২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধের অজানা কাহিনী


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত ও প্রিয়ভাজন, আগরতলা মামলার ৩নং আসামি, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নিখাদ দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিবের অজানা বহুকথা ইতিহাসের অন্তরালে রয়ে গেছে। কষ্টার্জিত স্বাধীনতার সুবাতাসে তিনি একটি মাসও প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে পারেননি। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁকে সচিবালয়ের সামনে থেকে অজ্ঞাত পরিচয় লোক সাদা রঙের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। যিনি নিজের স্ত্রীর সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে ১৬৫ ছাত্র-যুবককে মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণের জন্য মাদারীপুর থেকে ভারতে নিয়ে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছরেও এই বীর সেনানীকে কেউ মনে রাখেনি এবং মূল্যায়নও করা হয়নি। শুধু তাই নয় কোন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁর পরিবারের খবর নেয়া হয় না।

স্টুয়ার্ড মুজিবের পুরো নাম মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৪০ সালে মাদারীপুর শহর সংলগ্ন রাস্তি ইউনিয়নের লক্ষ্মীগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৌলভী শাহ্ সৈয়দ আবদুল লতিফ ছিলেন কো-অপারেটিভ ব্যাংকের পরিচালক। মায়ের নাম সৈয়দা জহুরুননেছা কাজী। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে স্টুয়ার্ড মুজিব ছিলেন তৃতীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা শেখ লুৎফর রহমান যখন মাদারীপুর আদালতে চাকরি করতেন, তখন তাঁর বাবা সপরিবারে মাদারীপুর শহরের লক্ষ্মীগঞ্জে বসবাস করতেন। প্রতিবেশী হওয়ায় এ দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দিন দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। স্টুয়ার্ড মুজিব চরমুগরিয়া মার্চেন্টস উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে লেখাপড়া করার সময় ১৯৫৪ সালে নেভীতে যোগদান করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে করাচীর মনোরাদ্বীপের হিমালয়াতে লিডিং সিম্যান সুলতান, স্টুয়ার্ড মুজিব ও সিম্যান নূর মুহাম্মদের নেতৃত্বে বাঙালী নাবিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশন নামে সংগঠন গঠিত হয়। যা পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে বিস্তৃতি লাভ করে। ধীরে ধীরে সংগঠনটির কর্মকা- সম্প্রসারিত হয়ে বাঙালীদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের দিকে ধাবিত হয় । ১৯৬৫ সালে স্টুয়ার্ড মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং বিমান, নৌ ও সেনাবাহিনীর বাঙালী সৈনিকদের গোপনে সশস্ত্র বিপ্লবে দীক্ষিত করে তোলেন এবং স্বাধিকার আন্দোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কিন্তু এ গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ১৯৬৮ সালের ১৮ জুন শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ বাঙালীকে আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের এবং তাদের গ্রেফতার করে। মামলাটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত ছিল। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দী অবস্থায় ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে গুলি করে হত্যা করা হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩নং আসামি ছিলেন স্টুয়ার্ড মুজিব। ৪ ও ৫ নং আসামি ছিলেন সিম্যান সুলতান ও নূর মুহাম্মদ। আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ওই বছর শরীয়তপুর জেলার আঙ্গারিয়ার রুদ্রকর গ্রামের হাসমত আলীর মেয়ে সুলতানাকে বিয়ে করেন। বিবাহিত জীবনে তিনি এক ছেলে সন্তানের বাবা। তার ছেলে টিপু সুলতান বর্তমানে মাদারীপুরে বসবাস করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লগ্নে স্টুয়ার্ড মুজিব খুলনায় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। ৪ এপ্রিল খুলনার গল্লামারী রেডিও সেন্টার আক্রমণের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। খুলনার গল্লামারী রেডিও সেন্টার দখল যুদ্ধের পর তিনি মাদারীপুরে চলে আসেন এবং মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আরেক অন্যতম আসামি ক্যাপ্টেন শওকত আলী আগে থেকেই মাদারীপুরে অবস্থান করছিলেন। স্টুয়ার্ড মুজিবের আগমনে মাদারীপুরের ছাত্র-তরুণদের মনে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে আয়োজিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল শুক্রবার সকালে মাদারীপুরের ১৬৫ ছাত্র-যুবককে সঙ্গে নিয়ে স্টুয়ার্ড মুজিব মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। এই দলটি ছিল মাদারীপুর থেকে ভারতে গমনকারী প্রথম দল। ভারতগামী মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার যোগাতে তিনি স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে দেন।

স্টুয়ার্ড মুজিবের বিধবা স্ত্রী সুলতানা বেগম বলেন, একাত্তরের মার্চ মাসে আমি পাঁচ মাসের সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়ায় ছিলাম। সম্ভবত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি একদিন তিনি দেড় শতাধিক ছাত্র-যুবক নিয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে আমাকে গোপনে ডেকে বলেন, আমি এ সমস্ত ছেলেকে নিয়ে ভারতে যাচ্ছি, টাকা পয়সা তোমার কাছে যা আছে দাও, এদের কারও কাছেই তেমন টাকা পয়সা নেই। আমার কাছে তেমন কোন টাকা ছিল না বলে আমি তার হাতে আমার বিয়ের গহনা তুলে দিলাম।

১৭ এপ্রিল স্টুয়ার্ড মুজিব ভারত যাওয়ার প্রাক্কালে ছাত্র-যুবকদের উদ্দেশে বললেন, গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য তোমাদের ভারতে ত্রিপুরায় নিয়ে যাব। এ প্রসঙ্গে নৌকমান্ডো সাজেদুল হক তার ‘মুক্তিযুদ্ধে নৌকমান্ডো, পলাশী কর্ণফুলী ও কলকাতা’ নামে পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন- ‘ক্যাপ্টেন শওকত (পরে কর্নেল, সংসদ সদস্য) সকলের উদ্দেশে বললেন, ‘স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে তোমরা অজ্ঞাত জায়গায় প্রশিক্ষণ নিতে যাবে। পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে তোমাদের দিনরাত কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হবে।’

