মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জঙ্গী হামলায় ৭ নাগরিকের মৃত্যুতে জাপানী প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৬

বিডিনিউজ ॥ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাজে গিয়ে জঙ্গী হামলার শিকার হয়ে সাত নাগরিকের মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অংশীদার দেশটির প্রধানমন্ত্রী রবিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ঢাকায় এই সন্ত্রাসী হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং এটা ‘আমায় ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে’। গত শুক্রবার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলায় যে ১৭ জন বিদেশী নিহত হন, তার মধ্যে সাতজন জাপানী, যারা ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের সমীক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন।

বিবৃতিতে আবে বলেন, ঢাকায় যে সাতজন নিহত হয়েছেন তারা সবাই সেখানে গিয়েছিলেন বাংলাদেশেরই কল্যাণের জন্য। গত বছর এক জাপানী বাংলাদেশে সংস্থা। গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের আইজি। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশপ্রধান (আইজি) একেএম শহীদুল হক বলেছেন, গুলশানের ঘটনায় সন্দেহভাজন দুইজনকে আটক করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ঘটনায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন। সোমবার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শোকসভার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেছেন পুলিশপ্রধান। রাজারবাগে পুলিশের শোকসভায় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান, র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ, অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান ও জাভেদ পাটোয়ারী শোকসভায় উপস্থিত ছিলেন।

মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, আমাদের পুরো বাহিনীর আগামীতে কী ধরনের প্রস্তুতি থাকতে হবে, কী কী করতে হবে, তা আজই ঠিক করতে হবে। দেরি করা যাবে না। এভাবে আমরা আর সহকর্মী হারাতে চাই না। জঙ্গী হামলায় নিহত ডিএমপির সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি মোঃ সালাহউদ্দিন খানের স্মরণে আয়োজিত শোকসভায় সোমবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে এ কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার। ডিএমপি কমিশনার বলেন, আটকদের একজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে তার পরিচয় স্পষ্ট করেননি তিনি।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আর হামলাকারীদের মধ্যে ছয়জন নিহত হয়েছে, আটক করা গেছে একজনকে। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি। চিকিৎসা শেষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে। জিম্মি সঙ্কটের মধ্যেই শনিবার ভোরের আগে হলি আর্টিজান বেকারিতে পেছন থেকে আনুমানিক ২০ বছর বয়সী এক তরুণকে ‘সন্দেহজনক আচরণের কারণে’ রক্তাক্ত অবস্থায় আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তার পরিচয় কী, তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে কি-না, সে তথ্যও পুলিশ প্রকাশ করেনি। শনিবার সকালে অভিযান শেষে ওই ক্যাফে থেকে উদ্ধার জিম্মিসহ অন্তত ২৭ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে। পরে তাদের বক্তব্য শুনে যাচাইবাছাই করে অনেককে ছেড়ে দেয়া হয়।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা জানান, জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার হওয়া ১৩ জনের মধ্যে অন্তত দুইজন এখনও পুলিশ হেফাজতে আছেন। তারা হচ্ছেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম ও তাহমিদ হাসিব খানÑ এই দুইজন। তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে কিনাÑ সে বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়নি। তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। এই দুইজনই ওই বেকারিতে বারো ঘণ্টা ধরে জিম্মি থাকার পর তাদের মুক্তি দেয় জঙ্গীরা। তাদের অতীত বিষয় নিয়ে অনেকে সন্দেহ থাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শাহরিয়ার খান নামের এক ব্যবসায়ীর ছেলে তাহমিদ (২২)। কানাডা থেকে দেশে ফিরে শুক্রবার ইফতার শেষে বন্ধুদের সঙ্গে হলি আর্টিজান বেকারিতে গিয়েছিলেন তিনি।

হাসনাত করিমের বাসায় অভিযান ॥ গুলশান-২ নম্বরের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে যৌথ অভিযানে জীবিত উদ্ধার হওয়া জিম্মি হাসনাত করিমের বাসায় অভিযান চালিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রবিবার মধ্যরাতে হাসনাত করিমের বনানীর বাসায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিবির একজন এডিসির নেতৃত্বে রবিবার মধ্যরাতে হাসনাত করিমের বাসায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় ওই বাসা থেকে হাসনাত করিমের ব্যবহৃত ল্যাপটপসহ বেশকিছু মালপত্র জব্দ করা হয়।

জিম্মি অবস্থায় ওই রেস্টুরেন্টের পাশের একটি ভবন থেকে ডিকে হোয়াং নামের দক্ষিণ কোরীয় এক নাগরিকের করা মোবাইল ভিডিওফুটেজে হাসনাত করিম বেকারির বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেÑ যা ওই জিম্মির সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়াও জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বেকারির মাঠ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ভিডিওফুটেজ ছাড়া হয়েছে।

ভিডিওফুটেজে দেখা যায়, ন্যাড়া মাথার চেক গেঞ্জি ও জিন্স পরা এক ব্যক্তি একাধিক স্থানে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করার মতো সন্দেহজনক আচরণ করছে। হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের কাচের তৈরি মূল ফটকটিতে তাকে বেশ কয়েকবার এসে ঘুরে যেতে দেখা যায়। দুই অস্ত্রধারীর সঙ্গে ছাদেও দেখা গেছে তাকে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে একদল অস্ত্রধারী ঢুকে বিদেশীসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করে। সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ওই রেস্টুরেন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয় নিরাপত্তাবাহিনী।

এ সময় ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধারের পাশাপাশি এই ২০ জনের মৃতদেহ এবং ৬ জঙ্গীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

ন্যাড়া মাথার সেই লোকটিই ॥ রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্টুরেন্টের হামলার ঘটনায় জিম্মিদের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হয়ে আসা সন্দেহজনক ন্যাড়া মাথার লোকটিই হচ্ছেন হাসনাত করিম। তিনি বেসরকারী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তবে হাসনাত করিম হোটেলে আটকেপড়া জিম্মি, নাকি হামলাকারী জঙ্গীদের কেউ, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন করেছেন। এ কারণে জিন্সের প্যান্ট ও গেঞ্জি পরিহিত ওই মধ্যবয়সী লোকটি সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।

কে এই হাসনাত রেজা করিম ॥ হাসনাত রেজা করিম হিযবুত তাহরীরের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটি থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। এ কারণে ২০১২ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অব্যাহতি দেয় তাকেসহ চারজন শিক্ষককে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে। সেই কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতেই অব্যাহতি দেয়া হয় হাসনাত রেজা করিমসহ চার শিক্ষককে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজনেস ফ্যাকাল্টির শিক্ষক ছিলেন হাসনাত করিম। ওই বিভাগেরই শিক্ষার্থী ছিলেন গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারীদের একজন নিব্রাস ইসলাম। গোয়েন্দাদের ধারণা, বেকরিতে নিহত জঙ্গী নিব্রাসের সঙ্গে হাসনাত রেজা করিমের যোগাযোগ ছিল তখন থেকেই। ২০১২ সালের মে মাসে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোর্সের নম্বরপত্রে নিব্রাসের নাম রয়েছে। ২০১২ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত হয় হাসনাত রেজা করিম।

আগে থেকেই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হিযবুত তাহরীরের কর্মকা-ে জড়িত থাকার নজির আছে। সোশ্যাল মিডিয়া রাইটার রাজিব হায়দার হত্যাকা-ে জড়িতরাও ছিল এ গ্রুপেরই সদস্য, যাদের মধ্যে অন্তত সাত নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থী এখন কারাবন্দী আছে। রাজিব হায়দায় হত্যা মামলায় তাদের বিচার চলছে। নর্থ সাউথের সাবেক এই শিক্ষককে গুলশানের হলি আর্টিজানে হত্যাকা-ের সময় দোতলার বারান্দায় সিগারেট ফুঁকতে দেখা গেছে। সে সময় তার পেছনে দুই জঙ্গী মাথা নিচু করে হাঁটছিল। এছাড়াও তাকে কাচের দরজার ওপাশে রাইফেল হাতে এক জঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। আর জঙ্গী নাটকের অবসানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে নির্বিকারভাবেই বের হয়ে আসতেও দেখা যায় তাদের। ভিডিওফুটেজের এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ও হাসনাত রেজা করিম সম্পর্কে আগের তথ্য নিয়ে তাকে আটক করেছে গোয়েন্দারা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে। তখন থেকে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়েই রয়েছেন তিনি। সন্দেহের কারণেই তাকে গোয়েন্দা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দ সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গীসংক্রান্ত তারা দুটি বিষয় বিবেচনায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এক এই হাসনাত করিমের সঙ্গে জঙ্গীদের যোগাযোগ ছিল কিনা? তবে এমনও হতে পারে জঙ্গীদের একজন এক সময় তার বিভাগের সরাসরি শিক্ষার্থী থাকায় তাকে মুক্ত করে দিয়ে থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

হাসনাত করিমের পরিবার এর আগে সংবাদমাধ্যমকে বলেছে, কোরান শরীফ থেকে পাঠ করতে পারার সুবাদেই তারা মুক্তি দেয় তাকে। তিনি এখন অফিসিয়ালি কর্মরত রয়েছেন বেসিক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। এই প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডিরেক্টরে তার নাম রয়েছে। আর নামগুলো পড়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এটি সম্ভবত তাদের পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের তালিকায় নাম রয়েছে আনোয়ারুল করিম নামের একজনের। হাসনাত রেজা করিম ঘুরে এসেছেন কাতারেও। এ সফরের তার উদ্দেশ্য কি ছিল তা কোথাও জানা যায়নি। জিম্মি নাটকের রাতে ও সকালে তাকে যে টি-শার্ট ও ন্যাড়া মাথায় হলি আর্টিজানে দেখা গেছে একই টি-শার্ট পরা তার একটি ছবি রয়েছে ওই সফরের সময়েরও।

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৬

০৫/০৭/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: