২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ঢাকা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মহাদুর্ভোগ


ঢাকা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মহাদুর্ভোগ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা থেকে সড়কপথে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহগামী যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে অন্তত ছয় ঘন্টা। এই দূরত্বের অন্তত ১৫টি পয়েন্টে সড়কে এখন হাঁটু পানি। ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সড়কে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। গর্তে পড়ে উল্টে যাচ্ছে হালকা যানবাহন। ফলে যানজটের ভোগান্তি মাত্রা ছড়িয়েছে। ঈদকেন্দ্রীক হাটবাজারের উপদ্রব তো রয়েছেই।

এদিকে, টাঙ্গাইল সড়কের আশুলিয়া, চন্দ্রা সহ অন্তত আটটি পয়েন্টে যানজট এখন তীব্র যানজট। দুই ঘন্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে প্রায় ছয় ঘন্টা। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।

এছাড়াও, ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতকরণে সরকারের গৃহিত পদক্ষেপসমুহ পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর)। দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক ও নৌপথে চরম জনভোগান্তির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঈদ-পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর ॥ ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলা এনা, শাহজালাল, সৌখিনসহ বিভিন্ন পরিবহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গী রেল ব্রিজের পর থেকেই মূলত দুর্ভোগ শুরু। তারা জানিয়েছেন, সেতু পার হয়ে আনারকলি সড়ক, ফায়ার সার্ভিস, মধুমিতা পয়েন্ট, স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, বড় কুনিয়াপথড়, বড়বাড়ি, বোর্ড বাজার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সাইনবোর্ড, মালেকের বাড়ি, বাসন সড়ক, ভোগড়া বাইপাস ও জয়দেবপুর চৌরাস্তা পয়েন্ট হল দুর্ভোগের মুল কেন্দ্র। এসবকটি পয়েন্টে গত কয়েকটি বৃষ্টি পানি জমে আছে। এটি একটি জাতীয় মহাসড়ক বোঝার উপায় নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হয়ে একটি বড় খাল। যেখানে থৈ থৈ পানি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ কদিনেও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সড়কের দু’পাশে ড্রেন নেই। ফলে পানি দ্রুত সরছে না। জমে থাকা পানির কারণে রাস্তার সৃষ্টি হয়েছে ছোট বড় অনেক গর্ত।

পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সামদানি খন্দকার জানান, চালকরা ভয়ে এখন বাস নিয়ে গাজীপুর যেতে চান না। ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে ফিরে আসতে সময় লাগছে ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা। সড়কে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা নেই। হালকা যানবাহনগুলো গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় যানজট ও দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়ছে।

চালকরা জানিয়েছেন, কিছু গর্তে ইটের খোসা ফেলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে অস্থায়ী সংস্কার কাজ করা হয়েছে। কিন্তু অতিকৃষ্টির ফলে সংস্কার কাজ নষ্টট হয়ে যাচ্ছে। পুরনো চেহারায় ফিরে যাচ্ছে সড়কের অবস্থা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, অবৈধ বাজার উচ্ছেদ, পার্কিং উচ্ছেদ, অযান্ত্রিক ও নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।

মহাখালী আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের আব্দুল্লাহপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত যানজন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এইটুকু রাস্তা পারি দিতে সময় লাগছে কমপক্ষে ৭ ঘন্টা। তিনি জানান, গাজীপুরা নামক স্থানে সড়কে হাঁটু পানি জমেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গর্তে ইটা ফেলা হলেও স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। এর প্রভাবে আব্দুল্লাহপুর, রাজেন্দ্রপুর, জয়দেবপুর, চন্দ্রা, নবিনগর, আশুলিয়া সহ আশপাশের সকল সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মগাসড়কের যমুনা সেতু থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যানজট। ছয় থেকে সাত ঘন্টায় ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে সময় লাগছে। তিনি বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবছর ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়তে পারে। সন্ধ্যায় খবর নিয়ে জানা গেছে, গাড়ির চাপ বাড়ায় যানজট ও দুর্ভোগ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। তবে বৃষ্টি কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

যদিও আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী তিন দিন বৃষ্টিপাত থাকবে। অর্থাৎ সমস্যা আরো বেড়াতে পারে এমন ইঙ্গিত মিলেছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে।

সালনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হোসেন সরকার জানান, ভোগান্তি এড়াতে কর্মজীবীদের পরিবারের লোকজন আগেভাগেই বাড়ি ফিরছেন। যার ফলে মহাসড়কে গাড়ির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চারলেন উত্তীর্ণকরণ কাজ চলছে। এতে করে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গাচুরা ও বৃষ্টির পানি জমে কাদায় পরিণত হয়েছে। ফলে যানবহন সঠিকভাবে চলাচল করতে বিঘ্ন ঘটছে। যার কারণে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় পয়েন্টে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা নবীনগর সড়কে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় কমিটির অভিযোগ ॥ নৌ, সড়ক ও রেলপথ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের বরাত দিয়ে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার ঈদে এক কোটি ২৯ লাখ মানুষ ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে সড়কপথে ৫৫ শতাংশ, নৌপথে ২৫ শতাংশ এবং রেলপথে ২০ শতাংশ মানুষ এই তিন জেলা ছাড়বে এবং ঈদ-পরবর্তী দ্রুততম সময়ে তারা আবার ফিরে আসবে। এই হিসেবে এবার বাসসহ বিভিন্ন ধরনের সড়কযানে যাবে ৭০ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ। আর লঞ্চ-স্টিমার-ট্রলারসহ বিভিন্ন ধরনের নৌযান ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন সার্ভিসে যাবে যথাক্রমে ৩২ লাখ ২৫ হাজার ও ২৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বজনদের সান্নিধ্যপ্রত্যাশী এসব মানুষ ঈদের দিনসহ ঈদপূর্ববর্তী সাত ও ঈদপরবর্তী ১০ দিন মিলিয়ে ১৮ দিন যাতায়াত করবে। কিন্তু স্বল্পসময়ের জন্য এই বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদ-নির্বিঘœ যাতায়াত নিশ্চিতকরণে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি ঈদপূর্ববর্তী সময়ে বাস ও লঞ্চের অগ্রিম টিকিট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গণবিড়ম্বনা, অনেক লঞ্চ-বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে পারেনি প্রশাসন। তবে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রে রেলওয়ের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম এবং নামিদামি বিলাসবহুল বাস সার্ভিসগুলোর বিরুদ্ধে বাড়তি দামে টিকেট বিক্রির তথ্য-প্রমাণ পায়নি জাতীয় কমিটি।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রাতে বিভিন্ন নৌপথে বালুবাহী-সিমেন্টবাহী নৌযান, ইঞ্জিনচালিত যাত্রীবাহী ট্রলারসহ অনিবন্ধিত ও ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধ করতে পারেনি সরকার। অথচ রাতে এ ধরনের নৌযান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে পদ্মার শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ি নৌপথে চলাচলরত ৮৭টি লঞ্চের অধিকাংশই অনেক পুরানা এবং অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ জেনেও নৌ পরিবহন অধিদপ্তর এসব লঞ্চের ফিটনেস সনদ দিয়েছে।

সারা দেশে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সড়ক ভাঙাচোরা এবং ঢাকা থেকে দূরপাল্লার সড়কগুলোর ওপর অনেক স্থানেই শত শত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভরা দুর্যোগ মৌসুমে এসব বেহাল সড়কে যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টদায়ক। এছাড়া এসব কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজটের মাত্রা স্বাভাবিক সময়ের চেয় অনেক বেশি হবে। এছাড়া খোদ রাজধানীতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপে চলাচল অযোগ্য অনেক পুরানা ও দুর্ঘটনাকবলিত বাস মেরামত এবং রঙচঙ করার কাজ এখনো চলছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ঈদযাত্রী পরিবহনে এসব বাস ব্যবহৃত হলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পরিবহনে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামাল দিতে শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

একইভাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ি ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরিসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু ও নিরবিচ্ছিন্ন ফেরি চলাচলের জন্য বাড়তি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ দুই ফেরিঘাটে গাড়িজটসহ নানা বিশৃঙ্খলা হতে পারে; যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: