২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা বলয়ে জঙ্গীরা কিভাবে গেল?


আজাদ সুলায়মান ॥ গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ভয়াবহ জঙ্গী হামলার পর নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইতিহাসের ভয়ঙ্কর ও নৃশংস এ হামলায় অংশগ্রহণকারীরা বিনা বাধায় হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ পর্যন্ত পৌঁছার সুযোগ পেল কিভাবে, কারা তাদের সাহায্য করেছে, কেন তাদের বাধা দেয়া হলো নাÑ এখন এসব ভাবিয়ে তুলেছে গোয়েন্দাদের। গুলশান থানা পুলিশের পাশাপাশি দূতাবাসের জন্য আলাদা চ্যান্সারি পুলিশের টহল ব্যবস্থা থাকার পরও কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এতবড় ঘাটতি ছিল, তার হিসাব মেলাতে পারছে না গোয়েন্দারা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন নজরদারির মাধ্যমে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই জঙ্গীরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ওই রেস্তরাঁয় ঢোকার সুযোগ নিয়েছে। রবিবার গুলশানের প্রত্যেকটি প্রবেশ মুখ সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, চোখে পড়ার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চৌহদ্দি ও চেকপোস্ট থাকলেও তার সুফল পাচ্ছে না সেখানকার দেশী-বিদেশী বাসিন্দারা। উল্টো নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার মতো অভিযোগ বেশ জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পকেটে থাকা মানিব্যাগ তন্নতন্ন করে খোঁজা হলেও সন্দেহজনক মাইক্রোবাস ঠিকই এসব চেকপোস্টক ফাঁকি দিতে সক্ষম হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুক্রবার রাতে হলি আর্টিজানে হামলাকারী জঙ্গীরা একটি মাইক্রোবাসে করেই সেখানে হাজির হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্র্শীরা।

হলি আর্টিজানের পাশের একাধিক ভবনের দারোয়ান নিজেদের প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত ৯টার কিছুক্ষণ আগে কয়েক বিদেশীকে বহনকারী একটি গাড়ি দ্রুত ওই সড়কের লেক ভিউ ক্লিনিকের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকে। ঠিক ওই গাড়ির পেছনে আরও দুটি গাড়ি ঢোকে। এরপরই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। মনে হয়েছে বিদেশীদের বহনকারী গাড়িটি অনুসরণ করে পেছনের দুটি গাড়ি ঢুকেছে। আর গোলাগুলি শুরুর পরপরই ওই গাড়ি দুটি বের হয়ে যায়। হলি আর্টিজানের আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে গুলশান-২ এর ১১৩ নম্বর সড়কে, যার নাম ইজুমি। এখানে শুধু জাপানী খাবার বিক্রি করা হয় বলে জানান নিরাপত্তাকর্মী মোহন মিয়া। তার কথায়ও ওই প্রত্যক্ষদর্শীর দেয়া বর্ণনার মিল পাওয়া যায়।

মোহনও সাংবাদিকদের জানান, দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহজাদ মেহেদীসহ কয়েকজন। ঘটনার সময় মেহেদী ১১৩ নম্বর সড়কের ইজুমিতে ছিলেন। হলি আর্টিজানে ছয় নিরাপত্তাকর্মী ছিল জানিয়ে সেখানকার এক নিরাপত্তাকর্মীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, রাত পৌনে নয়টার দিকে বিদেশীদের বহনকারী একটি গাড়ি রেস্তরাঁ ও হাসপাতাল গেটে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে আরও দুটি গাড়ি ঢোকে। ওই গাড়ি দুটি থেকে নেমে কয়েক যুবক বিদেশীদের বহনকারী গাড়িচালকের দিকে গুলি চালায়। যুবকরা গাড়ি থেকে নামার পর তাদের বহনকারী গাড়ি দুটি চলে যায় বলে ওই নিরাপত্তাকর্মীর বরাত দিয়ে জানান মোহন মিয়াও। গাড়িচালককে গুলি করার পর অস্ত্রধারীদের গুলিতে হলি আর্টিজানের একজন নিরাপত্তাকর্মীও আহত হয়েছেন। বিদেশীদের বহনকারী যে গাড়িটির চালককে গুলি করা হয়েছিল তার নাম রাজ্জাক। জাপানী এক নাগরিকের গাড়ি চালান তিনি।

এদিকে ভয়ঙ্কর এ ঘটনার পর গুলশানবাসী কূটনীতিক এলাকায় বড় ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল বলে আবারও অভিযোগ করছেন। গুলশানে রক্তারক্তির ঘটনা তো এই প্রথম নয়। এর আগেও বড় দুটো হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে হলি আর্টিজানের আশপাশেই। গত বছর সেপ্টেম্বরে দুর্বৃত্তরা গলা কেটে হত্যা করে ইতালিয়ান নাগরিক তেভেজকে। তার আগের বছর হত্যা করা হয় সৌদি কূটনীতিক খালাফকে। ওই দুটো হত্যাকা-ের পরও গুলশান থানাসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন আর কোন নিরাপত্তা ঘাটতি নেই। এলাকায় নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু হলি আর্টিজানের ভয়ঙ্কর ঘটনায় প্রমাণ করে গুলশানের চারপাশে যে নিরাপত্তা চেকপোস্ট রয়েছে তা কোন কাজেই আসছে না।

সরেজমিন দেখা যায়, গুলশানের কূটনীতিক এলাকায় প্রবেশের জন্য ছয়টি প্রবেশ মুখ। একটি শূটিং ক্লাব এলাকার আমতলীতে, একটি মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদের পাশে, একটি কাকলী থেকে আসার পথে বনানী লেক ব্রিজে, একটি নর্দা বারিধারার দিক থেকে প্রবেশ মুখ ইউনাইটেডের সামনে, অপরটি গুলশান আমেরিকা দূতাবাসের দিক থেকে আসার পথে মরিয়মা টাওয়ারের লেনে, আরেকটি বাড্ডা থেকে এক নম্বর গোলচক্করের পাশে। এসব প্রবেশ মুখেই রয়েছে নিরাপত্তা চেকপোস্ট, যেখানে এপিবিএন সর্বক্ষণিক পালাক্রমে ডিউটি করছে। এর বাইরে রয়েছে চ্যান্সারি পুলিশের টহল। রয়েছে বড় বড় গোয়েন্দা সদস্যদের নজরদারি।

এ এলাকার বাসিন্দা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই জনকণ্ঠকে বলেন, এখানে নিরাপত্তার নামে চলছে তুঘলকি কর্মকা-। আমি বিশ্বমানের একটি অডি গাড়িতে করে প্রায়ই গভীর রাতে ক্লাব থেকে বাসায় ফেরার পথে ওই সব চেকপোস্টে যেভাবে পুলিশকে ডিউটি করতে দেখি, তাতে নিজেরই লজ্জা লাগে। কূটনীতিক এলাকায় দায়িত্ব পালন পুলিশের যদি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দক্ষতা না থাকে, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কিভাবে? ওরা যদি মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে অপরাধী আর নিরীহ লোকের পার্থক্য বুঝতে না পারে তাহলে তো নিরাপত্তা বিঘিœত হবেই।

গুলশানেরই বাসিন্দা আবদুর রহমান জাহাঙ্গীর জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি চেকপোস্টেই সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা তল্লাশির নামে অদ্ভুত কিসিমের হয়রানি করা হয়। যেমন গার্মেন্টসের একজন লেবার রাত এগারোটায় ঘরে ফেরার সময় তার শরীর তল্লাশি করার আগেই প্রথমে হাত দেয়া হয় তার ম্যানি ব্যাগে। ওই সময় পাশ দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় গাড়ির পর গাড়ি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, চেকপোস্ট বসানো হয়েছে যাতে বিস্ফোরক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কেউ গুলশানে ঢুকতে না পারে সেটা চেক করার জন্য। কিন্তু এসব চেকপোস্টে দেখা যায়Ñ সাধারণ মানুষদের চেক করাই তাদের প্রধান টার্গেট।