২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সারাবিশ্বের নজর কাড়তেই গুলশানের মতো হাই প্রোফাইল জোনে হামলা


জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ রাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তরাঁতে হামলার জন্য জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) জঙ্গীদের কাজে লাগানো হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এই জঙ্গীরা কাদের হাতে বা মদদে পরিচালিত হচ্ছে? ইসলামিক স্টেট (আইএস) না আল কায়দা? গোয়েন্দাদের ধারণা, গুলশানের ঘটনার পেছনে আইএস বা আল কায়দার মতো শক্তিশালী কোনও সংগঠনের মস্তিষ্কই কাজ করেছে। পাশাপাশি এই হামলা যে ভবিষ্যতে উপমহাদেশ তথা ভারতে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে আছড়ে পড়বে। সে আশঙ্কা আরও দানা বাঁধছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সামনে।

বাংলাদেশের জঙ্গী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি দফায় দফায় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। সূত্র জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, এই হামলা শুধু জেএমবির কাজ বলে ভাবলে ভুল হবে। তাদের পেছনে ক্ষুরধার কোনও জঙ্গী সংগঠনের মস্তিষ্ক এবং সাহায্য দুই-ই আছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দফতর, কূটনীতিকদের বাড়ি-অফিস সমৃদ্ধ গুলশানের মতো একটি হাই প্রোফাইল জোনে হামলা হলে সারা বিশ্বের নজর পড়বে। জেএমবি এর আগে অনেক হামলা চালালেও সেখানে এ ভাবে হামলার ছাপ দেখা যায়নি। সে কারণে গুলশানের হামলার পেছনে আইএস বা আল কায়দার ছায়া দেখছেন গোয়েন্দারা।

আইএস এবং আল কায়দা দুটি সংগঠনই এই হত্যাকা-ের দায় নিলেও ভারতীয় গোয়েন্দাদের একটা বড় অংশ কিন্তু আইএসের সম্পৃক্তাই দেখছেন। তাদের মতে, আল কায়দার সেই রমরমা ক্ষমতা গত কয়েক বছরে আর নেই। সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে আইএস। এই ঘটনায় আল কায়দা দায় নিলেও আইএসের জড়িত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণ ভাবে দেখা গেছে, আইএস নিজেরা সবরকমভাবে যুক্ত থাকলে তবেই কোনও হামলার দায় নেয়। এ ব্যাপারে কখনও উল্টোপাল্টা দাবি করে না বা যে কোনও জঙ্গী হামলার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চায় না। তবে হ্যাঁ, এই ঘটনায় অবশ্যই কিছু স্থানীয় ফ্যাক্টরও কাজ করেছে। তা ছাড়া যে রকম নৃশংসতার সঙ্গে হত্যাকা- চালানো হয়েছে। তাতে আইএসের যুক্ত থাকার ছাপ স্পষ্ট।

গোয়েন্দারা বলছেন, স্থানীয় জঙ্গী সংগঠনের মধ্যে আইএস নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এতটাই বাড়িয়েছে যে নাশকতার মধ্যেও তাদের স্টাইল ফুটে উঠেছে। তবে আইএস প্রত্যক্ষভাবে ঢাকায় তাদের ডালপালা ছড়াচ্ছে, নাকি আইএসকে দেখে অনুপ্রাণিত স্থানীয় জঙ্গীরা নতুন উদ্যমে নাশকতায় নামছে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।

সূত্র জানায়, আইএস বেশ কিছু দিন ধরেই নজর দিয়েছে বাংলাদেশের ওপরে। বাংলাদেশে শক্তি বাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে ভারতে পা ফেলতে বেশি উৎসাহী তারা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যে দু’টি জঙ্গী সংগঠনের বেশি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সে দুটি জঙ্গী সংগঠন হলো- জেএমবি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। এদের মধ্যে জেএমবি আবার আইএস ঘেঁষা। আইএসের পত্রিকা ‘দাবিক’-এ গত সংখ্যাতেই লেখা হয়েছিল, কিছু দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে তারা হাই প্রোফাইল আক্রমণ করবে। সেখানেই থামবে না। তার পরের আক্রমণটা হবে আরও বড়। গোয়েন্দাদের মতে, বাংলাদেশে আইএসের থাবা বসানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে সরকার-বিরোধী জঙ্গী সংগঠনগুলো যথেষ্ট সক্রিয়। বাংলাদেশে পা দেয়ার পরবর্তী পদক্ষেপই যে ভারত হতে পারে, এমন আশঙ্কাকে এখন আর আদৌ অমূলক বলে মনে করছেন না গোয়েন্দারা।

আবার পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সঙ্গেও যে জেএমবির যোগ নেই, এমন কথাও মনে করা ঠিক হবে না বলেই কূটনৈতিক মহলের মত। তাদের কারও কারও দাবি, সম্প্রতি আইএসআই-এর সঙ্গে জেএমবির নতুন করে আঁতাত হয়েছে। সার্ক দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে আসন্ন সম্মেলনে এ প্রসঙ্গ উঠতে পারে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু সীমান্তবর্তী রাজ্য, তাই হামলার আশঙ্কায় চরম সতর্কতা জারি করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে রাজ্য সরকারকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন আগেই ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল বাংলাদেশকে। এ ব্যাপারে একটি ‘ডসিয়ার’ও দেয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়, বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হাত মিলিয়ে বৃহত্তর বাংলাদেশ তৈরি করতে চাইছে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশকে মিশিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে। ডসিয়ারে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ভেতরে কিছু জঙ্গী সংগঠন আইএসের ভিত তৈরি করতে সক্রিয় সহযোগিতা করছে।

এই হামলার সঙ্গে সাম্প্রতিক প্যারিস হামলার নক্সার মিল খুঁজে পাচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এটা লক্ষ্যণীয় যে, ঢাকার ঘটনায় টার্গেট করা হয়েছে বিদেশী নাগরিকদের। তবে স্থানীয় কিছু বিষয়ও যে এর সঙ্গে জড়িত, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে জঙ্গীদের শর্তগুলো দেখে। তারা জেএমবি নেতা খালেদ সাইফুল্লার মুক্তির দাবি করেছিল। পাশাপাশি গুলশানের এই আক্রমণকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হওয়া অভিযান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ারও দাবি তুলেছিল।

জঙ্গীদের দেয়া এই শর্তগুলোই নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের সমস্ত জেহাদী গতিবিধির ওপর নজর রাখে যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা, সেই ‘সাইট’ জানিয়েছে, আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ঠিকই। কিন্তু তারা যদি হামলা চালায়, তা হলে জেএমবি নেতার মুক্তির দাবি প্রধান হয়ে উঠবে কেন? বাংলাদেশের একটি অংশের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাস বাড়াতেই আইএসের নাম ব্যবহার করছে জেএমবি।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: