১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বুলেট ট্রেন সার্ভিস- পৌঁছবে দু’ ঘণ্টার মধ্যে

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬
  • গতি হবে ঘণ্টায় ২শ’ কিমি

আনোয়ার রোজেন ॥ সময় এবং দূরত্ব কমাতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলরুট ঢাকা-চট্টগ্রামে চালু হবে হাইস্পীড বুলেট ট্রেন। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতির এ ট্রেনে চড়ে দুই ঘণ্টারও কম সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করা যাবে। এজন্য বিদ্যমান রুট সংস্কার করে নির্মাণ করা হবে দ্রতগতির রেলপথ। এর ফলে বর্তমান ৩২০ কিলোমিটারের দূরত্ব কমে যাবে অন্তত ৯০ কিলোমিটার। রেলপথের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ১০৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে। দুই বছর মেয়াদে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে (সরকারের নিজস্ব তহবিল) বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম ভায়া কুমিল্লা/লাকসাম দ্রুত গতির রেলপথ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইন’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রকল্পের ওপর গত ৮ জুন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প যাচাই কমিটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন এতে সভাপতিত্ব করেন। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে সেকশন বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এ করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২০ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার। বর্তমানে ঢাকা থেকে ট্রেন বৃত্তাকার পথে টঙ্গী-ভৈরববাজার-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা হয়ে চট্টগ্রামে পেূৗছে। এতে ভ্রমণে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়, ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে। প্রস্তাবিত দ্রুতগতির রেলপথটি যাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মধ্য দিয়ে। এই পথে ঢাকা থেকে কুমিল্লা/লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পীড ট্রেন লাইন নির্মাণ করা হলে সেকশনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে। একই সঙ্গে ভ্রমণ সময়ও কমবে প্রায় দুই ঘণ্টা। এতে যাত্রীদের সময় বাঁচার পাশাপাশি রেলের পরিচালন ব্যয়ও (অপারেটিং কস্ট) কমবে। একইভাবে কমবে পরিবহন ব্যয়ও। সভায় বলা হয়, ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাই স্পীড ট্রেন (বুলেট ট্রেন) চালুর উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিবেচ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পটি গ্রহণের প্রস্তাব করে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, যাত্রী পরিবহন ও বাণিজ্যিক পরিবহন উভয়ক্ষেত্রেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলরুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক কানেকটিভিটি স্থাপিত হলে ভবিষ্যতে এই রুটটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই পথে সময় ও দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মূল রেললাইন নির্মাণে চীনের সঙ্গে জি টু জি ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এজন্য সমীক্ষা প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের পাশাপাশি মন্ত্রিসভারও অনুমোদন লাগবে। যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও রেলপথের বিশদ ডিজাইনের কাজ শুরু করা যাবে।

সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের প্রধান প্রধান আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয় এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়তে থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের ‘অর্থনৈতিক গুরুত্বও’ দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া সরকার চট্টগ্রামের মাতারবাড়িতে ‘পাওয়ার হাব’ (বড় বিদ্যুত কেন্দ্র) এবং সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের গুরুত্ব আরও বাড়াবে। এই করিডরে ভ্রমণ সময় কমিয়ে আনা গেলে তা বিদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য কার্যক্রম বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দ্রুতগতির রেলওয়ে সার্ভিস চালু হলে এই করিডরে দুই ঘণ্টার চেয়ে কম সময়ে যাতায়াত করা যাবে। এই সার্ভিস ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলরুটকে করে তুলবে আরও বেশি আকর্ষণীয়। এসব কারণে রেলওয়ের বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলরুটের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দি, মোহনপুর, ময়নামতি, লাকসাম, ফেনী, চিনকি আস্তানা, সীতাকু- হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এ রেলপথ হতে পারে। দ্রুতগতির এই প্রস্তাবিত রেললাইনে ট্রেন চালানো যাবে ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে, যা বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার রূপান্তরে বড় ধরনের প্রভাব রাখবে। যাত্রী ও মাল পরিবহনের পাশাপাশি এই প্রকল্প রেলওয়ের আর্থিক পারফর্মেন্স বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে বলা প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে।

প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের আর্থ-সামাজিক, কারিগরি ও পরিবেশগত বাস্তবতায় এই পথে দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা নিরূপণ করবে, যাতে পরবর্তীতে বিনিয়োগ প্রকল্প হাতে নেয়া যায়। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অবকাঠামোর বিশদ ডিজাইন প্রণয়ন, দরপত্র দলিলাদি প্রস্তুতকরণ, নতুন রেললাইন পরিচালন প্রক্রিয়া নির্ধারণ, প্রাথমিক পরিবেশ পরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বসান পরিকল্পনা তৈরি ইত্যাদি কার্যক্রম রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, আগামী ২০ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে এ প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১২ জোড়া ট্রেনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করা যায়।

আগামী ১০ বছরে এ রুটে যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭৯ লাখ। তখন এসব যাত্রী পরিবহনে কমপক্ষে ২৮ জোড়া ট্রেন চালাতে হবে। আর ২০ বছর পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী চলাচল করবেন। এসব যাত্রী পরিবহনে তখন দৈনিক ৪২ জোড়া ট্রেন চালানোর প্রয়োজন হবে। বিদ্যমান রেলপথ ও ট্রেন দিয়ে এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য হাই স্পীড ট্রেন চালু করা জরুরী। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি এ পথে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করাও সম্ভব হবে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সফলভাবে হাইস্পীড ট্রেন চালু করতে পারলে এটিকে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার সুযোগ থাকবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে হাইস্পীড ট্রেন চললে সম্ভাব্য যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়বে। এতে পর্যটকরা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছতে পারবে। এতে রেল কর্তৃপক্ষ ও পর্যটন খাত দ্রুত লাভবান হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

২১/০৯/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: