১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চালের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টা


তপন বিশ্বাস ॥ হাওড়ে ফসলহানি এবং সরকারী গুদামে চালের মজুদ হ্রাসের অজুহাতে বাজারে চালের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে। একশ্রেণীর চালকল মালিক অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশে চাল মজুদের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে এই সঙ্কট। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে চালের দাম। ক্রমশ তা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে বাজার নিয়ন্ত্রণে চাল আমদানির সুযোগ করে দেয়া উচিত। এক-দুই মাসের জন্য হলেও চালের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করলেই ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করবে। অন্যথায় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, বাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হচ্ছে না। মিলাররা সরকারী গুদামে চাল দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেও সুফল পাওয়া যায়নি। যে কারণে দুই মাস আগে চাল আমদানিতে আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। এখনও শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়নি। শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে চালের দাম কমে যেত এবং মিল মালিকরা সরকারের গুদামে চাল দিত।

এবার বোরো মৌসুমের শুরুতে হাওড়ে আগাম বন্যা আসায় সেখানে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী হাওড় এলাকায় আট লাখ মেট্রিক টন ফসলহানি ঘটেছে। হাওড়ের এই ফসলহানি দেশের জন্য কোন প্রভার পড়ার কথা নয়। এটি শুধু হাওড় অঞ্চলের লোকের ওপর প্রভার পড়ার কথা। ফসলহানিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী মজুদ শুরু হয়। এতে দেশে চালের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়। আর বাজারে চালের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এবার বোরো মৌসুমে এক কোটি ৮২ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে। এর বেশিরভাগ চাল কৃষক, ব্যবসায়ী, মিলমালিকদের কাছে মজুদ রয়েছে। এর আগে আমন মৌসুমে দেশে চাল উৎপাদন হয় এক কোটি ৩৬ লাখ মেট্রিক টন। আমন এবং বোরো মিলে মোট উৎপাদন দাঁড়াচ্ছে ৩ কোটি ১৮ লাখ মেট্রিক টন। দেশে প্রতিদিনের জন্য চালের চাহিদা ৮০ হাজার মেট্রিক টন। সে হিসেবে বছরে মোট ২ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন চালের প্রয়োজন। ইতোমধ্যে উৎপাদন যা হয়েছে তাতে ২৮ লাখ মেট্রিক টন সাশ্রয় হওয়ার কথা। এছাড়া আউশ মৌসুমে এবার ২৪/২৫ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। এই হিসাব অনুযায়ী দেশে এবার মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ৩ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। তাতে এবার ৫০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। হাওড়ে ৮ লাখ টন বোরো নষ্ট হলেও ৪২ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকার কথা। এই হিসাবে বাজারে চালের সরবরাহ যথেষ্ট থাকা উচিত। প্রশ্ন উঠেছে, এই চাল গেল কেথায়? বাজারে চালের কৃত্রিক সঙ্কট কেন?

এদিকে মিল মালিকদের অসহযোগিতায় সরকারের মজুদ তলানিতে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে সরকারের গুদামে সব মিলিয়ে মজুদের পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ অভিযান সফল হচ্ছে না। মিল মালিকরা সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছে না। গুদামে চাল না আসায় সরকারের মজুদ দিন দিন কমছে। এতে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়েই চলেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সরকারী-বেসরকারী দুই খাতেই চালের মজুদ এখন সবচেয়ে কমে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে মোটা চালের পর বাজারে এবার সরু চালের দাম কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। মোটা চালের দামও কমার লক্ষণ নেই। ‘খাদ্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন জুন-২০১৭’ শীর্ষক এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কমেছে। সরকারী-বেসরকারী সব খাতে চালের এই ঘাটতির কারণেই বাজারে দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।

সরকারী সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাজারে সরু চালের কেজি ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা। এ সপ্তাহে তা ২ টাকা বেড়ে ৫৬ থেকে ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম ৪৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮ টাকা। সব ধরনের চালের দাম গত এক মাসে ৪ থেকে ৮ শতাংশ এবং এক বছরে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে প্রতি কেজি চালের দাম ১০ টাকা বেশি হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারী খাতে চাল আমদানি কম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ এই দুই অর্থবছরে দেশে বেসরকারী খাতের মাধ্যমে চাল আমদানি হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ টন। ওই সময়ে দেশে চালের দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। আর এখন চালের কেজি ৫০ টাকা ছুঁইছুঁই করলেও গত এক বছরে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও চাল আমদানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি কেজি চাল আমদানিতে ৯ টাকা করে শুল্ক দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য খরচ যোগ করে চালের দাম যা দাঁড়ায়, তাতে তাদের আমদানি করে পোষাচ্ছে না। তাই বাজারে চালের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে যাচ্ছেন না। সরকার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নিলেও তা আগামী এক থেকে দুই মাসের আগে দেশে আসছে না।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারী গুদামে সব সময় ৬ থেকে ১০ লাখ টন চাল মজুদ থাকা উচিত। কিন্তু দুই বছর ধরে সরকারী চালের মজুদ ৬ লাখ টনের নিচে ছিল। তিন মাস ধরে তা ৩ লাখ টনের নিচে। হাওড়ে ফসল বিপর্যয় ও বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের কারণে সরকারী হিসাবে ১২ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন। বাজারে চালের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা। তারা বলেন, ২০০৮ সালে দেশে চাল নিয়ে একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছিল। বেসরকারী মজুদ কমে যাওয়ায় চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যে শিক্ষা নিইনি, বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। সরকারের উচিত অন্তত স্বল্প সময়ের জন্য হলেও চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেয়া। এতে আমদানি বেড়ে বাজারে যোগান বাড়বে, দামও কমবে।

এই পরিস্থিতিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও বেসরকারী খাতে আমদানির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। তারা মনে করছে, খাদ্য অধিদফতর একা চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারবে না। গত সপ্তাহে খাদ্য মন্ত্রণালয় চালের মজুদ ও যোগান পরিস্থিতি নিয়ে যে সভা করেছে, তাতে তারা বেসরকারী খাতে চালের যোগান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে চাল আমদানি বাড়ানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার ওপর তারা গুরুত্ব দিয়েছে।

এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, চালকল মালিকদের কাছ থেকে মজুদের হিসাব ইতোমধ্যে নিয়েছি। সেখানে খুব বেশি চালের মজুদ নেই। ব্যবসায়ীদের কাছে কী পরিমাণ চাল আছে, তা আমরা অনুসন্ধান করে দেখছি। আর বেসরকারী খাতে আমদানি শুল্ক কমানোর সুপারিশ আমরা সরকারের বিভিন্ন মহলে কয়েক দফা করেছি।

চালের উৎপাদনের যে হিসাব এফএওর প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে ৩ কোটি ৪৫ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৬ সালে তা থেকে ২০ লাখ টন উৎপাদন বেড়েছিল।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: