২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তির হার শতভাগ


বিকাশ দত্ত ॥ দেশের উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে মামলার পাহাড় থাকলেও শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তির হার শতভাগ। গত তিন বছর ধরে শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালে মামলার জট নেই। যে কোন মামলা দুই মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। ২০১৩ সালের ২৯ মে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি মোঃ শামছুল হুদা যোগদান করেন। যোগদান করার পরপরই তিনি ট্রাইব্যুনালকে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নেন। ট্রাইব্যুনালের আসবাবপত্র, বইপুস্তক, কম্পিউটার, ওয়েবসাইডসহ অন্য বিষয়গুলোর ওপরও গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি তার উদ্যোগেই ২৫/২৬ পুরানা পল্টন লেন থেকে জরাজীর্ণ শতবর্ষের পুরাতন ভবন থেকে ৪ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম রোডে অফিস স্থানান্তর করা হয়। এখন তিনি একটি স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ শামছুল হুদা জনকণ্ঠকে বলেন তিনি আর একটু সময় পেলেই তিনি ট্রাইব্যুনালের জন্য স্থায়ী ভবন করে যাবেন। তিনি আরও বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয় তার উদ্যোগ গ্রহণ করি। একটি মামলা ফাইল হওয়ার পর দুই মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করা হয়। তাই শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালে মামলার নিষ্পত্তির হার শতভাগ। চেয়ারম্যান আরও বলেন, শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপীল করা যায় না, অথচ প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। সমপর্যায়ের দুটি ট্রাইব্যুনালে দুই ধরনের আইন থাকায় বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপীল বিভাগে আপীল না করার ফলে শ্রমিকদের ন্যায় পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর তা সরাসরি আপীল বিভাগে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল জনকণ্ঠকে বলেছেন, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বিচারপতি মোঃ সামছুল হুদার নেতৃত্বে শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনাল প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তার সময়েই ট্রাইব্যুনাল জরাজীর্ণ ভবন থেকে ৪ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম রোডে অফিস স্থানান্তর করা হয়েছে। আমরা মামলা করতে গেলে রেফারেন্স হিসেবে এখন বই পাচ্ছি। কজলিস্ট ওয়েবসাইটে দেয়া হচ্ছে। আগে যা হতো না। শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ সামছুল হুদা। এখন তিনি স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি মনে করি অচিরেই তিনি শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনালের জন্য স্থায়ী জায়গার বন্দোবস্ত করবেন।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের আপীল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত। সেখানকার কোন আদেশ বিরুদ্ধে কেউ আপীল করতে হলে তা হাইকোর্ট বিভাগে করতে হয়। এতে করে শ্রম ট্রাইব্যুনলের চেয়ারম্যান মর্যাদারও ক্ষুণœ হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া শ্রমিক কোন আর্থিক রোয়েদাদ প্রাপ্ত হলে মালিক পক্ষ ইচ্ছাপূর্বকভাবে শ্রমিককে তার ন্যায় পাওনা থেকে বঞ্চিত করার জন্য সংবিধানের ১০২ ধারা মতে হাইকোর্ট বিভাগে রীট করে স্থগিত আদেশ নিয়ে বছরের পর বছর শ্রমিককে ঘুরাতে পারে। তাই প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালের এ্যাক্টের সেকশন (৬এ) এর অনুরূপ ২১৭(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন করে এই অসঙ্গতি দূর করা সম্ভব।

শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনালসহ আরও ৭টি শ্রম আদালতে মে মাসে মোট মামলা দায়ের হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৫টি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৯৪টি। শ্রম আপীলেট ট্রাইব্যুনালে এ সময় মামলা দায়ের হয়েছে ৫২৩টি। বর্তমানে নিষ্পত্তির জন্য আছে ২৯৩টি। এর মধ্যে বেশকিছু মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা প্রথম শ্রম আদালতে মে মাসে মামলা দায়ের করা হয় ৩ হাজার ৭৪৯টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২১৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ঢাকা ২য় শ্রম আদালত মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৮৯২টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৪৮টি। তৃতীয় শ্রম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ৪ হাজার ৫১৩টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৬২টি। চট্টগ্রাম ১ম শ্রম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ৯৩৯টি এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৮টি। চট্টগ্রাম দ্বিতীয় শ্রম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ৫৪৫টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২টি। খুলনা বিভাগীয় শ্রম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ৫৩৮টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৬টি। রাজশাহী বিভাগীয় শ্রম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ৪৩৭টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৮টি।

সূত্র মতে জানা গেছে, শ্রম আদালতগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই উদ্দেশ্যে যেন শ্রমিকদের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং শ্রম আদালতগুলোর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শ্রম আইন ২০০৬ প্রণীত হওয়ার পর থেকে ট্রাইব্যুনালে আপীল বিভাগের বিচারপতিদেরই নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। শ্রম আইন ২০০৬-এর ২১৭ ধারা মোতাবেক শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল রায় চূড়ান্ত করে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায়ের বিরুদ্ধে প্রায় মামলায়ই হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট দায়ের করা হয়। প্রতিক্ষেত্রেই রুল নিশি জারির সময় ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেন। শ্রম আইনে উল্লেখ আছে, ২ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবে। আবার শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন আপীলের আদেশে দেখা যায় যে, মামলা এ্যাডমিট করার পর সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। দেখা যায়, শ্রম আদালত এবং আপীল ট্রাইব্যুনালের দ্রুত নিষ্পত্তির ফল শ্রমিকরা ভোগ করতে পারে না। কারণ হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ দেয়ার পর শ্রমিকরা মামলা আর চালায় না। মালিকের সঙ্গে শ্রমিকরা আপোস করে ফেলে। দেখা যায়, প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালের সমপর্যায়ে শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল। প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনাল সরাসরি উচ্চ আদালতে লিভ টু আপীল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা যায়। এ বিষয়ে আপীল ট্রাইব্যুনালে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের আইনের ন্যায় একটি ধারা সংশোধনের জন্য বার বার পত্র দেয়ার পরও এই ধারাটি সংযোজিত হয়নি। যদিও চিঠি দেয়ার পর শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শ্রম আইন সংশোধন বা পরিবর্তন এবং বিধি প্রণয়নের সময় শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের কোন মতামত নেয়া হয় না। যদিও শ্রম আইনের ভুলত্রুটি এবং প্রয়োগ একমাত্র চেয়ারম্যানের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তিনি আইনের ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনালে প্রদান করেন। যার স্বার্থেই বার বার আইন সংশোধন করা হোক না কেন, শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘরেব জন্য প্রয়োজনীয় দু-একটি সংশোধন হয় না।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: