২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা ও ১১ মার্চ ১৯৪৮


(১৫ মার্চের পর)

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজনফর আলী খান প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, “পাকিস্তানের একটি মাত্র সাধারণ ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হচ্ছে উর্দু। আমি আশা করি যে, অচিরেই সমস্ত পাকিস্তানী ভালভাবে উর্দু শিক্ষা করে উর্দুতে কথাবার্তা বলতে সক্ষম হবে। উর্দু কোন প্রদেশের ভাষা নয়, তা হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতির ভাষা এবং উর্দু ভাষাই হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতি।” [সূত্র : ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-বশির আল হেলাল, পৃ. ২৪৪]

গণপরিষদের সহ-সভাপতি মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য ফরিদপুরের তমিজুদ্দিন খান কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তির সংশোধনী প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করে খাজা নাজিমুদ্দিনকে সমর্থন করেন। গণপরিষদ সদস্য প্রেমহরি বর্মা ও ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত তাঁদের বক্তৃতায় নানা বিশ্লেষণ ও যুক্তি দিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বক্তব্য সমর্থন করেন। পাকিস্তান গণপরিষদের এই দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন পাকিস্তানের গবর্নর জেনারেল এবং পদাধিকারবলে গণপরিষদের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আনীত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তির জন্য সংশোধনী প্রস্তাব ভোটে প্রদান করলে গণপরিষদের অধিবেশনে তা কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।

পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এবং পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান নেয়ার সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা দেয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জমায়েত হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন তমদ্দুন মজলিসের নেতা আবুল কাসেম। বক্তব্য রাখেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহমদ এবং ফজলুল হক হল ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা। নেতৃবৃন্দ তাঁদের বক্তব্যে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাংলা ভাষাকে অবহেলা করায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং মুসলিম লীগ দলীয় গণপরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারা পূর্ববঙ্গে মিছিল, সমাবেশ ও ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তমদ্দুন মজলিস এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের এক যৌথসভায় ১১ মার্চ পূর্ববঙ্গে সাধারণ ধর্মঘট পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক আবুল কাসেম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান, নঈমুদ্দিন আহমদ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনের পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের নেতা আবদুর রহমান চৌধুরী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১ মার্চ ১৯৪৮ এক বিবৃতি প্রদান করেন।

১১ মার্চ ১৯৪৮ পূর্ববঙ্গে সাধারণ ধর্মঘট

২৮ ফেব্রুয়ারি তমদ্দুন মজলিস এবং পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় রাষ্ট্রভাষা সাব কমিটি গঠিত হওয়ায় ইতোপূর্বে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অনানুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। শূন্যতা পূরণ করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ২ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে কমরুদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে বিভিন্ন ছাত্র-যুব-রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের এক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন আবুল কাসেম, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল আলম, রণেশ দাশগুপ্ত, আজিজ আহমদ, অজিত গুহ, শামসুদ্দীন আহমদ, তফাজ্জল আলী, সরদার ফজলুল করিম, আলী আহমেদ, মহীউদ্দিন, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল আউয়াল, শহীদুল্লা কায়সার, তাজউদ্দীন আহমদ, লিলি খান, নুরুল আলম, আবদুল অদুদ প্রমুখ। সংগঠনগতভাবে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন, প্রগতি লেখক সংঘ এ দিনের সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়।

আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির দুটি সভা ৪ ও ৫ মার্চ ১৯৪৮ ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত হয়। ১০ মার্চ একই হলে অনুষ্ঠিত সংগ্রাম কমিটির সভায় ১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের বিস্তারিত কর্মসূচী চূড়ান্ত করা হয়। ঢাকা শহরের কোন্ কোন্ স্থানে পিকেটিং হবে, কে কোন্ পয়েন্টে নেতৃত্ব দেবে ইত্যাদি ঠিক করা হয় এই সভায়।

১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান নিয়েও নানা ধরনের চক্রান্ত চলে। আন্দোলনের অনভিজ্ঞতা, ভয়-ভীতি, মুসলিম লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফরÑ সবকিছু মিলিয়ে নেতৃত্বের অনেকেই দোদুল্যমানতায় ভুগছিলেন কর্মসূচীর বাস্তবায়ন নিয়ে। ভাষা আন্দোলনের এই পর্বে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দূরদৃষ্টি, সাহস এবং সাংগঠনিক দক্ষতা প্রথম পর্যায়ের এ আন্দোলনে গতি সঞ্চার করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আন্দোলনকে সংগঠিত করে লক্ষ্যের পথে এগিয়ে যেতে তাঁর দৃঢ়প্রত্যয়ী ভূমিকা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেন,

“ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের একটি সভা বসল। সভায় আপোসকারীদের ষড়যন্ত্র শুরু হলো। রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়কসহ অনেকেই তখন দোদুল্যমানতায় ভুগছে, আপোস করতে চাইছে সরকারের সঙ্গে। একটি বজ্রকণ্ঠ সচকিত হয়ে উঠল- সরকার কি আপোস প্রস্তাব দিয়েছে? নাজিমুদ্দিন সরকার কি বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিয়েছে? যদি তা না হয়ে থাকে তবে আগামীকাল ধর্মঘট হবে, সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিং হবে। এই বজ্রকণ্ঠ ছিল শেখ মুজিবের। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবকে সমর্থন দিলেন অলি আহাদ, তোয়াহা, মোগলটুলীর শওকত সাহেব, শামসুল হক সাহেব। আপোসকামীদের ষড়যন্ত্র ভেসে গেলো।”

[সূত্র : ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, লেখক : মাযহারুল ইসলাম, পৃ. ২৪-২৫]

গাজীউল হকের বক্তব্যের সমর্থন মিলল অলি আহাদের কথায়। এ প্রসঙ্গে অলি আহাদ বলেন, “সেদিন সন্ধ্যায় যদি মুজিব ভাই ঢাকায় না পৌঁছাতেন তাহলে ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং কিছুই হতো না।”

[সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-জীবন ও রাজনীতি, প্রথম খ-, সম্পাদক-মোনায়েম সরকার, পৃ. ১৬৭]

১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘট সফল করার জন্য ভোর থেকেই ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জগন্নাথ কলেজসহ ঢাকা শহরের প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্ররা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পিকেটিং করে। নীলক্ষেত ও পলাশী ব্যারাক, টেলিগ্রাফ অফিস, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ ও রমনা পোস্ট অফিসে অবরোধ কর্মসূচী পালিত হয়। চলবে...