২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এরশাদের ঘটা করে গড়া জোট ১০ দিনেই খান খান


রাজন ভট্টাচার্য ॥ অবশেষে আশঙ্কাই সত্যি হলো। শুরু থেকেই দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ছিল নানা আলোচনা-সমালোচনা। অবিশ্বাস। নানা গুঞ্জন। কতদিন টিকবে সামরিক একনায়ক এরশাদের ৫৮ দলীয় জোটের সংসার! না, টেকেনি। গড়ে উঠতে না উঠতেই ভাঙ্গনের মুখে পড়ল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন সর্ববৃহত রাজনৈতিক জোট। ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ এখন দ্বিধাবিভক্ত। যদিও নামসর্বস্ব দলই জোটে সবচেয়ে বেশি। মাত্র দুটি দলের নিবন্ধন ছিল। প্যাডসর্বস্ব ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নির্ভর এসব দল নিয়ে গড়া জোটে সংখ্যার দিকে দিয়ে চমক ছিল। এটা সত্যি। কিন্তু চমকের স্থায়িত্ব যে এত ক্ষণস্থায়ী হবে, তা হয়ত এরশাদ নিজেও ভাবতে পারেননি। আত্মপ্রকাশের মাত্র ১০ দিনের মাথায় জোটের ভাঙ্গন সেটির ভবিষ্যতকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলল।

এখন নতুন করে জোটের রূপরেখা চিন্তা করছেন জাপা নেতারা। তারা বলছেন, বেশিরভাগ দলই এখন আমাদের সঙ্গে রয়েছে। নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার হাল এখনও ছাড়েননি জাপা নেতারা। দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রত্যাশা আরও কিছু রাজনৈতিক দল তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে। পালে হাওয়া লাগবে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকেও কিছু দল যুক্ত হবে এরশাদের জোটে। প্রশ্ন হলো স্বল্প সময়ের মধ্যেই জোটে কেন ভাঙ্গন হলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর্থিক লেনদেন ও নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে গরমিল হওয়ায় ২১ দলীয় জোট বাংলাদেশ ন্যাশনাল এলায়েন্স (বিএনএ) ভেঙ্গে গেছে। গত মঙ্গলবার রাতে জোটের অন্যতম প্রধান লেবার পার্টি (একাংশ) চেয়ারম্যান সেকান্দর আলীকে বহিষ্কার করে এগারোটি দল জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারা বিএনএ নামে আলাদা জোটও গঠন করে। এতে গণজাগরণ পার্টির চেয়ারম্যান সেলিম হায়দারকে চেয়ারম্যান ও আমজনতা পার্টির চেয়ারম্যান বেনজির আহমদকে সদস্য সচিব এবং গণঅধিকার পার্টির চেয়ারম্যান হোসেন মোল্লাকে মুখপাত্র করা হয়েছে। বিএনএ জোটের নতুন মুখপাত্র হোসেন মোল্লা জানান, সেকেন্দার আলীকে অব্যাহতি দিয়ে ১১ দল মিলে বিএনএর নতুন কমিটি করা হয়েছে।

প্রায় ৩১ দল নিয়ে নতুন করে বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ) নামে পার্টি গঠন করেন বিএনপির সাবেক শীর্ষ নেতা ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। জোটের শুরু থেকেই কয়েক দফা ভাঙ্গন ধরে। দুই দফা ভাঙ্গনের পর আরেকটি অংশ নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার করে এরশাদের জোটে যোগ দেয়। যদিও নাজমুল হুদার পক্ষ থেকে বার বার জোট না ভাঙতে এরশাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। এখন এর মধ্যে ১১ দল আবার জাপা ছেড়ে গিয়ে নতুন করে বিএনএ গঠন করেছে।

শরিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাপা থেকে বেরিয়ে যাওয়া দলগুলো হলোÑ গণজাগরণ পার্টি, জাতীয় তফসিল ফেডারেশন, আমজনতা পার্টি, আওয়ামী পার্টি, গণঅধিকার পার্টি, ইসলামী গণতান্ত্রিক লীগ, প্রতিবাদী জনতা পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, তৃণমূল লীগ, সচেতন হিন্দু পার্টি ও বাংলাদেশ মাইনরিটি পার্টি।

জোট নেতারা জানান, সম্মিলিত জোটের চেয়ারম্যান এরশাদের কাছে থেকে যাওয়া নতুন অংশের কমিটি উপস্থাপন করা হবে। এরশাদ তা গ্রহণ করলে তারা জোটে থাকবেন। অন্যথায় বিকল্প চিন্তাভাবনা করা হবে। যদিও এই জোট গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। এরশাদকে পরামর্শ দিয়ে দলের এক যৌথ সভায় বলেছিলেন, নাম সর্বস্ব দল নিয়ে জোট গঠন করে লাভ নেই। যদি জোট করতেই হয় তাহলে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হতে পারে।

বাংলাদেশ আম আদমি পার্টির চেয়ারম্যান হাজী নাসির উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনএ জোট গঠনের দিন থেকেই এর চেয়ারম্যান শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। এরপর বিগত কয়েকদিনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ জন্য সেকেন্দার আলীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ বিএনএ জোটের ১৪ শরিক দলের মধ্যে এগারোটিই এতে সম্মতি দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে বিএনএ জোটের চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী মনি বলেন, এরশাদের নেতৃত্বাধীন বৃহত এই জোট গঠনের পর থেকেই একটি মহল আতঙ্কে ছিল, এটি তাদের কারসাজি। তার দাবি, পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় একজন তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আলাদা জোট করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিএনএর মূলধারার সবাই তার সঙ্গে আছেন। দু-চারজন এগুলো করে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে কয়েকটি দল গঠিত হয়েছে রাতারাতি। তারা চলে গেলে কোন সমস্যা নেই। আমরা এরশাদের জোটে আছি, থাকব।

গত ৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৫৮টি দল দিয়ে জাতীয় সম্মিলিত জোট গঠনের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট নামে দুটি দল এবং ৩৫টি দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ইসলামী মহাজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ) সমন্বয়ে জাতীয় সম্মিলিত জোট (ইউএনএ) নামে ‘ঢাউস আকারের’ এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এরশাদ। সংখ্যার দিক থেকে এটি দেশের বৃহত্তম জোট, যদিও এর মধ্যে ৫৪টি দলই নামসর্বস্ব।

এরশাদ বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই এই জোট গঠন করা হয়েছে। কারণ দলে প্রার্থী সঙ্কট। তাছাড়া রাজনীতিতে এখন জোটের খেলা চলছে। আমরা কিছু প্রার্থী দেব। বাকি প্রার্থী জোটের থেকে ঠিক করে জাতীয় নির্বাচন করব। এতে মানুষ জাপাকে ভোট দেবে। এই চিন্তা থেকে গত সপ্তাহে জোটের শরিকদের নিয়েও বৈঠক করেন এরশাদ। এতে সব শরিক দলকে প্রার্থী ঠিক করে তালিকা প্রস্তুত করারও তাগিদ দেন জাপা চেয়ারম্যান।

জোট নেতারা বলেন, আমাদের কাছে প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে জোট গঠনের। তবে আমরা বড় কোন দলের সঙ্গে জোট গঠন না করে ছোট দলগুলো মিলে একটি বিশাল জোট গঠন করার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব ও জোট মুখপাত্র এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, জোট শরিকদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছিল। আমরা ভেবেছিলাম তা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। নিজেদের কারণেই তারা বিভক্ত হয়েছে। এখানে জাপার কোন ভূমিকা নেই। অর্থাৎ জাতীয় পার্টির সঙ্গে কোন শরিক জোটের দূরত্ব তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, জোট আছে। তা আরও এগিয়ে যাবে। আমরা আশা করছি, আরও কয়েকটি বড় দল আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: