২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গুলশানে নিহত জঙ্গী বাঁধনই বগুড়ার পায়েল


সমুদ্র হক/মাহমুদুল আলম নয়ন, বগুড়া অফিস ॥ ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলাকারী শনাক্ত বগুড়ার খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল ওরফে বাঁধনের (২০) হাতে যে অস্ত্রের ছবি ইন্টারনেটে দেয়া হয়েছে একই ধরনের অস্ত্র (একে পয়েন্ট ২২) বগুড়ার শাজাহানপুর থেকে উদ্ধার করা হয় মাস চারেক আগে। তখন জঙ্গী মামুনকে আটক করার পর তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই আধুনিক অস্ত্র উদ্ধার হয়। গুলশানের জঙ্গী হামলার পর একই ধরনের অস্ত্রের ছবি প্রচার হওয়ার পর ধারণা করা যায় বগুড়ার শাজাহানপুর থেকে শেরপুর পর্যন্ত জঙ্গীদের একাধিক আস্তানা থাকতে পারে।

এর কারণ এ বছর ৩ এপ্রিল রাতে শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামের একটি বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে দুই জঙ্গী নিহত হওয়ার পর সেই বাড়ি থেকে গ্রেনেড, বোমা বানানোর বিপুল সরঞ্জাম, রাসায়নিক অস্ত্র জেল আধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত জঙ্গীদ্বয় রাসেলের বাড়ি ময়মনসিংহ ও তারেকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। রাসেলকে শনাক্ত করা হয় ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর। পদার্থবিদ্যার মেধাবী শিক্ষার্থী রাসেল চট্টগ্রামের আলোচিত কয়েকটি হত্যাকা- এবং হাটহাজারিতে বিপুল অস্ত্র মজুদের সঙ্গে জড়িত। এই রাসেলের শ্বশুরবাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুরে। তার স্ত্রী জেএমবির সদস্য। পুলিশ তাকেও আটক করেছে।

বগুড়ার শেরপুরের বোমা বিস্ফারণের আগে গত বছর নবেম্বর শেষে জঙ্গীরা শিবগঞ্জের চককানু হরিপুর গ্রামে শিয়া সম্প্রদায়ের আল মোস্তফা জামে মসজিদে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এক মুসল্লিকে হত্যা করে। বগুড়ার এতসব ঘটনার কোন কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় অস্ত্রধারী জঙ্গীরা যে হামলা করল তার মধ্যে নিহত হয়েছে পায়েল নামে বগুড়ার এক জঙ্গী। এ থেকে একটি বিষয় আঁচ করা যায় বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গীরা নানা ছদ্মাবরণে অবস্থান নিয়েছে। যার সন্ধান করতে পারছে না বগুড়া পুলিশ। উল্লেখ্য, শেরপুরের গ্রামে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে হতাহতের পর পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে। এর আগে পুলিশ কিছুই টের পায়নি। ওই বাড়িতে সিএনজি অটোরিকশা চালকের পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিল মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। পুলিশ আজও তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

গুলশানের জঙ্গী হামলায় অংশ নেয়া খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধনের বাড়ি শাজাহনপুর উপজেলার বৃকুষ্টিয়া গ্রামে। তার বাবা আবুল হোসেন দিনমজুর। মা পিয়ারা বেগম গৃহিণী। তারা তিন ভাই বোন। এক বোন মালয়েশিয়া থাকে। আরেক বোন গৃহপরিচারিকা। একমাত্র ভাইয়ের বর্তমান পরিচয় নিহত জঙ্গী বাঁধন ওরফে পায়েল। গ্রামের বাড়ি টিনের। ঘরের টিনে আরবী ভাষায় অনেক কিছু লেখা। খায়রুল মিহিগ্রাম আলিম মাদ্রাসা থেকে আলিম (স্নাতক) পাসের পর বছর দেড়েক আগে ঢাকায় পড়তে যায়। এরপর তার খোঁজ পাওয়া যায় না। গ্রামের লোক ও তার বাবা-মা জানালেন মাস সাতেক আগে খায়রুল দামী মোটরসাইকেলে চেপে এক বন্ধুকে নিয়ে মাঝে একবার বাড়িতে আসে। তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। গরিব দিনমজুর ঘরের ছেলে এত দামী মোটরসাইকেল কোথায় পেল এ নিয়ে গ্রামের মানুষের কৌতূহল ছিল। তবে কিছু বলতে পারেনি। কিছুক্ষণ থেকে সে চলে যায়। তারপর সে আর আসেনি। গ্রামে থাকাকালীন সে জেহাদী বই পড়ত। তার এক হাতের বৃদ্ধাঙুলি জোড়া অর্থাৎ ছয়টি আঙুল। ইন্টারনেটে যে ছবি রিলিজ করা হয়েছে সেখানেও দেখা যায় যে হাতে একে পয়েন্ট ২২ অস্ত্র সেই হাতে জোড়া আঙুল। পুলিশও এই জোড়া আঙুল দেখে আইডেন্টিফাই করে বাবা-মাকে ডেকে এনে শনাক্ত করে। স্থানীয়রা জানায়, গুলশানে রাতে ঘটনার পরদিন ওই বাড়িতে কান্নার রোল শুনে তারা জানতে চায় কি হয়েছে। ওই সময় বাবা-মা কিছু না বলেনি। পরে জাানাজানি হয় জঙ্গী হামলার ঘটনায় তাদের গ্রামের ছেলে জড়িত। গ্রামবাসীদের ক’জন জানায়, এই ঘটনায় তারা যারপরনাই লজ্জিত ও বিস্মিত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়ার শাজাহানপুর থেকে শেরপুর উপজেলা পর্যন্ত বিরাট এলাকায় জেএমবি যে ঘাঁটি গেড়েছে তার আঁচ নানাভাবে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে শাজাহানপুর থেকে আধুনিক অস্ত্র উদ্ধার শেরপুরে বোমা বানাবার সময় বিস্ফোরণে হতাহত এবং বিপুল রাায়নিক ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে এই এলাকায় জঙ্গীদের অবস্থান। বছর দুয়েক আগে বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়ার এক বাড়িতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মাঝারি পাল্লার অস্ত্র উদ্ধার করে, জঙ্গীরা পালিয়ে যায়। দিন কয়েক আগে পুলিশ সারাদেশে অভিযান চালিয়ে জঙ্গী গ্রেফতার করেছে। বগুড়ার পুলিশের জনসংযোগ সেল প্রতিদিন কতজন জঙ্গী গ্রেফতার হলো তার বর্ণনা দিয়ে মিডিয়াকে মেসেজ পাঠিয়েছে। তারপরও জানা গেল শাজাহানপুরের জঙ্গী ঢাকার গুলশানে বিদেশী হোটেলে হামলা চালিয়েছে। বগুড়ার জঙ্গী খায়রুলের পরিচিতি সম্পর্কে পুলিশ প্রথমে সরাসরি কিছু জানায়নি। একটা রাখঢাক অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে। জঙ্গী খায়রুলের বাবা মাকে আটক করা হয়েছে কি না এই প্রসঙ্গে পুলিশ সরাসরি কিছু বলেনি। বলেছে, ছেলে শনাক্তসহ জিজ্ঞাসাবাদ ও কিছু প্রসিডিওর মেনেটেইন করার জন্য রাখা হয়েছে। সময়মতো ছেড়ে দেয়া হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: