২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

খালেদা জিয়াও সন্ত্রাস বিরোধী ঐক্য গড়ার আহ্বান জনালেন


স্টাফ রিপোর্টার ॥ দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। রবিবার বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গুলশানের হত্যাযজ্ঞ আমাদের জন্য নতুন এক ভযাবহ সঙ্কট। তাই আমরা যে যাই বলি, আমাদের কিছুই থাকবে না, কোন অর্জনই টিকবে না, যদি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করতে না পারি। যদি না জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি। তাই কালবিলম্ব না করে আসুন আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, ভয়াবহ হত্যাকা-ের ফলে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে এর শেকড় অনেক গভীরে। দেশ ও জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যত আজ বিপন্ন। তাই আমাদের একতাবদ্ধ হতেই হবে। কে ক্ষমতায় থাকবে, কে ক্ষমতায় যাবে, সেটা আজ বড় কথা নয়। আজ আমরা আছি, আগামীতে আমরা কেউ হয়ত থাকব না কিন্তু দেশ থাকবে, জাতি থাকবে।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা ও নিরপরাধ মানুষের হত্যাযজ্ঞকে মেনে নিতে পারে না। এমন অযৌক্তিক, নিষ্ঠুর, হঠকারী ও ভুল পথে কোনকিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। কোন আদর্শ কিংবা ধর্মই এ ধরনের কা-জ্ঞানহীন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনুমোদন করে না। শান্তির ধর্ম পবিত্র ইসলাম নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা এবং সন্ত্রাসের ঘোরবিরোধী। তাই সংযম সাধনার মহিমান্বিত মাস রমজানে এ রক্তপাত প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে স্তম্ভিত করেছে।

খালেদা জিয়া বলেন, ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয় গ-ি পেরিয়ে সন্ত্রাস আজ বিশ্বের দেশে দেশে রক্ত ঝরাচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও আজ সন্ত্রাসের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত। এটা আমাদের জন্য নতুন এক ভয়াবহ জাতীয় সঙ্কট। শুক্রবার রাতের ঘটনায় শুধু একটি রেস্তরাঁ নয়, সারা বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতা, আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকা-, ব্যবস্যা-বাণিজ্য, জীবনযাপন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সকলের মিলিত প্রয়াসে আমাদের এ সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বলেন, গভীর বেদনাভরা মন নিয়ে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের জাতীয় জীবনের এক মহাসঙ্কটের সময় এখন। শুক্রবার রাতে রাজধানী ঢাকায় এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। কূটনৈতিক এলাকার কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, গ্রেনেড ও বোমা নিয়ে সন্ত্রাসী দল ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়। তারা গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের একটি স্প্যানিশ রেস্তরাঁয় ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে সেখানে অবস্থিত দেশী-বিদেশী নাগরিকদের জিম্মি করে।

খালেদা জিয়া বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালাতে গেলে সন্ত্রাসীদের গুলি-বোমায় দু’জন পুলিশ অফিসার নিহত ও অনেকে আহত হন। রাতেই সন্ত্রাসীরা তাদের হাতে জিম্মি দেশী-বিদেশী ২০ জন নিরপরাধ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই পৈশাচিক সন্ত্রাসী হামলা এবং নারীসহ দেশী-বিদেশী নির্দোষ নাগরিকদের এভাবে হত্যার ঘটনার নিন্দা করার কোন ভাষা নেই। আমরা গভীর বেদনাহত এবং ক্ষুব্ধ। কোন অজুহাতেই শান্তিপ্রিয় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সুস্থতার লক্ষণ নয়। এ বিকারগ্রস্ততার প্রতি আমরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছি।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, বাংলাদেশ ও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমরাও শঙ্কিত। কারণ এ ঘটনায় আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ত্রুটি এবং সন্ত্রাসীদের সামর্থ্য প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। আমরা এর আগে সন্ত্রাসীদের চোরাগোপ্তা হামলার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। কিন্তু এখন তা আর চোরাগোপ্তা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ আমাদের এ শান্তিপ্রিয় মানুষের দেশে ভয়াবহ সন্ত্রাসের দানব গোপনে বেড়ে উঠেছে। তারা এখন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে প্রকাশ্যেই ভয়ঙ্কর ছোবল হানছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। দৃশ্যমান শত্রুর তুলনায় অদৃশ্য শত্রুর হামলা মোকাবেলা এবং তাদের দমন করা অনেক কঠিন। এ কথা জানি বলেই আমরা এতটা উৎকণ্ঠিত।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, আমাদের এ বিপদের দিনে সহানুভূতি ও সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে যেসব বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমি আশা করি আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে তারা সন্ত্রাস মোকাবেলায় সম্ভাব্য সকল ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তবে নির্দিষ্ট ভূখ-ে সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রথম কর্তব্য হচ্ছে সে দেশের সরকার ও জনগণের। বর্তমানে আমরা সন্ত্রাসের যে চিত্র দেখছি সেটা নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত মামুলী কোন সমস্যা নয়। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ সন্ত্রাস মোকাবেলা করা যাবে না। এ সঙ্কটের শেকড় আরও অনেক গভীরে। সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে এ সঙ্কট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। এ বিষয়টির দিকে আমি সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সতেচন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবেÑ গণতন্ত্রহীন দেশে, স্বৈরাচারী শাসন, অসহিষ্ণু রাজনীতি, দমন-পীড়নের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অধিকারহীন সমাজ, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য-বঞ্চনা এবং সুশিক্ষার অভাব ক্রমাগত চলতে থাকলে সেখানে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের মাধ্যমে এ কারণগুলো দূর না করলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না। আমি মনে করি, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কেবল গণতান্ত্রিক পরিবেশই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।

খালেদা জিয়া বলেন, শুধু শুক্রবার রাতের ঘটনাই নয়। সারাদেশ আজ সন্ত্রাসের থাবায় ক্ষতবিক্ষত। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, ধর্মগুরু ও যাজক, ভিন্নমতের লেখক, প্রকাশক-ব্লগার, খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আমাদের সযতেœ লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। কোথাও কেউ নিরাপদ নয়। এ আতঙ্ক, এ হত্যালীলা থামাতে হবে। বন্ধ করতে হবে রক্তপাত। আমাদের একতাবদ্ধ হতেই হবে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

খালেদা জিয়া বলেন, শুক্রবার রাতের রক্তক্ষয়ী ঘটনার অবসান ঘটেছে শনিবার সকালে আমাদের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে। এতে সন্ত্রাসীদের হত্যা, সন্দেহভাজন হিসেবে আটক এবং জিম্মিদশা থেকে ১৩ জন দেশী-বিদেশী নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমরা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছি। এজন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আমি সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই জাতীয় জীবনের এমন সঙ্কটে তাদের সামর্থ্য ও অনিবার্য প্রয়োজন আরেকবার প্রমাণ করার জন্য। এ অভিযানে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী পুলিশ, র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থা, অগ্নিনির্বাপক দল এবং গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের যেসব সদস্য অসম সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন আমি তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকসহ কর্তব্যরত সংশ্লিষ্ট সকলকে আমি ধন্যবাদ জানাই।

খালেদা জিয়া বলেন, পুলিশ বাহিনীর যে দু’জন অফিসার উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে শুক্রবার রাতেই জীবন দিয়েছেন, আমি তাদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাদের শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের বিদেহী আত্মার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। যারা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। তারা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন, সে দোয়া করছি। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশী নাগরিক তিনজন সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে হত্যা করেছে। আমি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। শোকাহত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন এবং ভারতীয় একজন নাগরিক সন্ত্রাসীদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে অসহায় মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এই বিদেশী নাগরিকরা পোশাকশিল্পের ক্রেতা হিসেবে এবং ব্যবসা, চাকরি ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন। আমি তাদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাদের নিজ নিজ পরিবার এবং ইতালী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সরকার এবং জনগণের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেনÑ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।