২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গুলশান হামলায় আইএসআই সম্পৃক্ত


জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় নারকীয় হত্যাকা-ের ঘটনায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। হামলাকারীদের পেছনের শেকড় খুঁজতে গিয়ে গোয়েন্দাদের তদন্তের মোড় সেদিকেই টার্ন নিচ্ছে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, গুলশানে রেস্তরাঁয় হামলার পেছনে কোন আন্তর্জাতিক মৌলবাদী সংগঠন জড়িত নয়। গুলশানের ঘটনায় যারা জড়িত, তারা সবাই বাংলাদেশের একটি জঙ্গী সংগঠনের সদস্য। তবে তাদের পেছনে সমর্থনের হাত রয়েছে আইএসআইয়ের।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামেরও অভিমত তাই। ভারতীয় এনডি টিভির সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, এই হামলায় প্রধান ভূমিকা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামায়াত-উল-মুজাহিদিনের (জেএমবি)। এর সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই ও জামায়াতের সম্পৃক্ততা সবারই জানা। কারণ তারাই বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। আর জিম্মিদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা জামায়াত ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ করে থাকে।

গোয়েন্দারা মনে করছেন, গুলশানের রেস্তরাঁয় নাশকতার জন্য জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গীদের কাজে লাগানো হয়ে থাকতেই পারে। এ হামলার সঙ্গে সাম্প্রতিক প্যারিস হামলার নক্সার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কারণ ঢাকার ঘটনায় টার্গেট করা হয়েছে বিদেশী নাগরিকদের। তবে স্থানীয় কিছু বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত। সেটা স্পষ্ট হচ্ছে জঙ্গীদের দেয়া শর্তগুলো থেকে। জঙ্গীরা জেএমবি নেতা খালেদ সাইফুল্লার মুক্তি দাবি করেছিল। পাশাপাশি গুলশানের হামলাকে তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হওয়া অভিযান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি তুলেছিল।

মূলত জঙ্গীদের দেয়া এই শর্তগুলোই নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের সমস্ত জেহাদী গতিবিধির ওপর নজর রাখছে মার্কিন একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের সাইটে বলা হয়েছে, আইএস এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু তারা যদি হামলা চালায়, তাহলে জেএমবি নেতার মুক্তি দাবি প্রধান হয়ে উঠবে কেন? বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাস বাড়াতেই আইএসের নাম ব্যবহার করেছে জেএমবি। কিন্তু এই জঙ্গীরা কাদের হাতে পরিচালিত হচ্ছে? এক্ষেত্রে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে জেএমবির যোগসাজশ নেই তা মনে করার কোন কারণ নেই। গোয়েন্দাদের অভিমত, সম্প্রতি আইএসআইয়ের সঙ্গে জেএমবির নতুন করে আঁতাত হয়েছে।

গোয়েন্দাদের অভিমত, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য স্থানীয় তরুণদের কাজে লাগানো হচ্ছে। এটা গুলশান হামলাকারীদের পরিচয় থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজধানীর গুলশানে রেস্তরাঁয় জিম্মি ঘটনায় বন্দুকধারী জঙ্গীদের নাম এবং ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে নিহত বন্দুকধারীদের হত্যা-পরবর্তী ছবিও প্রকাশ হয়েছে। নিহত পাঁচ হামলাকারী হলো আকাশ, বিকাশ, ডন, বাঁধন ও রিপন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক বলেছেন, ‘নিহত পাঁচজনই পুলিশের তালিকাভুক্ত জঙ্গী সদস্য, তাদের পুলিশ খুঁজছিল। আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দেশের কারও পরামর্শেই গুলশানের আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা হয়েছে। নিহতরা সবাই বাংলাদেশী জঙ্গী। তারা দেশের কারও পরামর্শেই এ কাজ করেছে।

তিনি আরও বলেন, জঙ্গী হিসেবে যাদের শনাক্ত করা হচ্ছে, তদন্তের পর বুঝতে পারবÑ তারা কীভাবে কোন পরিস্থিতিতে এখানে এলো। অভিযানে যারা নিহত হয়েছে তারা সবাই বাংলাদেশী, কেউ বিদেশী নয়। বিদেশীদের সঙ্গে এদের কানেকশন আছে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশেই এদের উৎপত্তি।

এ ক্ষেত্রে ঘটনার রাতে হামলাকারী পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করে জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ থেকে প্রকাশিত পাঁচ ব্যক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, এরাই গুলশানে রেস্তরাঁয় হামলা করেছে। যে পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, তারা সবাই বিদেশী নাগরিক বলেও দাবি করা হয়। তবে ছবি প্রকাশ করা হলেও তাদের পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এসব বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আইএস নয়, জেএমবি-ই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আর এর পেছনে কোন প্রভাবশালী বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত রয়েছে। যার যোগ পাওয়া যাচ্ছে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার।

আবার সাউথ ব্লকের উদ্ধৃতি দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, গুলশনের ঘটনার পেছনে আইএস বা আল কায়দার মতো শক্তিশালী কোন সংগঠনের মস্তিষ্কই কাজ করেছে। পাশাপাশি এই নাশকতা যে ভবিষ্যতে উপমহাদেশ তথা ভারতে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে আছড়ে পড়তে পারে, সে আশঙ্কাও ক্রমশই গভীর হয়ে দানা বাঁধছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সামনে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানিয়েছেন, এ হামলা শুধু জেএমবির কাজ বলে ভাবলে ভুল হবে। তাদের পেছনে ক্ষুরধার কোন জঙ্গী সংগঠনের মস্তিষ্ক এবং সাহায্য দুই-ই আছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দফতর, কূটনীতিকদের বাড়ি-অফিস সমৃদ্ধ গুলশনের মতো একটি হাই প্রোফাইল জোনে হামলা হলে গোটা বিশ্বের নজর কাড়া যাবে। জেএমবি এর আগে অনেক হামলা চালালেও সেখানে এভাবে নজর কাড়ার ছাপ দেখা যায়নি। সে কারণেই গুলশানের ঘটনার পেছনে আইএস বা আল কায়েদা যুগের ছায়া দেখছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা।

আইএস এবং আল কায়েদার দুটি সংগঠনই এ হত্যাকা-ের দায় নিলেও ভারতীয় গোয়েন্দাদের একটা বড় অংশ কিন্তু আইএস যুগই দেখছেন। তাদের মতে, আল কায়েদার সেই রমরমা অবস্থা গত কয়েক বছরে আর নেই। সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে আইএস। সুতরাং এ ঘটনায় আল কায়েদা দায় নিলেও আইএস-যুগের সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া যে রকম নৃশংসতার সঙ্গে হত্যাকা- চালানো হয়েছে, তাতে আইএসের ‘হাতের ছাপ’ স্পষ্ট।

দিল্লীর সাউথ ব্লক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা আরও জানায়, আইএস কিছুদিন ধরেই নজর দিয়েছে বাংলাদেশের উপরে। বাংলাদেশে শক্তি বাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে ভারতে পা ফেলতে বেশি উৎসাহী তারা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যে দুটি জঙ্গী সংগঠন হাসিনা প্রশাসনের ঘুম কেড়েছে, তারা হলো জেএমবি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। এদের মধ্যে জেএমবি আবার আইএস-ঘেঁষা। আইএসের পত্রিকা ‘দাবিক’-এ গত সংখ্যাতেই লেখা হয়েছিল, কিছু দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে তারা হাই প্রোফাইল আক্রমণ করবে। সেখানেই থামবে না। তার পরের আক্রমণটা হবে আরও বড়। গোয়েন্দাদের মতে, বাংলাদেশে আইএসের থাবা বসানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে সরকারবিরোধী জঙ্গী সংগঠনগুলো যথেষ্ট সক্রিয়। বাংলাদেশে পা দেয়ার পরবর্তী পদক্ষেপই যে ভারত হতে পারে, এমন আশঙ্কাকে এখন আর আদৌ অমূলক বলে মনে করছেন না সাউথ ব্লকের কর্তারা।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: