২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম


(গত শুক্রবারের পর)

নারীর অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়েছিল যে, তারা যেন সৃষ্টি হয়েছে কেবলমাত্র পুরুষের চিত্তবিনোদন ও কাম ক্ষুধা মেটানোর জন্য। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিয়ে বিধান প্রবর্তন করে নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করলেন। নারীর সম্মতি ছাড়া কোন পুরুষ কোন নারীকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে পারবে না। এই বিধান দিয়ে তিনি নারীদের মর্যাদা সমুন্নত করলেন। স্ব^ামী গ্রহণের ক্ষেত্রে তার পছন্দ করার পূর্ণ অধিকার দেয়া হলো; ফলে পুরুষ ইচ্ছে করলেই একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে এমন যে রীতি প্রচলিত ছিল তা আর থাকল না। পুরুষের স্ত্রীর ওপর যতটুকু অধিকার স্ত্রীরও পুরুষের ওপর ততটুকু অধিকার নিশ্চিত করা হলো। কুরআন মজীদে স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন। তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে তোমাদের ওপরও তাদের তেমনি অধিকার আছে। (তিরমিযি) তিনি আরও বললেন : তোমরা যা খাবে, তোমরা যা পরবে তোমাদের স্ত্রীদেরও তা খেতে ও পরতে দেবে। (আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজা)। সকল প্রকার জিনা অর্থাৎ নারী-পুরুষের অবৈধ মিলন তথা ব্যভিচারকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মাধ্যমে উপপতœী ও রক্ষিতা রাখার কুপ্রথাকে উৎখাত করা হয় এবং কাদের সঙ্গে বিবাহ হতে পারবে এবং কয়টা পর্যন্ত বিয়ে কোন্ শর্ত সাপেক্ষে হতে পারে তা স্থির করে দিয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম নারী সমাজের মর্যাদা ও সম্মানকে যেমন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শক্ত বুনিয়াদ নির্মাণ করে দেন। ফলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সুশৃঙ্খল জীবনবোধের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে যায়। স্ত্রী এবং স্বামী দৈহিকভাবে আলাদা দুটি সত্তা হলেও তারা দুয়ে মিলে এক আত্মা এই চেতনা দান করেছেন প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : এবং তাঁর (আল্লাহু) নিদের্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে : তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং (আল্লাহ্) তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন, (সূরা রূম : আয়াত ২১)। তিনিই (আল্লাহ্) তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন। যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়। (সূরা আরাফ, আয়াত : ১৮৯)।

এই দু’খানি আয়াতে কারিমাতে বলা হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন যাতে করে সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হয়। এতে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক এবং পরস্পরের প্রীতিবন্ধন যত মজবুত হবে দাম্পত্য জীবন তত সুখী-সুন্দর হবে। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে নারীকে মনে করা হতো পাপের মূল উৎস এবং কোন কোন ধর্মে তো বলাই হয়েছেÑ নারীই হচ্ছে শয়তানের ফাঁদ। আর প্রিয়নবী (সা) এসে ঘোষণা করলেন যে, তারা পরস্পর পরস্পর থেকে। সংসার জীবনে নারী-পুরুষের মর্যাদা একই রকম। গৃহে স্ত্রীর অবস্থান একজন সম্রাজ্ঞীর মতো। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের সবাই এক একজন শাসক (রা’ঈ) এবং প্রত্যেকেই তার নিয়ন্ত্রণাধীনদের (রা’য়ত) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আমীর (রাজা) হচ্ছে দেশের শাসক আর পুরুষ হচ্ছে পরিবারের শাসক। নারী হচ্ছে স্বামী ও সন্তানদের শাসক। সুতরাং তোমরা প্রত্যেকেই শাসন কর্তা এবং প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে (বিচার দিনে) তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীনদের সম্পর্কে (বুখারী শরীফ)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নারীকে মাতা হিসেবে তার মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন : কার খিদমত করা আমার কর্তব্য? প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : তোমার মাতার। সাহাবি বললেন, তারপর? প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : তোমার মাতার, সাহাবী আবার বললেন, তারপর? প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমার পিতার এবং তারপর পর্যায়ক্রমে তোমার আত্মীয়স্বজনের (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযি শরীফ, আবু দাউদ)।

এক তরুণ সাহাবি প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন : তোমার মা আছেন? সাহাবি বললেন : জি, হ্যাঁ। তখন প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : যাও তোমার মায়ের খিদমত কর গিয়ে। নিশ্চয় তোমার মায়ের পদতলেই তোমার জান্নাত (আহমাদ, নাসাঈ, বায়হাকী।)

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করার কোন ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে বঞ্চিত হতো। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামই সর্বপ্রথম নারীকে পুরুষের সহশরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন এবং মৃতের সম্পত্তির হিস্যাদার হিসেবে তার অধিকার নিশ্চিত করলেন। তিনি উত্তরাধিকার বিষয়ক যে বিধিবিধান প্রদান করলেন তাতে অগ্রগণ্য যে বারোজন উত্তরাধিকারী স্থির করা আছে তার মধ্যে আটজনই হলো নারী। কুরআন মজীদে মৃতের সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা এবং আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক অথবা বেশিই হোক, এক নির্ধারিত অংশ (সূরা নিসা : আয়াত ৭)।

এই আয়াতে কারিমা দু’খানিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক জিনিস আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। নারী-পুরুষ সেই জোড়ারই অন্তর্গত। মানব সন্তান সেই জোড়ারই ফসল। কুরআন মজীদে তো স্ত্রীদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। (সূরা বাকারা : আয়াত ২২৩)।

নারী ও পুরুষের মধ্যে দেহগত ও মনোগত পার্থক্য থাকলেও মানবিক সত্তার দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে এই পার্থক্য মুখ্য হয়ে ওঠে না। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম পারিবারিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রাখার অধিকার যেমন নারীকে দিয়েছেন তেমনি তাকে মর্যাদা দান করেছেন। সমাজ-সংসার যে নর-নারীর সম্মিলিত প্রয়াসেই গড়ে ওঠে তার শিক্ষা তিনি সুস্পষ্টভাবে দিয়েছেন। তিনি আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়েরই অবদান রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, উপার্জন ক্ষেত্র নারীর অধিকারও সুদৃঢ় করেছেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। (সূরা নিসা : আয়াত ৩২)। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদ্যা অর্জনের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। নারী-পরুষ উভয়কেই বিদ্যা হাসিল করবার জোর তাকিদ দিয়ে তিনি বলেছেন : বিদ্যা অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর অবশ্য কর্তব্য।

কুরআন মজীদে নারী-পরুষ উভয়কেই পরিশ্রমী ও কর্মনিষ্ঠ হবার তাকিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি তোমাদের মধ্যে কোন কর্মনিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না। তোমরা একে অপরের অংশ। (সূরা আল- ইমরান : আয়াত ১৯৫)

এই আয়াতে কারিমায় আরও লক্ষ্য করা যায় যে, এখানে নারী ও পুরুষকে বলা হয়েছে বা’দুকুম্ মিম্ বা’দি-অর্থাৎ তোমরা একে অপরের অংশ। এর দ্বারা নারীর অধিকার ও মর্যাদা পুরুষের সমান অবস্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম নারীর যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে মানবিক মূল্যবোধের সামগ্রিক সৌকর্য জোরদার বুনিয়াদ লাভ করেছে। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের আদর্শই সর্বকালের মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল বিশ্বশান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। (সমাপ্ত)

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা) সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