মাদারীপুরের ভূঁইয়া কোম্পানির লঞ্চ তাদের নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে যাওয়ার জন্য রওনা হলো। লঞ্চ পাকবাহিনীর গানবোটের সামনে পড়ে যেতে পারে। লঞ্চ দুপুর ২ টায় চাঁদপুরের আগে পদ্মার চরে থামিয়ে দিল। জায়গাটার নাম নীলকমল। ১৬৫ যুবক হাঁটতে লাগলো সবার আগে স্টুয়ার্ড মুজিব। নৌকমান্ডো সাজেদুল হক তার পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা রায়পুর হয়ে রাত ১১টায় চৌমুহনী পৌঁছলাম। হাঁটতে হাঁটতে সবাই ক্লান্ত। চৌমুহনীর দোকান ও হোটেল থেকে যে যার মতো খেয়ে নিলাম। ঘুমালাম চৌমুহনী-ফেনী রোডের পাশে চৌমুহনী হাইস্কুলে। পরদিন খুব ভোরে উঠতে হলো, সেদিন ১৯ এপ্রিল। নাশতা সারলাম, তারপর সদর রাস্তা দিয়ে ফেনীর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। তখনও চৌমুহনী-ফেনীতে পাকবাহিনী আসেনি। সারা দিন হাঁটার পর ফেনীর কাছে পাটগাছিয়া হাইস্কুলে আশ্রয় নিলাম। ওই স্কুলের পাশ দিয়ে ছাগলনাইয়া হয়ে বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারে যাওয়ার রাস্তা। রাতে কেউ কেউ খাওয়া দাওয়া করল, অনেকে ক্লান্তির জন্য কিছু খেতে পারল না। রাতে পাটগাছিয়া স্কুলে ঘুমালাম। পরদিন সকালে আশপাশের হোটেল-রেস্তরাঁয় নাশতা করলাম। তখনও ফেনীর লোকজন যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যাওয়ার চিন্তা করেনি। স্টুয়ার্ড মুজিব বর্ডারের খবর নিলেন। তারপর বললেন, বর্ডারে এখন ঝামেলা আছে। দু’-একদিন অপেক্ষা করতে হবে। ২০ ও ২১ এপ্রিল দু’দিন পাটগাছিয়া স্কুলের আশপাশে হোটেল-রেস্তরাঁয় খেতে হলো। ইতোমধ্যে অনেকেরই টাকা ফুরিয়ে গেছে। ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যেতে হবে এরা জানত না। এখানে এসে সবাই জানতে পারল যে, ভারতের ত্রিপুরায় প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছি। ২১ এপ্রিল সন্ধ্যার পর হাবিবুল ও আমাকে নিয়ে স্টুয়ার্ড মুজিব ফেনী শহরে এলেন। পথে আমাদের কিছুই বললেন না। আমরাও কৌতূহল নিয়ে চুপচাপ পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। মনে হলো, তিনি কী যেন ভাবছেন। আমরা কোন প্রশ্ন করলাম না। হঠাৎ তিনি এক সোনার দোকানে ঢুকলেন। তারপর পকেট থেকে স্বর্ণালঙ্কার বের করলেন। এগুলো তার স্ত্রীর গহনা। বাড়ি থেকে আসার সময় নিয়ে এসেছেন। খাবার-দাবার কেনার মতো টাকাও আমাদের ছিলো না। এ কারণেই গহনাগুলো বিক্রি করতে হলো।

২২ এপ্রিল পাটগাছিয়া স্কুলের সামনে সংসদ সদস্য খাজা আহমেদ দেখা করতে এলেন। আমাদের ব্যাপারে সবকিছু জেনে বললেন, হোটেলে তোমাদের খাওযা-দাওয়া করার দরকার নেই। বাড়ি থেকে আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি। ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় হঠাৎ খবর এল হানাদার বাহিনী চট্টগ্রাম থেকে ফেনীতে আসছে। রাতেই ফেনী শহরে ঢুকবে। স্টুয়ার্ড মুজিবের নির্দেশে আমরা ফেনীর পরশুরাম রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। রাত ২টা পর্যন্ত হাঁটলাম। তারপর রেললাইনের পাশে এক মাদ্রাসায় আমরা ঘুমালাম। ভোরে উঠে হাঁটতে শুরু করলাম রেললাইন ধরে। পরদিন সকাল ১০টায় পরশুরাম পৌঁছালাম। বেলা ২টায় স্টুয়ার্ড মুজিব বললেন, আমি তোমাদের আজই ভারতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছি। তিনি বর্ডারের দিকে চলে গেলেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় ফিরে এসে বললেন, তোমরা প্রস্তুত হও। এখনই বর্ডার পার হতে হবে। বর্ডারের এপারের নাম বেলুনিয়া, ওপারের নামও বেলুনিয়া। যখন বর্ডার পার হলাম তখনও সন্ধ্যা হয়নি। ওপারের বেলুনিয়ায় পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এপারের বেলুনিয়া সমতল ভূমি; ভারতের বেলুনিয়া পাহাড়ময়, সমতল ভূমি নেই বললেই চলে। সবাই তরুণ-যুবক। সবাই অবাক চোখে পাহাড় দেখছে। বেলুনিয়া পুরনো জমিদারবাড়ির সামনে আমাদের দাঁড় করানো হলো। বিশাল রাজবাড়ীটি কাঠের তৈরি। আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। স্টুয়ার্ড মুজিব বললেন, তোমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি। ঘণ্টাখানেক পর স্টুয়ার্ড মুজিব আমাদের জন্য কিছু চিড়া-গুড় নিয়ে এলেন। বললেন, তোমরা খেয়ে নাও। সারা রাত আর কোন খাবারের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুটি ট্রাক আসছে তোমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবে।

সবাই চিড়া-গুড় খেয়ে নিলাম। রাত ৮টায় ট্রাক এলো। সবাই ট্রাকে উঠলাম। ট্রাক যখন ছাড়ল সবাই চিৎকার করে উঠলাম। পাহাড়ের উঁচু-নিচু রাস্তা, অন্ধকারের মধ্যে খুব দ্রুতগতিতে ট্রাক চলতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে ধীরে ধীরে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত ২টায় স্টুয়ার্ড মুজিব আমাদের ডেকে তুললেন। চোখ মেলে দেখলাম পাহাড়ের মধ্যে বাজার, কয়েকটি দোকান, দু’-একটি হোটেল আর একটি সিনেমা হল। কেউ কিছু খেতে চাইল না। বমির ভয়ে পানিও না। ঘণ্টাখানেক পর আবার যাত্রা শুরু হলো। ২৭ এপ্রিল সকাল ৬টায় আমরা ত্রিপুরার কাঁঠালিয়া পৌঁছলাম। কাঁঠালিয়া বাজারটি খুব ছোট। বাজারের চারদিকে শুধু পাহাড়। লোকবসতি খুবই কম। পাহাড়ের পাদদেশে অনেক দূরে দূরে ছোট ছোট ঘর। বাজারটি বিএসএফ ক্যাম্পের জন্য।

সবাই বাজারের চায়ের দোকানে সস্তা বিস্কুট ও চা খেয়ে নাশতা সারলাম। স্টুয়ার্ড মুজিব সকাল সাড়ে ৮টায় কাঁঠালিয়া বিএসএফ ক্যাম্পে যোগাযোগ করলেন। আমরা কাঁঠালিয়া বাজারে বিস্কুট, চিড়া, মুড়ি ও চা দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। বিকেল ৪টায় বিএসএফ ক্যাম্পের লোকজন স্টুয়ার্ড মুজিবের কাছ থেকে আমাদের গ্রহণ করলেন।

আমাদের দলে শেষ পর্যন্ত ছিল ১৫৯ জন। আমরাই বোধহয় প্রথম দল, যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে মাদারীপুর থেকে ভারতে এসেছি। কাঁঠালিয়া বিএসএফ ক্যাম্পে কাঠের পাটাতন করা খুবই ছোট তিনটি টিনের ঘর। বিএসএফ সদস্য সংখ্যা ১৫। বলা বাহুল্য, ১৫৯ জনকে এ তিনটি ঘরে রাখা সম্ভব নয়। তখনও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের জন্য হাঁড়ি-পাতিল বা তাঁবুর ব্যবস্থা হয়নি। বাধ্য হয়ে বিএসএফ ক্যাম্পের পেছনে ঝরণার ওপর উঁচু পাহাড়ের ওপর খোলা আকাশের নিচে গাছতলায় আশ্রয় নিতে হলো। সন্ধ্যার পর স্টুয়ার্ড মুজিব আমাদের উদ্দেশ্যে ছোট ভাষণ দিয়ে বললেন, তোমরা ভালভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করো। কঠোর প্রশিক্ষণ মানে সহজ যুদ্ধ। তোমরা কষ্ট করে প্রশিক্ষণ শেষ কর। আমিই আবার তোমাদের মাদারীপুরে নিয়ে যাব। বিএসএফ সদস্যদের বললেন, এরা সবাই ছাত্র। এদের দেখেশুনে রাখবেন। রাত ৮টায় স্টুয়ার্ড মুজিব বিদায় নিলেন। তার বিদায়ের সময় করুণ দৃশ্যের অবতারণা হলো।

-সুবল বিশ্বাস, মাদারীপুর থেকে