিদেশী শিপন ওঠেনি। ঠিক একইভাবে দেখা গেছে তাঁদের আদরের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসতেন সাধারণ সূতি শাড়ি পরে। শেখ কামালকেও কখনও ইনশার্ট করে ক্যাম্পাসে আসতে দেখা যায়নি। ছিল ওপেন ফুলহাতা টি-শার্ট, প্যান্ট আর পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল বা স্যান্ডেল সু। কোনদিন তাকে শুট পরতে দেখা যায়নি। ছাত্রলীগ করতেন; কিন্তু কোনদিন নেতৃত্বের আসনে বসেননি।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন- এই ছিল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা; কিন্তু বাসায় ধর্ম, দর্শন, মহাপুরুষদের জীবনী পড়তেন। শুনেছি বার্ট্রন্ড রাসেল পড়তে পড়তে ‘রাসেল’ নামটি পছন্দ হয় এবং এভাবেই ছোট ছেলের নাম রাখেন শেখ রাসেল। রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টি যেমন নিজের জীবনের উপলব্ধি দিয়ে শাণিত করেছেন, তেমনি ছেলেবেলা থেকেই তিনি মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রমুখকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সন্তানদেরও এই শিক্ষা দিয়েছেন। আজকাল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নামের পেছনে ‘আপোসহীন’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অথচ বেগম মুজিব কতখানি আপোসহীন ছিলেন কিংবা দেশের প্রতি কতখানি বিশ্বস্ত তার একটি উদাহরণ হলো- বঙ্গবন্ধু তথাকথিত আগরতলা মামলার অভিযোগে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করারও ষড়যন্ত্র চলছে। এ সময় তৎকালীন মিলিটারি শাসক আইয়ুব খান পশ্চিম পাকিস্তানে নেতাদের বৈঠক আহ্বান করলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানালেন। কেউ কেউ এও বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা হোক, তাঁর প্যারোলে মুক্তি দরকার। নেতাদের অনেকেই এ প্রস্তাবে রাজি হলেন। কিন্তু বেগম মুজিব এত বড় একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও প্যারোলের বিপক্ষে দাঁড়ালেন এবং প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার জন্য চিঠি লিখে কন্যা শেখ হাসিনা ও জামাতা ওয়াজেদ জিয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কাছে বার্তা পাঠালেন। কি ত্যাগের মনোভাবে অসীম সাহস, কতখানি প্রজ্ঞাবান এবং দূরদর্শী হলে এমন সিদ্ধান্ত দেয়া যায়। তাই সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক গবেষকগণ তাঁকে বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবে মনে করেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে এ বাড়ি সে বাড়ি আত্মগোপনের এক পর্যায়ে সন্তানসহ গ্রেফতার হয়ে ধানম-ির একটি বাড়িতে (সাব-জেল) উঠেন। তার আগেই বড় দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেন। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না সেদিন শেখ রাসেলের বয়সও যদি ১৫/১৬ হতো তাকেও হয়ত পাঠিয়ে দিতেন দেশের জন্য যুদ্ধ করতে।

বাংলাদেশের নারীরা অবহেলিত এবং বেগম রোকেয়ার ভাষায় অবরোধবাসিনী। কিন্তু সংসার ধর্ম পালন করেও একজন নারী যে নিজের সন্তান-সন্ততি তথা পরিবারের বাইরে বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত করতে পারেন তার প্রমাণ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বেগম মুজিব যেমন সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষের মতো মানুষ করেছেন, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার মধ্যেও এই গুণাবলী লক্ষণীয়। শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় যেমন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইটি বিশেষজ্ঞ, তেমনি কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও অর্টিজমের ওপর কাজ করতে করতে এখন জাতিসংঘের পরামর্শদাতা। জয় যেমন হার্ভার্ড এডুকেটেড তেমনি পুতুলও বোস্টন ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী। একইভাবে শেখ রেহানার ছেলে ববি অক্সফোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে এখন জয়-পুতুলের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকেও সাহায্য করছেন। রেহানার বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক তো ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্সে ঝড় তুলছেন নির্বাচিত বৃটিশ লেবার পার্টি এমপি হিসেবে। রেহানার ছোট মেয়েও অক্সফোর্ডে লেখাপড়া শেষ করার পথে। অথচ অনেকেই জানেন না শেখ রেহানা লন্ডনে বাংলাদেশ সেন্টারে রিসেপশনিস্টের চাকরি করেছেন।

এবার শেখ কামাল সম্পর্কে কিছু কথা বলব। আজও চোখ বন্ধ করলে তার মুখচ্ছবি সামনে ভেসে বেড়ায়- উজ্জ্বল, শ্যামলা গায়ের রং, ঘন কালো ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা গোপ, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, মেদহীন পাতলা শরীর, বাবার (বঙ্গবন্ধু) মতো না হলেও আর দশটি তরুণের চেয়ে আলাদা ব্যক্তিত্বের অধিকারী শেখ কামাল। কি প্রাণোচ্ছল তরুণ, মেধাবী, উদ্যমী, পরিশ্রমী, দক্ষ সংগঠক এবং সৃষ্টিশীল। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর এত বড় ক্ষমতার ছত্রছায়া অর্থাৎ পিতার রাষ্ট্রক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে তরুণ কেবল ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য হয়েছেন। অথচ ইচ্ছে করলে বড় কোন পদ দখল করতে পারতেন। করেননি। এটাই ছিল তার পরিবারের শিক্ষা, কালচার। একটি কথা মনে পড়ছে, সম্ভবত ১৯৭৪। লাইব্রেরির পেছনে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন। ভদ্রলোক টিপিক্যাল ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন। আমরা তার ওখানে চা-সিঙ্গাড়া খেতাম। একদিন ঢুকে দেখি ছালার চট পরা কবি সাফদার সিদ্দিকীও চা খাচ্ছে। আমাকে চিনত, আমিও তাকে চিনতাম। কারণ কবি নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, সেলিম আল-দীন, আখতারুন্নবীদের (কবি ও লেখক) সঙ্গে আমার সখ্য ছিল। এক পর্যায়ে সাফদার সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে খুব আপত্তিকর কিছু মন্তব্য করল। তাকিয়ে দেখলাম ছাত্রলীগের কিছু কর্মী কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় চোখ করে তাকাচ্ছে। আমি প্রমাদ গুণলাম। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, সাফদার তোমার কথাটি উইড্র কর। সে করল না। তখন আমি ওর হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় আমার চেনা এক ছাত্রলীগ কর্মী দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল, শফিক ভাই, ওকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। ওনাকি গাঁজা খায়, ওকে ভাল করে গাঁজা খাওয়াব। বললাম, দ্যাখো ও কবি, কবিরা গাঁজা খেয়ে কত কিছু বলে, ও ধরতে নেই। আমি ওকে নিয়ে লাইব্রেরির পুব পাশে এসে একটা রিকশা ডাকলাম এবং হাতে ১০টা টাকা দিয়ে বললাম, এই পথে চলে যাও। আজ আর ক্যাম্পাসে এসো না। এই বলে আমি কলাভবনের দিকে চলে আসি। কিছুক্ষণ পর কবি রফিক আজাদ ও কবি মহাদেব সাহা এসে বললেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা সাফদারকে ধরে নিয়ে গেছে। মাথা কামিয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরাবে এবং গাঁজা খাওয়াবে। আমি তাদের সঙ্গে যেতে যেতে দেখলাম শেখ কামাল কলাভবনের গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদল ছাত্রলীগ কর্মীর সঙ্গে কথা বলছে। কাছে গিয়ে কামালকে ঘটনাটা বললাম। সে বলল, শফিক ভাই, আপনিও চলুন। সাফদারকে আমি রিকশায় তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু যায়নি, ফিরে আসে শরীফের ক্যান্টিনে। কামাল সরাসরি ওদের ভিড় থেকে সাফদারকে হাত ধরে বের করে নিয়ে এলো এবং ওকে গাড়ির (টয়োটা) পেছনে এবং আমাকে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে বলল, কোথায় যাবেন? বললাম, প্রেসক্লাবে নামিয়ে দাও। কামাল তা-ই করল। গাড়ি থেকে নামিয়ে সাফদারের হাতে একটা নোট গুঁজে দিলেন। নোটটা ভাল করে দেখিনি, পঞ্চাশও হতে পারে, একশ’ও হতে পারে।

বড় বোনের সহপাঠী হিসেবে শেখ কামালকে দেখেছি দারুণ স্মার্ট আদব-কায়দাসম্পন্ন তরুণ। স্বাধীনতার পর প্রতিক্রিয়াশীল প্রতি বিপ্লবীরা যেভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারের কুৎসা রটাচ্ছিল ঠিক একইভাবে শেখ কামাল সম্পর্কেও যা তা বানোয়াট কাহিনী প্রচার করছিল। তৎকালীন জাসদের মুখপাত্র ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকা বা ভাসানী ন্যাপের ‘হককথা’ এক্ষেত্রে জঘন্য ভূমিকা পালন করে। আমি কাজ করতাম ‘ইত্তেফাকে’। তাতে নিউজ সেকশনের সতর্কতায়, বিশেষ করে মরহুম আসফ-উদ-দৌলা বা রেজা ভাইয়ের নেতৃত্বের কারণে হার্ড নিউজে গ-গোল করার সুযোগ না থাকলেও সম্পাদকীয় পাতায় খন্দকার আবদুল হামিদ, আবুল মনসুর আহমদরা জনকণ্ঠের ভূমিকা পালন করেছেন। শেখ কামালের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। এ যে কত বড় মিথ্যা তার প্রমাণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট বাইরের কারও পক্ষে ভাঙ্গা সম্ভব নয়। তাছাড়া শেখ কামাল যে কেবল রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বা প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধানের ছেলে তা তো নয়, সে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মদাতা পিতার সন্তান। তার অর্থের প্রয়োজন পড়লে কি ব্যাংক ডাকাতি করতে হয়? অথচ এক শ্রেণীর মতলববাজ মুখে মুখে প্রচার করেছে। কিন্তু বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি।

আমরা শেখ কামালের মধ্যে যেমন দেখেছি, তেমনি দেখছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যেও। যে কারণে দেশের এক নম্বর ক্ষমতাধর পরিবারের সন্তান হয়েও শেখ কামাল ব্যবসায় নামেনি, হাওয়া ভবন-খোয়ার ভবন-ডান্ডি ডায়িং-কোকো ওয়ান টু গড়ে তোলেনি, বরং লেখাপড়া করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতি যেমন করেছে (ছাত্রলীগ), তেমনি আবাহনী ক্রীড়াচক্র, স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা থিয়েটার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। যেগুলো আজ এত বছর পরও আধুনিক স্পোর্টস, সঙ্গীত এবং নাট্যাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়ে চলছে। বস্তুত ‘সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং’ বঙ্গবন্ধু পরিবারে চর্চা হতো বলেই তাদের মধ্যে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে দেশ ও জাতির স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে।

ঢাকা ॥ ১০ আগস্ট ২০১৭

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

balisshafiq@gmail.com

প্রকাশিত : ১২ আগস্ট ২০১৭

১২/০৮/২০১৭ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: