২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গুলশান ট্র্যাজেডি ॥ শোকই হোক শক্তি


গুলশান ট্র্যাজেডি ॥ শোকই হোক শক্তি

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ ধর্ম রক্ষার জন্য ইসলাম জিহাদ অনুমোদন করে। কিন্তু সন্ত্রাস কোনভাবেই অনুমোদন করে না। শুধু অনুমোদন করে না তাই নয়, সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িতরা দোজখের বাসিন্দা হবে নিশ্চিতভাবে। এ কথা ইসলাম ধর্মে বর্ণিত রয়েছে। অথচ ইসলামের নামে অনৈসলামিক কর্মকা-ে জড়িতরা এখন বিশ্বব্যাপী ইসলামী জঙ্গী নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ জঙ্গীরা বিভিন্ন জঙ্গী গ্রুপের নামে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে, যার মধ্যে প্রথম ছিল তালেবান। পরে আল কায়েদা এবং আরও পরে আইএস নামে জঙ্গীপনার নানা ধরন ও রূপ বিশ্বজুড়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে জঙ্গীদের হিংস্র ছোবল হানার ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত বা ইসলামী দেশগুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। অর্থাৎ জঙ্গীরা রক্তের হোলিখেলা খেলছেই। সর্বশেষ বাংলাদেশে গত শুক্রবার পাঁচ জঙ্গী গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি নামে স্প্যানিশ রেস্তরাঁয় অতিথিদের জিম্মি করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের গুলি ও গলা কেটে নির্মম কায়দায় হত্যার মাধ্যমে জঙ্গীপনা কর্মকা-ের যে তথ্য জানান দিয়েছে তা শুধু বাংলাদেশ নয়, জঙ্গীবিরোধী শক্তিশালী দেশগুলোকেও ভাবিয়ে তুলেছে। শোকের এ ঘটনা শক্তিতে পরিণত করার পথই বেছে নিতে হবে।

গুলশান ট্র্যাজেডির ঘটনায় জঙ্গীসহ ২৮ জন দেশী-বিদেশী প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্ব মিডিয়া এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিচার-বিশ্লেষণ করে পৃথিবীজুড়ে জানান দিয়েছে গুলশান ট্র্যাজেডির ভিডিওচিত্র প্রকাশ করে। গুলশান ট্র্যাজেডির একদিন আগেও এ দেশের মানুষ ভাবতে পারেনি ইংরেজী মিডিয়ামে পড়ুয়া শিক্ষার্থী বা অভিজাত পরিবারের সন্তানরা জঙ্গীপনায় জড়িয়ে গেছে। এখন গোয়েন্দাদের ভাবার বিষয় এ জাতীয় শিক্ষার্থী ও অভিজাত পরিবারের কী পরিমাণ সদস্য জঙ্গীপনায় জড়িয়ে গেছে। এতদিন সকলের ভাবনায় ছিল সাধারণত অভাব-অনটনে থাকা মাদ্রাসাছাত্র ও ইসলামিক সমর্থকরা জঙ্গীপনায় জড়িত। পরকালে বেহেশত লাভের মগজধোলাইয়ের পাশাপাশি নগদ অর্থ দিয়ে এদের সন্ত্রাসী যে কোন কাজে ব্যবহার করে আসা হচ্ছে। কিন্তু গুলশান ট্র্যাজেডির পর যে ভয়াবহ মেসেজ এসেছে তা আর লুকোছাপার অপেক্ষা রাখে না। ধনীর দুলালরা কেন এমন সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে রীতিমতো সুইসাইডাল স্কোয়াডে যোগ দিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না তা রীতিমতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের কর্মকা- নিজ নিজ তত্ত্বাবধানে রেখে মনিটরিং করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তাদের সন্তানরা কোনভাবেই জঙ্গীপনা বা সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হতে না পারে। কিন্তু আদৌ অভিভাবকদের পক্ষে এ ধরনের কর্মতৎপরতা চালানো কি সম্ভব? সে প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রমতে, জঙ্গীপনায় জড়িত সংগঠনগুলোর কাছে বিদেশী অর্থ আসার পাইপলাইন বন্ধ করা না গেলে এ দেশে ক্রমাগতভাবে জঙ্গীপনায় জড়িত হওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং বিভিন্ন নামে জঙ্গী সংগঠনগুলোর তৎপরতা চলতে থাকবে। এ কারণে সর্বাগ্রে প্রয়োজন গোয়েন্দা তৎপরতা। বিশেষ করে জঙ্গী ও জঙ্গী তৎপরতা দমনে স্পেশালাইজড সংস্থা গড়ে তোলা ও এ ধরনের সংস্থার সদস্যদের সর্বাধুনিক অস্ত্রের এবং এর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ট্রেনিং দিয়ে চৌকস করে তোলা। পুলিশের তথ্যমতে, দেশে উচ্চপর্যায় থেকে সাধারণ ভিআইপিদের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশের বড় একটি অংশ তাদের সঙ্গে, বাসভবনে এবং অফিসে নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কেপিআইয়ের (কী পয়েন্ট ইনস্টটেলেশন) পাশাপাশি ছোট-বড় মার্কেট এবং সরকারী আরও বড় বড় প্রতিষ্ঠাননের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করা কঠিন হয়ে আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে কার্যকর হতে শুরু করেছে। কিন্তু এদের জন্য এখন প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ট্রেনিং।

সূত্র জানায়, দেশে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, শহীদ হামজা ব্রিগেডসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন শিকড় গেড়েছে। এসব সংগঠনের বহু নেতাকর্মী ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে। আবিষ্কার হয়েছে এদের বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির আস্তানা। উদ্ধার হয়েছে অসংখ্য অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, এ ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসার আসল রুটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে দুই প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারত থেকে সীমান্তপথে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে চলে আসে। এসব সন্ত্রাসী গ্রুপ থেকে জঙ্গীপনায় জড়িতরা অস্ত্র সংগ্রহ করে নেয়। এ ধরনের অস্ত্র সংগ্রহের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। জঙ্গীপনায় জড়িতরা এ অস্ত্র কেনার অর্থ পেয়ে যাচ্ছে বিদেশ থেকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে এরা মাদ্রাসার নামে, ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে এবং ইসলামী বিভিন্ন কার্যক্রমের বিপরীতে অর্থ পেয়ে থাকে। এ ধরনের ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মাদ্রাসা রয়েছে, যাদের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ আসে বিদেশ থেকে। আরব দেশগুলোর ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাদের যাকাত-ফিতরার অর্থের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ইসলামী ব্যানারে সংগঠন ও দলগুলোর জন্য প্রদান করে থাকে। আর এসব অর্থ পেয়ে এরা অপরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

সূত্র জানায়, রগ কাটা রাজনীতির মাধ্যমে জামায়াত-শিবির এ দেশে তাদের অপতৎপরতার জানান দিয়েছে বহু আগে। সে থেকেই তাদের এ অপতৎপরতা এত বেশি বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, যা এখন প্রশাসনসহ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। বর্তমান সরকার জামায়াত-শিবিরের অপতৎপরতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর এদের বড় একটি অংশ এখন জঙ্গী সংগঠনগুলোতে যোগ দিচ্ছে এবং অস্ত্র তুলে নিয়ে জিহাদের নামে অনৈসলামিক অর্থাৎ সহিংস সন্ত্রাসের পথে নেমে পড়েছে। ইতোমধ্যে যেসব জঙ্গী সংগঠনের নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে এদের বড় একটি অংশ শুরুতে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সঙ্গত কারণে এ দেশে জঙ্গীপনার শিকড় বহু আগেই প্রোথিত হয়েছে। পরবর্তীতে তা ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। বর্তমানে এদেরই সদস্যরা ওই সব জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শুরু করেছে টার্গেট কিলিং। এ টার্গেট কিলিংয়ের মূলে আসল রহস্য রয়েছে বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা, মন্দিরের পুরোহিত-সেবায়েত, ভিক্ষু এবং খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী সদস্যদের টার্গেট করে হত্যা করার বিষয়টি জানান দিচ্ছে কেন তারা এ ধরনের টার্গেট কিলিং শুরু করেছে।

সূত্রমতে, এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। এদের নির্মূলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে। আর নয় টার্গেট কিলিং, আর নয় বিদেশী হত্যা, আর নয় জঙ্গীপনার উন্মাদনাÑ এমন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগিয়ে গেলে এবং শান্তিপ্রিয় মানুষের সহযোগিতা নিয়ে এদের নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এরা থমকে যেতে বাধ্য হবে।

সূত্রমতে, দিন দিন এদের শিকড় এতই গভীরে চলে গেছে যে, এখন বোঝা যাচ্ছে উচ্চবিত্তের সন্তানরাও এ পথে পা দিয়েছে। সহজ-সরল যুবকদের মগজধোলাই করে এদের আত্মঘাতী কর্মকা-ে লিপ্ত করানো হচ্ছে, যার প্রমাণ গুলশান ট্র্যাজেডি। এ ট্র্যাজেডির নেপথ্যের নায়করা সকলেই বাংলাদেশী যুবক। সেনা নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযানে এরা সকলেই প্রাণ হারিয়েছে। এরপর কী পেল তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা। আগামীতে এরা জঙ্গী সদস্যের অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এদের মুখ দেখানোও কোন কোন ক্ষেত্রে লজ্জাকর হয়ে যেতে পারে। কারণ শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ জঙ্গীপনাসহ সব ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতাকে প্রচ-ভাবে ঘৃণা করে। বাংলাদেশ বর্তমান সময়ে উন্নয়নের পথে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বিদেশীরা যেভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার যেভাবে বেড়ে চলেছে ঠিক সে সময়ে গুলশান ট্র্যাজেডি সরকারের সমস্ত উন্নয়ন তৎপরতায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বিদেশীরা কেউ বলেনি এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু বলেছে, তারা কষ্ট পেয়েছে। শুধু বিদেশীরা কেন, গুলশান ট্র্যাজেডির ঘটনায় পুরো জাতি কষ্ট পেয়েছে। যে কারণে দু’দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন, নিহতদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে সকল ধর্মাবলম্বী আবহমান কাল থেকে এক কাতারে বসবাস করছে এবং সুখ-দুঃখে, বিপদ-আপদে সমব্যথী হচ্ছে। অথচ জঙ্গীপনায় জড়িতরা এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর অস্ত্র ও চাপাতি হামলা চালিয়ে খুন করার মাধ্যমে যা জানান দিতে চাচ্ছে তা সঠিক নয়। গুলশান ট্র্যাজেডির ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা এ দেশে এই প্রথম। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা নতুন করে জন্ম দিতে পারে বলেও অনেকে ইতোমধ্যে মতপ্রকাশ করেছেন। সঙ্গত কারণে সরকারপক্ষে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে জঙ্গী নির্মূলে যা কিছু করা প্রয়োজন সবই গ্রহণ করতে হবে। এর অন্যথা হলে এ দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হয়ে দিনরাত রক্ত ঝরতে থাকলে আশ্চর্যের কিছুই থাকবে না।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: