২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মীমের নতুন বইয়ের গন্ধ খাক হলো আগুনের লেলিহানে


মীমের নতুন বইয়ের গন্ধ খাক হলো আগুনের লেলিহানে

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ আগুনে পোড়া বইগুলো হাতে নিয়ে বসে আছে সুমাইয়া আক্তার মীম। ভোলা থেকে আগত মীম মা-বাবা, নানি ও মামার সঙ্গে বস্তিতে থাকত। রাজধানী মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী সে। বুধবার রাতে পড়াশোনা শেষে বইগুলো যথারীতি স্কুলব্যাগে গুছিয়ে রেখেছিল সে। সকালে যে আবার স্কুলে যেতে হবে। কিন্তু রাত তিনটায় তার ঘুম ভেঙ্গে যায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায়। বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদসংলগ্ন চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের পাশের বাঁশবাড়ি বস্তি আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। লোকজনের চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে তড়িঘড়ি করে মীম বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেও ছোট এ মানুষটি তার স্কুলব্যাগটি আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। সকাল দশটায় যখন আগুন নিভল, প্রথমেই মীম খোঁজ করেছে তার বইগুলোর। পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে তার বইগুলো।

বৃহস্পতিবার বিকেলে বাঁশবাড়ি বস্তিতে গিয়ে দেখা গেল, পুড়ে যাওয়া বইসহ ব্যাগটি হাতে ধরে বসে আছে মীম। চোখ-মুখে তার বিষণœতা। বলল, ‘আমার নতুন বইয়ে আমি একটুও কলমের কালি লাগতে দিইনি। এখন আর স্কুলে যাওয়া হবে না। কবে ঘর ঠিক হবে তারপর পড়ালেখা শুরু হবে।’ কথাগুলো বলতে বলতে চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল বেরিয়ে এলো ছোট্ট মেয়েটির। ভোলা থেকে তিন বছর আগে ঢাকায় আসে মীম। মা গৃহকর্মী, বাবা মারা গেছে। তাদের সঙ্গে বস্তির পাশের ঘরটিতে থাকতেন তার নানি ও মামা। তারাও খেটে খাওয়া মানুষ। মীমের একটি ভাই আছে, বয়স চার বছর। মীমের মা লতিফা বেগম জানালেন, ঘরে তার জমানো ২০ হাজার টাকা ছিল। না খেয়ে, না খেয়ে তিনি জমিয়েছিলেন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। এখন সে সম্বলটুকুও তার নেই। জানালেন, সকাল থেকে মীম ও তার ছোট বাচ্চাটি না খেয়ে আছে। দুই সন্তান নিয়ে দিশাহারা লতিফা এখন আবার নতুন করে কিভাবে সবকিছু শুরু করবেন তা জানেন না।

বৃহস্পতিবার রাতের আগুনে কেউ হতাহত না হলেও ভস্মীভূত হয়ে গেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ি বস্তির সহায়-সম্বলহীন পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই। সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এসব পরিবারের সন্তানদের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ, স্কুলড্রেস। বস্তিতে সরেজমিন দেখা গেল, এসব খুদে বাচ্চা নিজ নিজ ঘরের সামনে গিয়ে আগুনে পোড়ার মাঝেই খুঁজে চলছে বই-খাতা, স্কুলব্যাগ। দুদিন পর কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে তা এসব শিশু জানে না। তাদের সকলেরই এখন প্রশ্ন- এখন তারা কিভাবে লেখাপড়া করবে। একই প্রশ্ন শিশু পারুল, জাহিদ, শম্পা, সুমি, আকলিমা, নিরব, রতœা, বিলকিস, রেখা, মীনাসহ প্রায় ছয় শতাধিক ছাত্রছাত্রীর। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশবাড়ির এ বস্তিতে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ছিল এবং প্রতিটি পরিবারে অন্তত ছয়জন করে সদস্য ছিল। বিশেষ করে এ বস্তির মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগই শিশু-কিশোর। শিশুদের ভাষ্য, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারাও বিধ্বংসী আগুন থেকে শুধু নিজেদের প্রাণটুকুই বাঁচাতে পেরেছে। ভোর থেকে খোলা হাওয়ায় থাকার কারণে অনেক শিশুরই গলার স্বর ভেঙ্গে গেছে। সারাদিন না খেয়ে থাকায় অনেকে আবার দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাঁশবাড়ি বস্তিতে আগুন লেগে প্রায় দুই শ’ ঘর পুড়ে গেছে। এসব ছিন্নমূল মানুষের ঠাঁই এখন খোলা আকাশের নিচে। অনেকের চিরকালের সঞ্চয় পুড়েছে আগুনে। এ বস্তিতে বসবাসরত অধিকাংশই দিনমজুর। রাতের ঘুম ভাঙ্গায় হঠাৎ তারা আবিষ্কার করেন বস্তিতে আগুন লেগেছে। তারা কেউই জানেন না কিভাবে বস্তিতে আগুন লেগেছিল। তবে অনেকের ধারণা, কেউ হয়তবা পরিকল্পনা করেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বস্তিতে। রিক্সাচালক আফতাব মিয়া, দিনমজুর আরিফ, মিলন মিয়া, ভ্যানচালক গিয়াস উদ্দিন, করিম হোসেন, আসমা বেগম, কবিতা, রেশমা আক্তার জনকণ্ঠকে জানালেন, অনেক কষ্ট করে এ বস্তিতে এসে ঝুপড়িঘর তৈরি করে বসবাস করছিলেন। বাঁশের কঞ্চি আর পলিথিনঘেরা ছোট ঝুপড়িঘরগুলোও ছাই হয়েছে। আমাদের তিল তিল করে গড়া জীবনযুদ্ধের সংসার তছনছ হয়ে গেল।

মরার আগুন গিলে খেল ভাতের থালা, পরনের কাপড় এমনকি টানাটানির সংসারের টিনের বাক্স। সরেজমিন ভস্মীভূত বস্তিতে দেখা যায়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে আধপোড়া বাক্স, ছেঁড়া কাঁথা, মশারির টুকরা, ঝলসে যাওয়া বাসনপত্র, রান্নার স্টোভ, হাঁড়িকুড়ি। অনেকেই জানালেন, তাদের প্রত্যেকের ঘরেই নগদ টাকা ও আসবাবপত্রসহ প্রায় লাখখানেক টাকার জিনিস খোয়া গেছে।

বস্তির চারপাশে জটলা করে বসে থাকতে দেখা গেল গৃহহীনদের। দুধের শিশুকে বুকে চেপে বসে আছেন মা। তারা সকলেই অভুক্ত। রাতে খাবার খেয়ে ঘুমানোর পর তাদের ঘুম ভেঙ্গেছে আর্তনাদে। তারপর থেকেই তারা অভুক্ত। পোড়া বস্তির সর্বত্রই বিষন্নতার ছবি। এক শিশুকে মারধর করছিলেন এক মা। মারছেন কেন? আরে ভাই বলবেন না, মানুষ চিড়া-গুড় দিয়েছে খাবার জন্য। সকাল থেকে চেষ্টা করছি তাদের খাওয়াতে কিন্তু খাচ্ছে না। কী কারণে? তাদের নতুন বই এনে দিতে হবে। সঙ্গে স্কুলের ড্রেসও। জান নিয়ে বের হয়েছি, ওই বই-খাতা আর ড্রেসের কথা কি স্মরণ ছিল? নতুন বই, ড্রেস না দিলে তারা খাবে না। বলেছি, ঘর ঠিক হওয়ার পর আবার বই কিনে দিব, স্কুলড্রেসও বানিয়ে দিব। এসব ছোট শিশুর এ আবদার কতদিন বাদে মিটবে তা জানা নেই তাদের অভিভাবকের। এখন শুধুই অপেক্ষা কবে নাগাদ রাজধানীর ছিন্নমূল এসব হতদরিদ্র পরিবার আবার কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। আবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবে।