মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জনগণের ক্ষমতা বনাম বিচার বিভাগের ক্ষমতা

প্রকাশিত : ১৭ জুলাই ২০১৭
  • সুভাষ সিংহ রায়

উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে কোন কিছু লেখা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এসব নিয়ে কথাবার্তা খুব সাবধানে বলতে হয়। অথচ বিচারালয় থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়ে কতই না তীর্যক মন্তব্য করতে শুনে থাকি। আবার সবাই বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গÑ নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ স্বকীয়তা বজায় রেখে স্বাধীনভাবে কাজে করবে। যে যার কাজ করবেÑ সেটাই সুশাসন, সেটাই কাম্য। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে কেউ কেউ বলছেন, আমরা এখন ঔঁফমবং ৎবঢ়ঁনষরপ ড়ভ ইধহমষধফবংয-এ উন্নীত হয়ে গেছি। খুবই ভাল কথা। কিন্তু সুকুমার রায়ের মতো বলতে হয়, ‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার/ সবাই বলে মিথ্যে বাজে বকিস্নে আর খবরদার। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রপতি অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদে থাকবে; অথচ বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের থাকবে না। এটাই এখন আইন; আদালত তাই বলছে। বাংলাদেশের বিচারালয়ের অনেক অনেক দৃষ্টান্ত আছে। সব এখন উল্লেখ করা যাবে? রাজনীতিবিদ তথা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কটু মন্তব্য করা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা ব্যবসায়ী, ইয়াবা ব্যবসায়ী ইত্যাদি কত কিছুই না বলা হয়ে থাকে। আমরা খুব ভাল করেই জানি, সমাজের সব অংশেই ভাল-মন্দ সব ধরনের মানুষ আছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মানলে জনপ্রতিনিধি বিষয়টা মানতেই হবে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বিচারালয় কি অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে? বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বিচারপতি কুদ্দুস চৌধুরী ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স রচনা করে দিয়ে খুবই দক্ষতার সঙ্গে খুনীদের মনোপূত কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশে আবার যুক্তিবাদী লোকের অভাব নেই। এখনও সুযোগ পেলেই বলেন- বঙ্গবন্ধুর খুনীরা তো আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ছিল। তো তাতে কি প্রমাণ করে? খন্দকার মুশতাক যদি আওয়ামী লীগের হয়, তাহলে মীর জাফরও তো নবাব সিরাজউদ্দৌলার লোক হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে দলের ভেতরে হত্যাকারী থাকাটা নতুন কোন বিষয় না। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দায়মুক্তি (রহফবসহরঃু ড়ৎফরহধহপব) অধ্যাদেশ খন্দকার মুশতাক জারি করলেও আইন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তখন বাংলাদেশের কোন আইনজীবী ‘দায়মুক্তি আইন’ চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হননি। ড. হুমায়ন আজাদ লিখেছিলেন, ‘চুয়াত্তরের বিবেক ছিয়াত্তরে সামরিক শাসকের সেবা দাসে পরিণত হয়ে যায়।’

॥ দুই ॥

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কথা হরহামেশাই বলে থাকি। কিন্তু একটা অঙ্গ যদি আরেকটার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাহলে পরিস্থিতি ভয়ানকতার দিকে যায়। চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সুশাসন বলতে কি বোঝায়? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, যার কাজ সে করবে সেটাই সুশাসন; রাজার কাজ রাজা, প্রজার কাজ প্রজা, মন্ত্রীর কাজ মন্ত্রী। একজনের কাজ আরেকজন করতে গেলে সুশাসন বিঘিœত হবে। ষোড়শ সংশোধনী আলোচনায় এক অঙ্গের পক্ষ থেকে ক্রমাগতভাবে আরেকটি অঙ্গের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা যোগ্য না, তাদের হাতে এত ক্ষমতা থাকা উচিত হবে না। এভাবে আদৌ বলা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখার দরকার আছে বৈকি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর মূলমন্ত্র যদি হয় ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব তাহলে সংসদ সদস্যদের খাটো করে দেখার সুযোগ আছে কি-না তাও ভেবে দেখার বিষয় আছে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বিচারালয়ের মানুষ বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে জানতে চাইলেন না। অবশ্য এ কথাও ঠিক, বঙ্গবন্ধুর পর একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারাও দেশের মানুষের চিন্তা-ভাবনা পরিপূর্ণভাবে জানার চেষ্টা করেননি। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সূত্রের কথা অনেকেই ভাবনা-চিন্তা করেন। ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন সুশীল সমাজের একটা অংশ সব সময় শুধু অভিযোগই করে। এই রোগের একটা নাম দেয়া যেতে পারে ‘অভিযোগনামা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের মধ্যে রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে বিচারালয় থেকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। একমাত্র শেখ হাসিনাই সরকারপ্রধান হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে একে একে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের বিচারও কোন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করেননি। আজ থেকে বিশ বছর আগে কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান প্রথিতযশা সাংবাদিক গাফ্ফার চৌধুরীকে বলেছিলেন, ক্রাইসিসের সময় শেখ হাসিনা ছাড়া আর কাউকেই পাওয়া যায় না। তাই গণতন্ত্রের পথযাত্রায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অনন্য এবং অসাধারণ।

॥ তিন ॥

যদিও একথা সত্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতার একনায়কতন্ত্রের মানসিকতা সামগ্রিকভাবে এক অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি করে। অসহিষ্ণুতা জন্ম দেয় সংঘাত, তথা হিংসার। গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর হলো ভিন্নমত। কিন্তু যে ভিন্নমতের কথা এখন হরহামেশাই বলতে শুনি, সেই ভিন্নমতের ভিতরে সত্যাসত্যের বাছ-বিছার না থাকলে সেটা তো ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। অসত্য তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দেয়ার নাম কি বাকস্বাধীনতা? ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় বলা হয়েছে হাজার হাজার আলেম হত্যা করা হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় অবাধে মিথ্যা বলার স্বাধীনতাকে প্রকারান্তরে বাক্ স্বাধীনতা বলার চেষ্টা করা হয়। ১৯৪৮ সালে ভারতে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিয়ে ভীষণ সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহরু, আইনমন্ত্রী বি.আর. আমরেদর কর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল একত্রে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুটো পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল। একটি আর.এস.এসের পত্রিকা ‘অরগানাইজার’; অপরটি কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘ক্রসরোড’।

দুই দলই উচ্চ আদালতের কাছে নালিশ করলে আদালত প্রকাশনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। তখন সরকার সংবিধানে প্রথম সংশোধনী আনে। কোন প্রকাশনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হলে তা বাতিল করা যাবে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে সবকিছু অবাধ হওয়ার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট শর্তের মধ্যেই সাংবিধানিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। শীর্ষ আদালত প্রদত্ত রায়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যেমন শোরগোল শুনেছি, তেমনি বিস্ফোরক মন্তব্যও দেখেছি। সাধারণ জনতা থেকে প্রতিষ্ঠিত মানুষের মধ্যে অনেকেই জোরালো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আবার এ কথা বলতে হয়, আমরা বিতর্কিত, স্পর্শকাতর বিষয়ের বলটি বিচার বিভাগের দিকে দিয়ে স্বস্তি খুঁজতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকি। ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে আইনসভার ভূমিকা কি হবে সেটাই দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। কেননা জনআকাক্সক্ষার দোহাই দিয়ে জনবিরোধী কাজ করার প্রবণতা থাকে; আমরা অনেক কিছু অতীতে দেখেছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ

প্রকাশিত : ১৭ জুলাই ২০১৭

১৭/০৭/২০১৭ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: