১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ধনীর দুলালদের জঙ্গী কানেকশন!


মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির ॥ গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি নামের স্প্যানিশ রেস্তরাঁয় জঙ্গীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে জিম্মি উদ্ধারে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযানের সফল সমাপ্তির পর দেশের সচেতন মহলকে নতুন করে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে জঙ্গী তৎপরতা নিয়ে। এতদিন পর্যন্ত জঙ্গী তৎপরতায় সক্রিয়ভাবে লিপ্তদের মাদ্রাসা বা ইসলামী লাইনের শিক্ষা নেয়া যুবকরাই চিহ্নিত হয়েছে। গুলশান ট্র্যাজেডির পর বেরিয়ে এসেছে মাদ্রাসা ছাড়াও বিভিন্ন কলেজ, ভার্সিটি এমনকি ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়া করা যুবকরাও জঙ্গী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। এরা জঙ্গী তৎপরতার নেপথ্যের গডফাদারদের দেয়া ছদ্মনামে সক্রিয় থেকে অস্ত্র পরিচালনা ও কমান্ডো তৎপরতার শিক্ষা নিচ্ছে। ইতোপূর্বে বাঁশখালী লটমনি পাহাড় এলাকায় এ ধরনেরই একটি জঙ্গী প্রশিক্ষণের আস্তানা আবিষ্কার করেছিল পুলিশ। শুক্রবার রাতে গুলশানের সেই রেস্তরাঁয় যে ৬ জঙ্গী নারকীয় তা-ব চালিয়ে ২ পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশী-বিদেশী ২২ নাগরিককে হত্যা করেছে এদের পরিচয় মেলার পর দেখা যায় এরা সবাই বাংলাদেশী এবং সকলেই ঢাকার অভিজাত পাড়ার ধনীর দুলাল। এই ধনীর দুলালদের জঙ্গী তৎপরতায় জড়িত হয়ে বর্বর ঘটনার জন্ম দেয়ার প্রমাণ এই প্রথম। সঙ্গত কারণে সকল মহলে প্রশ্ন উঠেছে এ কিসের আলামত। বিভিন্ন সূত্র মতে, ইতোপূর্বে আল কায়েদা নেতা ভারত ও মিয়ানমারে তাদের তৎপরতা চালাতে বাংলাদেশকে ঘাঁটি করার ঘোষণা দিয়েছিল। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সে ঘোষণা অনুযায়ী তারা এগিয়ে যাচ্ছে কিনা। ঢাকার গুলশানের মতো উচ্চবিত্তদের আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা পুলিশের লিস্ট অনুযায়ী সর্বাগ্রে। এমন একটি স্পর্শকাতর এলাকায় জঙ্গী তৎপরতায় লিপ্ত একদল যুবক শুক্রবার রাতে যে তা-ব চালিয়ে হিংস্র ছোবল মেরেছে তাতে তারা দেশী-বিদেশী ২২ জনের প্রাণহরণ করেছে। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযানে ৬ জঙ্গী নির্মূল হয়েছে। কিন্তু দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জঙ্গী গ্রুপের সদস্যদের দেশী-বিদেশী সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে প্রাণহরণ করার মতো ঘটনা এই প্রথম, যা বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। শুধু মিডিয়ায় নয়, বিভিন্ন দেশের সরকার এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘটনার নিন্দার পাশাপাশি জঙ্গী নির্মূলে সহায়তার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে। যা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে আশান্বিত করেছে। এছাড়া শনিবার সকালের কমান্ডো অভিযানে জঙ্গীরা নির্মূল এবং ১৩ জিম্মি উদ্ধার হওয়ার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ঢাকা, চট্টগ্রাম চারলেন সড়কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবং পরবর্তীতে সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে যা বলেছেন এবং যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তা সুধীমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এর পাশাপাশি নিহতদের উদ্দেশে দু’দিনের শোক পালন এবং আজ সোমবার ঢাকায় আর্মি স্টেডিয়ামে নিহতদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর ঘোষণা জঙ্গী ও জঙ্গীবাদের প্রতি চরম নিন্দা এবং নিহতদের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বড় এক নিদর্শন হয়ে থাকবে। বিশেষজ্ঞ সূত্রমতে, মাদ্রাসাভিত্তিক জঙ্গী তৎপরতা এখন বিস্তৃতি লাভ করে তা বিভিন্ন কলেজ ভার্সিটি পর্যায়ে শেকড় গেড়ে বসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোতে জঙ্গীসহ সন্ত্রাস দমনে বেশ কয়েকটি নতুন সংস্থার জন্ম হয়েছে। যার মধ্যে সোয়াত, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন অন্যতম। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পুলিশের চৌকস সদস্যদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও বোমাসহ বিস্ফোরক দ্রব্য নির্মূলে আধুনিক ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সন্ত্রাস ও জঙ্গী তৎপরতা দমনে বিভিন্ন অপারেশনে প্রশিক্ষিত সদস্যদের তৎপরতা লক্ষণীয়। যা আরও অধিক হারে বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। গুলশানের ঘটনা জঙ্গী গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে হামলা ও জিম্মি করার তৎপরতা জানান দেয়া হয়েছে তা এদেশে এই প্রথম। সঙ্গত কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের এ নিয়ে জরুরীভিত্তিতে ভাবতে হবে। জঙ্গীদের সমূলে নির্মূল কর্মসূচীকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামাল দিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সূত্র জানায়, গুলশানের ঘটনার পর বাংলাদেশে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সফর যেমন হোঁচট খেয়েছে, তেমনি গার্মেন্টস সেক্টরে অসংখ্য বায়ার তাদের আগমনের কর্মসূচীও আপাতত স্থগিত এবং কেউ কেউ বাতিল করেছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানানো হয়েছে। জঙ্গীদের এ ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এবং এ তৎপরতা ছোট, মাঝারি বা বড় যাই হোক না কেনÑ এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে অপূরণীয়। যা কোন অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, গুলশানে জঙ্গীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত ৬ জাপানী নাগরিক নিয়োজিত ছিলেন মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে। একইভাবে নিহত অন্যান্য বিদেশী নাগরিকও কোন না কোন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কিংবা বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী। বাংলাদেশ এমন কোন ধনী দেশ নয় যে, বিদেশীরা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে আসেন। বরং এদেশে অবস্থানকারী অধিকাংশ বিদেশী নাগরিকই কোন না কোনভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।

বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশী নাগরিকদের হামলার ঘটনা ঘটতে পারে, তা ছিল কল্পনাতীত। কারণ, বাঙালীর খ্যাতি রয়েছে অতিথিপরায়ণ একটি জাতি হিসেবে। ঢাকার গুলশানে যে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ ঘটে গেল তা ম্লান করে দিয়েছে বাঙালী জাতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে। বিদেশী নাগরিকদের শত্রু এদেশে নেই, থাকার কথাও নয়। অথচ, জঙ্গীদের হিংস্র ছোবলে প্রাণ গেল অন্তত দেড় ডজন বিদেশীর।

দেশে আইএস আছে কি নেই সে বিতর্ক চলছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু আইএস থাক বা না থাক ঘটনা ঘটে গেছে। এতেই প্রমাণ হয়েছে যে জঙ্গীরা সক্রিয় রয়েছে এবং এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। অর্থাৎ সহিংস পথের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলছে। জঙ্গী বিষয়ে কাজ করেন এমন সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই সে বিতর্ক অযৌক্তিক। কেননা, আইএস মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ইরাকভিত্তিক একটি জঙ্গী সংগঠন। খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটি কাজ করছে আরব দেশগুলোতে। বাংলাদেশে আইএস থাকতে হবে কেন? বিতর্কটা হওয়া উচিত দেশে জঙ্গী আছে কিনা। জঙ্গী সংগঠন ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন মুসলিম দেশে। তারা কোথাও তালেবান, কোথাও আল কায়েদা, কোথাও আইএস, কোথাও আল নুসরা আবার কোথাও বা বোকা হারাম। যে নামেই থাকুক না কেন তাদের লক্ষ্য ও আদর্শ এক। বাংলাদেশে আইএস না থাকলেও অনেকগুলো জঙ্গী সংগঠন রয়েছে। আর এসব সংগঠন বেড়ে উঠেছে বড়দল ও সরকারগুলোর আশ্রয় প্রশ্রয়ে। এখন এরা গায়ে গতরে এতটাই সক্রিয় হয়েছে যে, মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনগুলোর বিকাশে শুরু হয় ২০০১ সালে নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে। একের পর এক গ্রেনেড হামলা হয়েছে উদীচী, সিপিবি, ছায়ানট, সিনেমা হল এমনকি আদালতেও। তখন বেশ আলোচিত চরিত্র হিসেবে বেরিয়ে আসে বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমানের নাম। জঙ্গীর বিষয়টি স্বীকারই করতে চায়নি তৎকালীন সরকার। বরং সরকারের শিল্পমন্ত্রী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, ‘জঙ্গী মিডিয়ার সৃষ্টি’।