১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রণাঙ্গনের ছয় মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই


জীবনবাজি রেখে লালসবুজের বিজয় পতাকা ছিনিয়ে এনেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন বেপারী, নজরুল সরদার, মোক্তার হোসেন, ছত্তার হাওলাদার, অজিত মধু ও আবুল কাশেম খান। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ী হলেও তারা জীবনযুদ্ধে হয়েছেন পরাজিত। সব সনদপত্র থাকা সত্ত্বেও দেশ স্বাধীনের দীর্ঘদিন পরেও তারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। ইতোমধ্যে ছত্তার হাওলাদার ও আবুল কাশেম খান জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন বেপারী, নজরুল সরদার, অজিত মধু ও মোক্তার হোসেন তালিকাভুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় এখনও দিন গুনছেন।

জাকির হোসেন বেপারী ॥ ভাই হত্যার পরিশোধ নিতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বংকুরা গ্রামের জাকির হোসেন বেপারী। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করার খবর ফাঁস হওয়ায় ১৯৭১ সালের ২২ জুলাই রাজাকারদের ইশারায় তার বড় ভাই মজিবর রহমান বেপারীকে প্রকাশ্যে হত্যা করে পাক হানাদাররা। এ হত্যাকা-ের পরিশোধ নেয়ার জন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। আগস্ট মাসে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিনের নির্দেশে তারই পরিচালিত ফরিদপুরের জহরেরকান্দি প্রশিক্ষণ সেন্টারে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে হেমায়েত বাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট, কোটালীপাড়ার শিকির বাজার, ঘাঘর এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে গৌরনদীর শরিফাবাদের কাদের কমান্ডারের নেতৃত্বে সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান তাঁকে পৃথক সনদপত্র দেন। এছাড়া হেমায়েত বাহিনীর প্রধান তাঁকে হেমায়েত বাহিনী পদকও প্রদান করেছেন। এত কিছুর পরেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হতে পারেননি। একাধিকবার গেজেটভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমানে তিনি হৃদরোগসহ নানারোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী রয়েছেন।

ছত্তার হাওলাদার ॥ দেশ মাতৃকার টানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন আব্দুস ছত্তার হাওলাদার। জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ২০১১ সালে এ বীর যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। গৌরনদী উপজেলার জঙ্গলপট্টি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস ছত্তার হাওলাদারের অসহায় বিধবা স্ত্রী আছিয়া বেগম জানান, সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডারের দাবিকৃত উৎকোচ দিতে না পারায় তার স্বামীর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি আরও জানান, তার স্বামীর নাম গেজেটভুক্ত করার জন্য তিনি অনলাইনে আবেদনসহ দীর্ঘদিন থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে ধর্ণা দিয়েও সুফল পাননি। আবদুস ছত্তার হাওলাদার ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমলানী যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি ৯নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম.এ জলিল ও মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বাহিনীর অধীনে যুদ্ধে অংশ নেন।

মোক্তার হোসেন ॥ মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বানারীপাড়া উপজেলার লবনসাড়া গ্রামের মোক্তার হোসেন। ১৯৭১ সালে বরিশাল বিএম কলেজের এইচএসসির ছাত্র মোক্তার হোসেন দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীনতা আনতে ভারতের বারাসাত প্রশিক্ষণ সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে জোন কমান্ডার-৫’র (কেএসবি) এমএ কবিরের নেতৃত্বে বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠী ও কাউখালী উপজেলায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। দীর্ঘদিনেও এ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।

নজরুল সরদার ॥ উজিরপুর উপজেলার উত্তর শোলক গ্রামের নজরুল সরদার ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দেশে ফিরে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তিনি বীরত্বের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি জীবনযুদ্ধে হয়েছেন পরাজিত। সনদপত্র থাকা সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। জীবনের শেষ বয়সে এসেও তিনি দিনমজুরের কাজ করে ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়েছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও শুধুমাত্র গেজেটভুক্ত না হওয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের কোন কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারেননি। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় শয্যাশায়ী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মুক্তিযোদ্ধা নজরুল সরদার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছেন।

অজিত মধু ॥ আগৈলঝাড়া উপজেলার পশ্চিম বাগধা গ্রামের অজিত মধু ১৯৭১ সালে বরিশাল পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র অবস্থায় পরিবারের কথা ভুলে দেশ মাতৃকার টানে আগস্ট মাসে একই গ্রামের দেবদাস রায়, লাল মিয়া মোল্লা, সুলতান আহমেদ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আইউব আলী মিয়াসহ ১১জন প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যান। ভারতের হাসনাবাদের টাকি ক্যাম্পের ট্রেনিং সেন্টারে কমান্ডার কবির হোসেনের কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে মল্লিকপুরের ক্যাম্প কমান্ডার ওয়াদুদ তার কেন্দ্রে অজিত মধুসহ ১৩ প্রশিক্ষিত যোদ্ধাকে নিয়ে যান। পরবর্তীতে মল্লিকপুর থেকে তাদের ১৩ জনকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বরিশাল সদরে। বরিশালে এসে ক্যাপ্টেন বেগ ও ক্যাপ্টেন ওমরের নেতৃত্বে প্রতাপপুর থেকে বরিশাল সদরে বর্তমান ওয়াপদা এলাকার সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বিজয় পতাকা নিয়ে ২৫ ডিসেম্বর বাড়ি ফিরে আসেন। সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কর্মকর্তাদের দাবিকৃত মোটা অঙ্কের টাকা দিতে না পারায় রণাঙ্গন কাঁপানো যোদ্ধা অজিত মধুকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বর্তমানে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশার মধ্যে রয়েছেন।

আবুল কাশেম ॥ কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর গ্রামের আবুল কাশেম খান দেশমাতৃকার টানে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরের ভূমিকা পালন করেন। সব কাগজপত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কাছে ধর্ণা দিয়েছিলেন। কমান্ডারদের দাবিকৃত উৎকোচের টাকা দিতে না পারায় তাঁর নাম গেজেটভুক্ত হয়নি। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম খান। পরবর্তীতে তার স্ত্রীও স্বামীর মতো ঘুরে ব্যর্থ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। মুক্তিযোদ্ধা কাশেম খানের অসহায় দুই ছেলে বাবার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনলাইনেও আবেদন করেছেন।

আব্দুল মালেক ফকির ॥ নববধূকে ঘরে রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন গৌরনদী উপজেলার শিংগা গ্রামের হামিজ উদ্দিন ফকিরের ২১ বছর বয়সের টগবগে ছেলে আব্দুল মালেক ফকির। ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ৯নং সেক্টরের বেইজ কমান্ডার বর্তমানে উজিরপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ওয়াদুদ সরদারের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মালেক ফকিরের বিধবা অসহায় স্ত্রী রাহেলা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিয়ের মাত্র চার মাসের মধ্যে স্বামীকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীনের পর আতাউল গণি ওসমানীর সনদ, প্রশিক্ষণ সনদ, যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদের সনদ নিয়ে আমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্ত হতে বিভিন্নস্থানে ধর্ণা দিয়ে নিরাশ হয়েছেন। একপর্যায়ে চার ছেলে ও এক মেয়ে রেখে ১৯৯৯ সালে মালেক ইহলোক ত্যাগ করেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে আমি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে আবেদন করার পর তিনি অনলাইনে আবেদন করার জন্য লিখিত সুপারিশ করেন। সেমতে আবেদন করা সত্বেও আজ পর্যন্ত আমার স্বামীকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

-খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল থেকে