মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ জুন ২০১৭, ৯ আষাঢ় ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

‘সম্পৃক্ত ও নিবেদিত’ মূলমন্ত্রে পাহাড়ে চলছে সেনা তৎপরতা

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৭

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ ভারিবর্ষণে পাহাড়ের তিন জেলার পরিস্থিতি অবর্ণনীয়। গত মঙ্গলবার সৃষ্ট পাহাড় ধস ও ঢলে মৃতের সংখ্যা ১৫৭-এ উন্নীত হলেও সহায় সম্পদের ক্ষতি পাহাড়ে সর্বকালের রেকর্ড। এ দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি উত্তরণে সিভিল প্রশাসন হিমশিমের মুখে পড়ে যাওয়ায় সেনা, নৌ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশী কার্যক্রমতো রয়েছেই। বিভিন্ন সেবা সংস্থার কার্যক্রম বাড়ছে। মঙ্গলবারে অভাবনীয় ঘটনার পর রবিবার ও সোমবার একে একে আরও ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ী ঢলে ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা ও মানুষের সহায় সম্পদের ক্ষতি ব্যাপক।

এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে একক কোন সংস্থার পক্ষ থেকে নয় বিধায় তাৎক্ষণিকভাবে সেনা সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর এ সহায়তা কার্যক্রমকে নাম দেয়া হয়েছে ‘সম্পৃক্ত ও নিবেদিত’। সেনাবাহিনীর প্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদারসহ উর্ধতন সেনা কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত দুর্যোগ এলাকা পরিদর্শন করছেন। পরিস্থিতি উত্তরণে নিয়োগ করা হয়েছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোরের সদস্যদের। এর মধ্যে রয়েছে কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন, রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন, আর্মি মেডিক্যাল কোর, সাপ্লাই কোর, অর্ডন্যান্স কোর, ইলেক্ট্রিক্যাল এ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ও পদাতিক (ইনফেন্ট্রি) কোরের বিভিন্ন শাখার সদস্য।

চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশন কার্যালয় ও আইএসপিআর সূত্রে মহাদুর্যোগ পরবর্তী ঘটনার তথ্য দিয়ে সোমবার জানানো হয়েছে, ভারিবর্ষণ ও আকস্মিক ভূমিধসের ঘটনা ও ঢলে রাঙ্গামাটি ছাড়াও গুঁইমারা, রামগড়, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে প্লাবন সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত রাঙ্গামাটিতে ১১৫, বান্দরবানে ৬ এবং খাগড়াছড়িতে ৫সহ ১২৬ জনের অপমৃত্যু ঘটেছে। পাহাড় ধসের ঘটনার পর রাঙ্গামাটি জেলার মানিকছড়িতে উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার পর সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তাসহ ৫ সদস্যের দুঃখজনক মৃত্যু ঘটেছে। এরপরও সেনা সদস্যদের কাজ থামেনি। রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও সেখানে চিকিৎসা সেবা খাবার বিশুদ্ধ পানীয় ও ওষুধ সরবরাহও শুরু করা হয়েছে।

বিগত কয়েক দিনে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রবল বর্ষণে একের পর এক পাহাড় ধসের ঘটনায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত ও জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অচলাবস্থা নেমে আসে। সে সঙ্গে বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জনজীবন চলে যায় দুর্বিসহ অবস্থায়। এ অবস্থায় সরকারী নির্দেশে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোরের সদস্যদের নিয়োজিত করা হয়েছে। বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সচল রাস্তাঘাট, বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট পুনঃসংস্কার কাজে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সেনা সদস্যরা ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বান্দরবান জেলার রুমা এবং রাঙ্গামাটির ঘাগড়া এলাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়নের ২৩৩ সদস্য ১০ ডাম্পার এক হুইল লোডার, ৫ এক্সেভেটর, ১ হুইল ডোজার এবং একটি লোডার দিয়ে সংস্কার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। চট্টগ্রাম- রাঙ্গামাটি সড়ক আগামীকাল বুধবারের মধ্যে হালকা যানবাহন এবং এক মাসের মধ্যে ভারি যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন। এছাড়া রুমা বান্দরবান রাস্তায় যানবাহন চলাচল সচল করতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে।

বিদ্যুত ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট স্থাপনের জন্য সেনা সদস্যরা প্রতিকুল ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে খাগড়াছড়ি থেকে লংগদু পর্যন্ত এবং সেখান থেকে রাঙ্গামাটি নদী পথে একটি জেনারেটর নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ২টি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন জেনারেটর, ২টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট, ৪টি ওয়াটার ট্যাঙ্ক, ২০০ জেরিক্যান বিশুদ্ধ পানি, বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ইত্যাদি সড়ক পথে কাপ্তাই হয়ে নদী পথে রাঙ্গামাটিতে প্রেরণ করা হয়েছে। গত ১৬ জুন রাঙ্গামাটিতে পানি বিশুদ্ধকরণ ২টি প্লান্ট এবং ৪টি ওয়াটার ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পানিবাহিত ও সংক্রামক বিভিন্ন ব্যাধি সৃষ্টি হয়নি। গত ১৬ জুন থেকে সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৬৮৬ সদস্য অসহায় ও দুর্গতদের মাঝে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ৫ হাজার লোকজনকে প্রতিদিন দুই বেলা খাবার, বিশুদ্ধকরণ ও ওষুধ বিতরণ এবং ৯০০ জনক নগদ অর্থ সহায়তা ও বস্ত্র বিতরণ করেছে। বর্তমানে ৮ মেডিক্যাল টিম ১৬টি স্থানে দুর্গতদের সহায়তা দিচ্ছে। এছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন রান্না করা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাহাড় ধসের ঘটনার পর সেনাবাহিনীর প্রধান চট্টগ্রামের জিওসি কমান্ডার এস ডব্লিউসহ উর্ধতন সেনা কর্মকর্তারা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অতীতে সেনাবাহিনী ঘূর্ণিঝড় আইলা, ঢাকায় রানা প্লাজায় ভবন ধস, দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যাসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় যে সহায়তা দিয়েছে অনুরূপভাবে পাহাড়ের তিন জেলায়ও দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ধস পরিস্থিতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আইএসপিআর ও চট্টগ্রাম সেনানিবাস সূত্রে জানানো হয়েছে।

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৭

২০/০৬/২০১৭ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: