২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

আইনের ফাঁকফোকর গলে জঙ্গী অর্থায়ন, অর্থ পাচার হচ্ছেই!


এম শাহজাহান ॥ নানা ধরনের জটিলতার মুখে অর্থ পাচার, সন্ত্রাস ও জঙ্গী অর্থায়ন বন্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হতে পারছে না। এতে জঙ্গী ও সন্ত্রাসাবাদে অর্থায়ন কমছে না, বরং বাড়ছে অর্থ পাচার। আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনটি অধিকতর কার্যকর করতে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

জানা গেছে, সন্ত্রাস ও জঙ্গী অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। বিভিন্ন কৌশল ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জঙ্গীরা অর্থ সংগ্রহ, পাচার ও খরচ করে থাকে। বাংলাদেশে এ সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। এ নিয়ে চিন্তিত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাজেট প্রণয়ন সংক্রান্ত একটি বৈঠকে তিনি জানান, টাকা পাচার ও সন্ত্রাস ও জঙ্গী অর্থায়ন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালো টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে না, বাড়ছে পাচার। আবার সন্ত্রাসী ও জঙ্গীরা বিভিন্ন কায়দা কৌশলে দেশ-বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। জঙ্গীবাদ বিস্তারে খরচ হচ্ছে সেই টাকা। এতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এ বিষয়টির একটি ভাল সমাধান হওয়া উচিত বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী।

জানা গেছে, টাকা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে ইতোপূর্বে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ পাস করা হয়। লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ করা। এছাড়া সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও জাল নোট তৈরির মতো অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের সক্ষম করবে বলে মনে করা হয়েছিল। ওই আইনে মানিলন্ডারিং সম্পর্কিত অপরাধগুলোর সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৮ কর্মকা-কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে- অবৈধ অস্ত্রের বাণিজ্য, সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন, পাইরেসি, উড়োজাহাজ ছিনতাই, অবৈধ মাদক বিক্রি, মানব পাচার, সংগঠিত অপরাধ, জিম্মি করা, কপিরাইট লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও ঘুষ, জাল করা, খুন ও শারীরিক ক্ষতি, যৌন অপব্যবহার, ভয় দেখানো, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, চোরাচালান ও পরিবেশগত অপরাধসমূহ। কেউ মানিলন্ডারিং বা লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদ- এবং ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ টাকা জরিমানার সম্মুখীন হবেন। তবে শাস্তি হিসেবে এই দ- এতদিন লঘু দ- হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাংলাদেশ নিয়ে দেশী ও আন্তর্জাতিক জঙ্গীদের যে অপতৎপরতা রয়েছে তা বন্ধ হবে। পরবর্তীতে আইনটির চারটি ধারাও সংশোধন করা হয়। মানিলন্ডারিং আইনের ধারা ৯ অপরাধের তদন্ত ও বিচার, ধারা ১২ দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদনের অপরিহার্যতা, ধারা ১৪ সম্পত্তির অবরুদ্ধকরণ বা ক্রোক আদেশ এবং ধারা ২৩ মানিলন্ডারিং অপরাধ দমন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ক্ষমতা রয়েছে তা সংশোধন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে জঙ্গী সংগঠনগুলো তাদের তৎপরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে কিংবা অবৈধ পথে অর্থ সংগ্রহ করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ জঙ্গী সংগঠনগুলো তাদের অর্থ দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ওই বিনিয়োগকৃত অর্থের লভ্যাংশ দিয়ে সংগঠনের খরচ বহন করছে। বিষয়টি সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে যাতে বৈধ-অবৈধ পথে জঙ্গী অর্থায়ন আসতে না পারে সে জন্য কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও ফলপ্রসূ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের এসব পদক্ষেপের পরও বিএনপি-জামায়াত জোটের মৌলবাদী রাজনীতি বিশেষ করে হুজি, হরকাতুল জিহাদ, হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটছে। এছাড়া কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত বিভিন্ন এনজিও, যাদের মধ্যে আছে চাষী কল্যাণ সমিতি, রাবেতা আল আলম আল ইসলাম, কাতার চ্যারিটেবল সোসাইটি, ইসলামিক রিলিফ এজেন্সি, আল ফোরকান ফাউন্ডেশন, মুসলিম এইড বাংলাদেশ প্রভৃতি। এসব এনজিও থেকে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনও সহায়তা পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের অর্থ নিয়ে অনেকে বিদেশ যাচ্ছে এবং সেখান থেকে অর্থ পাঠিয়ে জঙ্গীবাদ প্রসারে কাজ করছে।

এদিকে, এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে বিক্ষিপ্তভাবে জঙ্গী হামলা হচ্ছে। এসব ঘটনার পর পাকড়াও হয়েছে অনেক জঙ্গী। সম্প্রতি একাধিক জঙ্গী হামলার পর আবারও সামনে এসেছে জঙ্গী অর্থায়নের বিষয়টি। প্রতিবারেই ঘুরে ফিরে আলোচনায় এসেছে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন। জঙ্গীদের যারা অর্থ ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের হাতে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে নাশকতায় অর্থ যোগানদাতাদের সন্ধানে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয় বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেই নির্দেশনা মোতাবেক সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের জুলাইয়ে দুই দফায় দেশে কার্যরত ৫৬ তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈঠকে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিভিন্ন সার্কুলার ও গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়।

ব্যাংকগুলোর প্রতিবেদনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন, রেমিটেন্স ও আমদানি-রফতানির সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়। এছাড়া গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি (কেওয়াইসি) সংগ্রহ করে এ্যাকাউন্ট খোলা, কোন গ্রাহকের কেওয়াইসি পূর্ণাঙ্গ না থাকলে তা সংগ্রহ ও সংরক্ষণসহ সার্বিক বিষয়ে তথ্য জমা দিয়েছে ব্যাংকগুলো।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গী হামলা হচ্ছে। সম্প্রতি সীতাকুন্ডে এবং ঢাকার আশকোনায় আত্মঘাতী জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছেন, দেশে জঙ্গী অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায় এখনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সজাগ রয়েছে। তিনি বলেন, হুন্ডি ও বিকাশ এ্যাকাউন্ট অপব্যবহার করে জঙ্গী অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণে আজও উপায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সজাগ থেকে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে।

তবে জঙ্গী অর্থায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশে জঙ্গী অর্থায়ন বন্ধ করার কোন কার্যকর উপায় কেন্দ্রীয় বাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আজও বের করতে পারেনি। এমনকি বিকাশ এ্যাকাউন্টের সুবাদে যেসব হুন্ডি কারবার চলছে তাও নিয়ন্ত্রণের কোন যথাযথ পথ পাওয়া যায়নি। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, জঙ্গীদের এনজিও এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও তাদের কিছু ব্যক্তির কাছে প্রচুর টাকা আছে। বিদেশ থেকেও নানা পথে তাদের টাকা আসে। এই অর্থায়ন বন্ধে জঙ্গী এনজিওগুলো নিষিদ্ধ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে জামায়াত সারাদেশে যে এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছে, সেগুলো এখন তাদের ভোল পাল্টে ফেলেছে। তাই অর্থায়ন বন্ধে ব্যাংকগুলো যে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: