১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জয়তু নির্ভয় সাংবাদিক স্বদেশ রায়


টুঙ্গিপাড়ার সে খোকাই পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা হয়েছিলেন। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কারণ অজস্র গুণে পরিপূর্ণ ভা-ারের অধিপতি ছিলেন তিনি। শৈশব থেকেই তিনি যেমনি অনুভব করতেন কৃষকের বঞ্চনা এবং শ্রমিকের নিষ্পেষণের কথা, তেমনি গুণীজনের গুণের মূল্যায়ন করার আবশ্যকতাও তিনি ভুলতেন না।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার যেসব গুণাবলী নিয়ে মহানুভবতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠে আজ বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের জন্য রক্ষিত অবিভাজ্য আসনে অভিষিক্ত হয়েছেন, তার মধ্যে গুণীদের সমাদর করাও অন্যতম।

সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণের মধ্যে রয়েছে প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ, কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি শামসুর রাহমান, মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠশিল্পী আজম খান এবং কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, নাট্যকার সেলিম আল দীন প্রমুখের চিকিৎসার দায়িত্বভার গ্রহণ ইত্যাদি। বহু উদাহরণের মধ্যে এগুলো কয়েকটি মাত্র।

তিনি ক্ষমতায় আসার পরে যতজনকে স্বাধীনতা এবং একুশে পদক দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অযোগ্য কোন ব্যক্তি ছিল একথা তাঁর অজাত শত্রুও বলতে পারবে না। তাঁর সময়ে যে সব মেধাবানকে পদক দেয়া হয়েছে তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্রে পুরোপুরি দীক্ষিত। অথচ জিয়াউর রহমান তার অবৈধ শাসন আমলে শর্ষিনার পীর নামক এমন এক রাজাকারকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে এ পুরস্কারের বৈশিষ্ট্যকে কলঙ্কিত করেছিলেন, যে কিনা মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিদের ধর্ষণযজ্ঞকে ধর্মসম্মত বলার মতো ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছিল। একুশে পদক প্রদানের ব্যাপারে এবারও কোন ব্যতিক্রম ঘটাননি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নিশ্চিয়ই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত। যে ১৭ ব্যক্তিত্বের নাম একুশে পদক প্রদানের জন্য প্রকাশিত হয়েছে, তাদের সকলেই একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি পুরোপুরি অনড়, অন্যদিকে তেমনি স্ব-স্ব অবস্থানে কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব। তাদের সকলকেই জানাচ্ছি অভিনন্দন। তবে কয়েকটি বিশেষ কারণে আজকের এই লেখা নিবেদন করছি আমার একান্ত প্রিয়ভাজন সাংবাদিক স্বদেশ রায়কে।

স্বদেশ রায় শুধু একজন সম্মোহনের গুণাবলী সম্পন্ন কলম লেখকেরই নাম নয়, স্বদেশ রায় এক দ্রোহের নাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে আপোসহীন এক সৈনিকের নাম, এক দেশপ্রেমিক বাঙালীর নাম, আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনা-ধারকের নাম এবং সর্বোপরি আদর্শের প্রশ্নে ভয়হীন এক সিংহ পুরুষের নাম যাকে একজন উপযুক্ত মুজিব সৈনিক, মুজিব আদর্শের অনুসারী বলা ভুল হবে না। সম্প্রতি জনৈক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি আমাকে বলেছেন প্রতি বৃহস্পতিবার স্বদেশের লেখা পড়ার জন্য তিনি আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করেন।

বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যখন স্বদেশ রায়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন, তখন স্বদেশ যে সাহসী ভূমিকা পালন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তা দেশের প্রতিটি মানুষকেই অনুপ্রাণিত এবং অবিভূত করেছে। ছাত্র এবং পরবর্তীতে কর্মজীবনেও তিনি স্বৈরাচার এবং পাকিপ্রেমী শাসকদের বিরুদ্ধে সর্বদা সাহসী অবস্থানে থাকতেন।

২০১৪ সালের ১০ সেপ্টে¤¦র। আপীল বিভাগে যুদ্ধাপরাধী কামরুজ্জামানের আপীল শুনানি চলাকালে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রকাশ্য আদালতে, আদালত বোঝায় আইনবিদ, সাংবাদিক এবং দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে বলেনÑ তিনিও ১৯৭১ সালে একজন শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। পরদিন অর্থাৎ ১৫ সেপ্টে¤¦র বিচারপতি সিনহার সেই স্বীকারোক্তি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে দেশবাসী তা জেনে হতভ¤¦ হন।

কালক্ষেপণ না করে স্বদেশ রায় তার বৃহস্পতিবারের উপসম্পাদকীয়তে যা লিখেছিলেন সংক্ষেপে তা ছিল এই যে, যে ব্যক্তি গোলাম আযমসৃষ্ট শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন, যে শান্তি কমিটির উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ প্রতিহত করা, তিনি আপীল বিভাগ কেন, দেশের কোন আদালতেরই বিচারক থাকতে পারেন না। বিচারপতি সিনহা স্বদেশ রায়ের এই লেখনীতে ক্ষুব্ধ হলেও তখন কোন পদক্ষেপ নেননি। কেননা তিনি ’৭১-এ শান্তি কমিটিতে ছিলেন এ কথা বিচারপতি সিনহার নিজের মুখ থেকেই বেরিয়েছে।

এরপর সাকা চৌধুরীর আপীল যখন আপীল বিভাগে আসে তখন এটা প্রকাশিত হয়ে যায় যে, প্রধান বিচারপতি সিনহার সঙ্গে, যার আদালতে সাকার আপীল চলছে, সাকার পরিবারের সদস্যরা দেখা করেছে। নির্ভীক স্বদেশ রায় স্বাভাবিকভাবেই এটি অত্যন্ত গর্হিত ব্যাপার মনে করেন। কেননা পৃথিবীর কোন দেশেই সে বিচারকের সঙ্গে কোন বিচারপ্রার্থীর পরিবার দেখা করতে পারে না, যার আদালতে তার মামলা বিদ্যমান। বিচার প্রক্রিয়ায় এর চেয়ে বড় অপরাধ কমই আছে। স্বদেশ রায়ের এ লেখার পর প্রধান বিচারপতি আদালত অবমাননার রুল জারি করলে বহু উঁচু মাপের আইনজ্ঞসহ অনেকেই স্বদেশকে ক্ষমা চাইতে বলেন। বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দ্বন্দ্বে যাওয়া মানে পানিতে থেকে কুমিরের সঙ্গে পাল্লা ধরা। আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি দেশের তিন না¤¦ার ব্যক্তি। স্বদেশের সাফ কথা ছিল আদর্শের প্রশ্নে কোন আপোস হতে পারে না। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ৬ বছর জেল হলেও ক্ষমা চাইব না’ বস্তুত তিনি জেলে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। তিনি মাফ চাননি, বরং শেষপর্যন্ত আদালতে প্রমাণ করে ছেড়েছেন যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাকার পরিবারের সদস্যরা দেখা করেছে। এহেন প্রমাণ উপস্থাপনের কারণে প্রধান বিচারপতি সিনহা সাকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার কথা নিজেই প্রকাশ্য আদালতে এবং পরবর্তীতে তার রায়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

নিকট অতীতে প্রধান বিচারপতি আদালতে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে স্বদেশ রায় সংবিধানের চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করে প্রধান বিচারপতি সিনহার উক্তি খর্ব করে লিখেছিলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনেক ক্ষমতার অধিকারী, প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের ক্ষমতাসহ।

অনেকেই স্বদেশ রায়কে এও বলেছিলেন যে, একজন হিন্দু হয়ে তিনি কেন অন্য এক হিন্দুর বিরুদ্ধে লিখছেন। কবি নজরুল ইসলামের মতো তিনিও বলেছিলেন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন্্ জন’। তার জবাব ছিল স্পষ্ট- কে হিন্দু, কে মুসলমান সেটা দেখার বিষয় নয়। কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল আর কে শান্তি কমিটির সদস্য হয়ে পাকিস্তানী হানাদারদের সহায়তা করে গণহত্যা-গণধর্ষণের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, সেটাই বড় কথা। তার কথা ছিল রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য কোন্্ ধর্মের লোক সেটা বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না।

এমনি একজন সাহসী এবং নীতির প্রশ্নে অনমনীয়, নির্ভীক সাংবাদিক দেশের সমূহ মঙ্গল সাধনে সক্ষম বিধায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একুশে পদকের জন্য তাকে মনোনীত ও সম্মানিত করায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকলের প্রশংসার দাবিদার।

অন্যদিকে এ গৌরব অর্জনের জন্য স্বদেশ রায়কে অকুণ্ঠ অভিনন্দন।

প্রধান বিচারপতি সিনহা দুই মাননীয় মন্ত্রীর আদালত অবমাননা শুনানিকালে ন্যায় বিচারের ন্যূনতম রুল অবজ্ঞা করে স্বদেশ রায় এবং বর্তমান লেখককে প্রকাশ্য আদালতে বিতর্কিত বলেছিলেন। আইনের প্রথম বর্ষের ছাত্ররাও জানেন নেচারেল জাস্টিসের বিধান মতে কোন ব্যক্তির বক্তব্য না শুনে তার বিরুদ্ধে কিছু বলা বা করা যায় না। তবে নিয়তির বিধান কারও কারও জন্য বড়ই করুণ হতে পারে। প্রধান বিচারপতি সিনহা যাকে বিতর্কিত বলেছেন সে ব্যক্তিই আজ মহান রষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়ে মহিমান্বিত।

কবিগুরু লিখেছেন ‘হবে জয়, হবে জয়, হবে জয় রে, ওহে বীর, হে নির্ভয়’। গুরুদেবের কথা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হলো।

লেখক : সাবেক বিচারপতি, বাংলাদেশ

সুপ্রীমকোর্ট, আপীল বিভাগ