২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

১৪ আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা সংঘটিত দাওয়াতুল ইসলামের ব্যানারে


শংকর কুমার দে ॥ ‘দাওয়াতুল ইসলাম’র ব্যানারে ১৪টি আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে আত্মঘাতী জঙ্গী গ্রুপটি। রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের ব্যারাকে ও খিলগাঁও র‌্যাবের চেকপোস্টে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই দুই ঘটনায় আরও ১০ আত্মঘাতী জঙ্গী জড়িত, যারা এখনও লা-পাত্তা। আত্মঘাতী পুরুষ জঙ্গী সদস্যের পাশাপাশি রয়েছে আত্মঘাতী নারী জঙ্গীও। জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে নারী ও পুরুষকে আত্মঘাতী জঙ্গী দলে ভেড়াচ্ছে তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে গ্রেফতার আত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যদের দেয়া জবানবন্দীতে। যেসব জঙ্গী আত্মঘাতী দলের সদস্য হয়ে যায় তাদের বলা হয় ‘হিযরত’। যে একবার হিযরতে বের হয়ে গেছে, সে অফলাইনে চলে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একবার হিযরতে বা আত্মঘাতী দলের সদস্য হিসেবে চলে গেলে তার আর ফিরে আসার উপায় নেই। শহীদী পথ বেছে নিতে জিহাদের জন্য শরীরে বোমা বা কোমরে সুইসাইডাল ভেস্ট বেঁধে হামলার জন্য প্রস্তুত হয়ে আস্তানায় লুকিয়ে থাকে আত্মঘাতী জঙ্গী গ্রুপ। বর্তমানে আত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যদের টার্গেট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যার জন্য তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পুলিশের উচ্চ পর্যায় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, রাজধানীর আশকোনায় হাজী ক্যাম্প সংলগ্ন র‌্যাবের ব্যারাকে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় যে মামলা হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে; ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে আরও ৭/৮ আত্মঘাতী জঙ্গী উপস্থিত ছিল। অপরদিকে রাজধানীর খিলগাঁও র‌্যাবের চেকপোস্টে মোটরসাইকেল নিয়ে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা ঘটনায় খিলগাঁও থানায় দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, আরও ২ আত্মঘাতী ঘটনাস্থলে ছিল, যারা পালিয়ে গেছে। জেএমবি বা নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম কিংবা হরকত-উল-জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি-বি) জঙ্গী গোষ্ঠী থেকেই আত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আ্ত্মঘাতী জঙ্গী সদস্যরা যেসব স্থানে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা করেছে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেসব আত্মঘাতী জঙ্গী আস্তানায় অভিযান চালানোর পর উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে পাওয়া যায় কালো ব্যানারে সাদা হরফে লেখা আছে দাওয়াতুল ইসলাম।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের প্রথম বহুল আলোচিত আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটে গুলশান হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। এই দুটি জঙ্গী হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ছোট কালো ব্যানারের মধ্যে সাদা হরফে লেখা দাওয়াতুল ইসলাম। তখন এই উদ্ধারকৃত ব্যানারের লেখা আলামতকে তেমন খুব একটা পাত্তা দেননি তদন্তকারীরা। কিন্তু চট্টগ্রামের সীতাকু-ের সাধন কুটির ও ছায়ানীড়ের জঙ্গী আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় দাওয়াতুল ইসলাম ব্যানার। রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার ঘটানাস্থলেও দাওয়াতুল ইসলাম লেখা ছোট কালো ব্যানার উদ্ধার করা হয়। জঙ্গীদের আত্মঘাতী করতে দাওয়াতুল ইসলাম ব্যানারে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে একজন মানুষকে আত্মঘাতী বানায় জঙ্গীরা। আত্মঘাতী হামলায় আগ্রহী এমন ব্যক্তিদের নিয়ে পৃথক ইউনিট করা হয়। জঙ্গীরা প্রথমত দাওয়াতের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ করে। আর এই দাওয়াত তারা দেয় দুভাবে। সরাসরি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দাওয়াত দেয়ার আগে তারা ব্যক্তির মনোভাব বোঝার চেষ্টা করে। প্রাথমিক যাচাই শেষে ওই ব্যক্তির সঙ্গে জঙ্গীরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর সদস্য বানিয়ে তাকে জিহাদসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করে। যখন নতুন সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদে আগ্রহী হয় তখন জঙ্গী দলগুলোর আখি (ভাইগণ) তাদের সঙ্গে সশরীরে, ফোনে কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে দেখা করে। নতুন সদস্যরা আরও সক্রিয় হলে তাদের টেলিগ্র্রাম এ্যাপসের সিক্রেট গ্রুপে সংযুক্ত করা হয়। এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্তির আগে সদস্যদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আকিদাগত তথ্যাদি দিতে হয়। টেলিগ্রামে তাদের জিহাদের বিষয়ে বয়ান করা হয়। এই গ্রুপে সবাই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। শীর্ষ জঙ্গীরা তাদের গতিবিধি খেয়াল করে। নতুন সদস্যদের বিশ্বস্ত মনে হলে তাদের থ্রিমা এ্যাপসে যুক্ত করা হয়। এরপর তাদের সঙ্গে জঙ্গীদের কথিত বড়ভাই বা আমির যোগাযোগ করে। তাকে চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর তাকে আত্মঘাতী হামলা ও জিহাদি মাঠের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নাশকতায় পাঠানো হয়। এই মিশনকে জঙ্গীরা হিযরত বলে থাকে। যে হিযরতে বেরিয়ে পড়ে, সে গ্রুপ থেকে অফলাইনে চলে যায়। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, একবার শীর্ষ জঙ্গী নেতাদের নেতৃত্বে চলে গেলে আত্মঘাতী জঙ্গীরা নিজেদের মধ্যে এক রকমের সমঝোতায় আসে এবং ‘দাওলাতুল ইসলাম’ এর ব্যানারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ‘আত-তামকীন’ নামের একটি ওয়েবসাইট তাদের নাশকতা ও হামলা প্রচার করার তথ্য পাওয়া গেছে। নব্য জেএমবির দুটি গ্রুপ দাওলাতুল ইসলামের ব্যানারে গুলশান ও শোলাকিয়ায় নাশকতা চালায়। তবে চট্টগ্রামের সীতাকু-ের জঙ্গী আস্তানায়ও দাওয়াতুল ইসলাম ব্যানার পাওয়া যাওয়ায় মনে করা হচ্ছে তারাও নব্য জেএমবির আত্মঘাতী জঙ্গী গ্রুপের সদস্যই। জেএমবি ছাড়াও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও হরকত-উল-জিহাদের আরও কয়েকটি গ্রুপ আত্মঘাতী হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তারা যেকোন স্থানে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করে আস্তানায় লুকিয়ে আছে। সারাদেশে জঙ্গীদের সিøপারসেলের বেশ কয়েক সদস্য বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে নাশকতার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুক, ইমো ছাড়াও টেলিগ্রাম, থ্রিমা এ্যাপসের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে থাকে। তাদের দলে নারী সদস্যও আছে। জঙ্গীরা হামলার পর ‘আত-তামকিন’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গণমাধ্যমে নিজেদের আইএস হিসেবে প্রচার করে। তবে আইএস’র সঙ্গে তাদের কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। জেএমবি ও এবিটি নিয়ে গঠিত দাওলাতুল ইসলাম গুলশান, শোলাকিয়া ও মাদারীপুর কলেজ শিক্ষকসহ এখন পর্যন্ত মোট ১৪টি হামলা চালিয়েছে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের এ ধরনের কয়টি গ্রুপ আছে তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামের সীতাকু-ের সাধন কুটির থেকে এক জঙ্গী দম্পতি গ্রেফতার হয়েছে, তারা আত্মঘাতী এবং ছায়ানীড়ে পুলিশ অভিযানে যে চার জঙ্গী নিহত হয়েছে তার মধ্যেও এক জঙ্গী দম্পতি রয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি আত্মঘাতী জঙ্গী আস্তানায় নারী আত্মঘাতী জঙ্গীও রয়েছে। নব্য জেএমবির নারী জঙ্গী ইউনিট এখনও সক্রিয় তার তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের সীতাকু-েও। সম্প্রতি জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী ধরা পড়লেও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম এখন আটক হয়নি। গোয়েন্দারা বলছেন, নব্য জেএমবির মাহমুদা বেগমের নেতৃত্বে নারী আত্মঘাতীদের একটি দল উত্তরাঞ্চলের কোন একটি জেলায় আত্মগোপন করেছে। যে কোন সময় তারা আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারে। টাঙ্গাইল থেকে রাজীব গান্ধীকে গ্রেফতার করার পর জিজ্ঞাসাবাদে সে তার স্ত্রী সম্পর্কে এমনই তথ্য দিয়েছে। রাজীব গান্ধী বলেছে, তার স্ত্রী ইসলামের পথে নিজেকে শহীদ বলে উৎসর্গ করেছে। রাজধানীর দক্ষিণ আশকোনায় জঙ্গী ঘাঁটিতে নিহত হয় জঙ্গী সুমনের স্ত্রী শাকিরা। ওই অভিযানে মিরপুরের রূপপুরে জঙ্গীবিরোধী অভিযানে নিহত সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলাম ওরফে জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা এবং পলাতক জঙ্গীনেতা মুসার স্ত্রী ও মেয়ে আত্মসমর্পণ করে। তবে আত্মঘাতী নারী জঙ্গীরা বেশিরভাগই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক; স্বামীর নির্দেশেই তারা আত্মঘাতী হয়েছে। আবার এমনও দেখা গেছে, পুরো পরিবার জঙ্গীবাদে জড়িত। সারাদেশে আত্মঘাতী পুরুষ জঙ্গীর পাশাপাশি আত্মঘাতী নারী জঙ্গীর সংখ্যাও খুব কম নয়।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে আত্মঘাতী জঙ্গী তৎপরতা থামানো গেলেও আবার নতুন করে দেশের পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের পার্বত্য ও পাহাড়ী এলাকায় আত্মঘাতী জঙ্গী আস্তানা গড়ে উঠছে। পাহাড়ী ও পার্বত্য অঞ্চলের আত্মঘাতী জঙ্গী গ্রুপে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গদেরও যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। দেশে যেসব নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা হয়েছিল তাতে দেশের পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম, সীতাকু-, কক্সবাজার, বান্দরবানের মতো পার্বত্য ও পাহাড়ী এলাকাগুলোকে এখন যুক্ত করে আবার জঙ্গী তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: