২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ভোগান্তির অপর নাম জাতীয় মহাসড়ক ॥ ২০ মিনিটের পথ পেরতে ৬ ঘণ্টা


ভোগান্তির অপর নাম জাতীয় মহাসড়ক ॥ ২০ মিনিটের পথ পেরতে ৬ ঘণ্টা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা থেকে সড়কপথে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহগামী যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে অন্তত ছয় ঘণ্টা। এ দূরত্বের অন্তত ১৫ পয়েন্টে সড়কে এখন হাঁটুপানি। ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সড়কে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। গর্তে পড়ে উল্টে যাচ্ছে হালকা যানবাহন। ফলে যানজটের ভোগান্তি মাত্রা ছড়িয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক হাট-বাজারের উপদ্রব তো রয়েছেই। এদিকে টাঙ্গাইল সড়কের আশুলিয়া, চন্দ্রাসহ অন্তত আটটি পয়েন্টে এখন তীব্র যানজট। দুই ঘণ্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে প্রায় ছয় ঘণ্টা। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।

এদিকে ঈদ-উল-ফিতরে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতকরণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর)। দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক ও নৌপথে চরম জনভোগান্তির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঈদপূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলা এনা, শাহজালাল, শৌখিনসহ বিভিন্ন যানবাহনচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গী রেলওয়ে ব্রিজের পর থেকেই মূলত দুর্ভোগ শুরু। তারা জানিয়েছেন, সেতু পার হয়ে আনারকলি সড়ক, ফায়ার সার্ভিস, মধুমিতা পয়েন্ট, স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, বড় কুনিয়াপাড়, বড় বাড়ি, বোর্ড বাজার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সাইনবোর্ড, মালেকের বাড়ি, বাসন সড়ক, ভোগড়া বাইপাস ও জয়দেবপুর চৌরাস্তা পয়েন্ট হলো দুর্ভোগের মূল কেন্দ্র। সবকটি পয়েন্টে গত কয়েকদিনের বৃষ্টির পানি জমে আছে। এটি যে একটি জাতীয় মহাসড়ক তা বোঝার উপায় নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হয়ে একটি বড় খাল, যেখানে থৈ থৈ করছে পানি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এ কদিনেও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সড়কের দু’পাশে ড্রেন নেই। ফলে পানি দ্রুত সরছে না। জমে থাকা পানিতে রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অনেক গর্ত।

পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সামদানি খন্দকার জানান, চালকরা ভয়ে এখন বাস নিয়ে গাজীপুর যেতে চান না। ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে ফিরে আসতে সময় লাগছে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। সড়কে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা নেই। হালকা যানবাহনগুলো গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় যানজট ও দুর্ভোগের মাত্রা আরও বাড়ছে।

চালকরা জানিয়েছেন, কিছু গর্তে ইটের খোয়া ফেলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে অস্থায়ী সংস্কারকাজ করা হয়েছে। কিন্তু অতিকৃষ্টির ফলে সংস্কারকাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুরনো চেহারায় ফিরে যাচ্ছে সড়কের অবস্থা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, অবৈধ বাজার উচ্ছেদ, পার্কিং উচ্ছেদ, অযান্ত্রিক ও নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।

মহাখালী আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের আব্দুল্লাহপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এটুকু রাস্তা পাড়ি দিতে সময় লাগছে কমপক্ষে সাত ঘণ্টা। তিনি জানান, গাজীপুরা নামক স্থানে সড়কে হাঁটুপানি জমেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গর্তে ইট ফেলা হলেও স্বাভাবিক গতিতে যান চলাচল করতে পারছে না। এর প্রভাবে আব্দুল্লাহপুর, রাজেন্দ্রপুর, জয়দেবপুর, চন্দ্রা, নবীনগর, আশুলিয়াসহ আশপাশের সব সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যমুনা সেতু থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যানজট। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগছে। তিনি বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এ বছর ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। সন্ধ্যায় খবর নিয়ে জানা গেছে, গাড়ির চাপ বাড়ায় যানজট ও দুর্ভোগ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। তবে বৃষ্টি কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। যদিও আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী তিন দিন বৃষ্টি থাকবে। অর্থাৎ সমস্যা আরও বাড়তে পারে- এমন ইঙ্গিত মিলেছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে।

সালনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হোসেন সরকার জানান, ভোগান্তি এড়াতে কর্মজীবীদের পরিবারের লোকজন আগেভাগেই বাড়ি ফিরছেন। এর ফলে মহাসড়কে গাড়ির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চার লেন উন্নীতকরণ কাজ চলছে। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গাচোরা ও বৃষ্টির পানি জমে কাদায় পরিণত হয়েছে। ফলে যানবহন সঠিকভাবে চলাচল করতে বিঘœ ঘটছে। এর কারণে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় পয়েন্টে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর সড়কে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় কমিটির অভিযোগ

নৌ, সড়ক ও রেলপথসংশ্লিষ্ট সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের বরাত দিয়ে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার ঈদে এক কোটি ২৯ লাখ মানুষ ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে সড়কপথে ৫৫ শতাংশ, নৌপথে ২৫ শতাংশ এবং রেলপথে ২০ শতাংশ মানুষ এ তিন জেলা ছাড়বে এবং ঈদপরবর্তী দ্রুততম সময়ে তারা আবার ফিরে আসবে। এ হিসাবে এবার বাসসহ বিভিন্ন ধরনের সড়কযানে যাবে ৭০ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ। আর লঞ্চ-স্টিমার-ট্রলারসহ বিভিন্ন ধরনের নৌযান ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন সার্ভিসে যাবে যথাক্রমে ৩২ লাখ ২৫ হাজার ও ২৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বজনদের সান্নিধ্যপ্রত্যাশী এসব মানুষ ঈদের দিনসহ ঈদপূর্ববর্তী সাত ও ঈদপরবর্তী ১০ দিন মিলিয়ে ১৮ দিন যাতায়াত করবে। কিন্তু স্বল্পসময়ের জন্য এ বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদ-নির্বিঘœ যাতায়াত নিশ্চিতকরণে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমনকি ঈদপূর্ববর্তী সময়ে বাস ও লঞ্চের অগ্রিম টিকেটপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গণবিড়ম্বনা, অনেক লঞ্চ-বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও টিকেট কালোবাজারি ঠেকাতে পারেনি প্রশাসন। তবে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রে রেলওয়ের বিরুদ্ধে কোন অনিয়ম এবং নামীদামী বিলাসবহুল বাস সার্ভিসগুলোর বিরুদ্ধে বাড়তি দামে টিকেট বিক্রির তথ্য-প্রমাণ পায়নি জাতীয় কমিটি।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রাতে বিভিন্ন নৌপথে বালু-সিমেন্টবাহী নৌযান, ইঞ্জিনচালিত যাত্রীবাহী ট্রলারসহ অনিবন্ধিত ও ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধ করতে পারেনি সরকার। অথচ রাতে এ ধরনের নৌযান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই ভাবে পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথে চলাচলরত ৮৭টি লঞ্চের অধিকাংশই অনেক পুরনো এবং অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ জেনেও নৌ পরিবহন অধিদফতর এসব লঞ্চের ফিটনেস সনদ দিয়েছে।

সারাদেশে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সড়ক ভাঙ্গাচোরা এবং ঢাকা থেকে দূরপাল্লার সড়কগুলোর ওপর অনেক স্থানেই শত শত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভরা দুর্যোগ মৌসুমে এসব বেহাল সড়কে যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টদায়ক। এছাড়া এসব কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজটের মাত্রা স্বাভাাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এছাড়া খোদ রাজধানীতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপে চলাচল অযোগ্য অনেক পুরনো ও দুর্ঘটনাকবলিত বাস মেরামত এবং রংচং করার কাজ এখনও চলছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ঈদযাত্রী পরিবহনে এসব বাস ব্যবহৃত হলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পরিবহনে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামাল দিতে শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। একই ভাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন ফেরি চলাচলের জন্য বাড়তি কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ দুই ফেরিঘাটে গাড়িজটসহ নানা বিশৃঙ্খলা হতে পারে, যাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।