২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গুলশানে জঙ্গী হামলা


রাজধানীর গুলশানের একটি স্প্যানিশ হোটেলে শুক্রবার রাতের জঙ্গী হামলা জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র থেমে নেই, বরং সেটি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এর আগেও অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা এবং টার্গেট কিলিং হয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম জঙ্গীরা সুপরিকল্পিতভাবে হামলার স্পটে অবস্থান গ্রহণ করে নিরীহ ব্যক্তিদের জিম্মি করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বিদেশী নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অস্তিত্বের কথা জানান দেয়া এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করাই যে ছিল সশস্ত্র জঙ্গীচক্রের মূল অভিপ্রায়Ñ সেটি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জঙ্গীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। শুক্রবার ছিল পবিত্র জুমাতুল বিদার দিন। তারাবির নামাজের সময় মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। তার বদলে তারা খোলা তরবারি নিয়ে বন্দুকের গুলি ছুড়তে ছুড়তে প্রবেশ করেছে হোটেলে এবং খাদ্য গ্রহণরত বা খাদ্যের অপেক্ষায় থাকা মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তোলে। কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই ওই তরবারি এবং আরও কিছু ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক মানুষ জবাই ও কোপানোয় মেতে ওঠে ওই ঘাতকেরা। কী নৃশংস ঘটনা!

বাংলাদেশের পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার জন্য সাম্প্রতিককালে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় নানা ধর্মাবলম্বী এমন সব সাধারণ মানুষকেই তারা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করছে যারা নিজ ধর্মের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাই বলা যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সুনাম অর্জনকারী একটি দেশে অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার মিশনে নেমেছে ওই জঙ্গীরা। গুলশানের ঘটনার দায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস স্বীকার করলেও ওই জঙ্গীরা ছিল প্রকৃতপক্ষে জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য। এই জেএমবি-ই ২০০৪ সালে একযোগে দেশের ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা চালিয়েছিল। জেএমবি বা আনসারুল্লাহ টিম কিংবা আইএসÑ যে নামেই তারা নিজেদের পরিচয় দিক না কেন তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীÑ তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর এই গোষ্ঠীর প্রধান মিত্র ও বুদ্ধিদাতা কারা তা সবারই জানা। এরাই এ দেশে বিচিত্র উপায়ে মানুষ হত্যার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মানুষ পুড়িয়ে হত্যার পর এখন মানুষ জবাই শুরু করেছে তারা।

গুলশানের ঘটনা এবং টিভি সম্প্রচার জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলো সরাসরি প্রতিবেদন প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি। তাদের কোন কোন কার্যক্রম প্রকারান্তরে হামলাকারীদের আগেভাগে সতর্ক করে দেয়ারই নামান্তর। তাছাড়া দেশের নিরাপদ একটি এলাকা, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত প্রহরা ও তল্লাশির ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে একটি ঘাতক দল কিভাবে প্রবেশ করতে পারল, সেটা বড় শঙ্কার বিষয়! এই ঘটনা আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতাকেও কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে গর্বের সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে জঙ্গীদের বিরুদ্ধে আমাদের পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত বীরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সন্ত্রাসীদের রুখতে গিয়ে তারা জীবনবাজি রেখেছেন। আমাদের যৌথবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ স্বল্প সময়ের অভিযানে জঙ্গীদের পরাস্ত করে জিম্মিদের উদ্ধার করেছেন। এটি প্রশংসাযোগ্য।

জঙ্গীবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। আমেরিকা, ফ্রান্স, তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বহু দেশেই জঙ্গী হামলা সংঘটিত হয়েছে।

আমরা আগেও জোরালোভাবে উচ্চারণ করেছি বাংলাদেশের ওপর মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ ছায়া বিস্তার করে চলেছে। তাদের কাছে মানবতন্ত্র নয়, বড় হলো চাপাতিতন্ত্র। তারা রাষ্ট্রের আইন মানে না। রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে তাদের অপতৎপরতা অবশ্যই রোধ করতে হবে। শেকড়সুদ্ধ তাদের উপড়ে ফেলা চাই সভ্যতার স্বার্থে। তা না হলে এরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত করে ছাড়বে। সময় এসেছে জঙ্গীবাদ মৌলবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানোর। দেশের প্রতিটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের আলোয় স্নাত তারুণ্যশক্তির সতর্ক সজাগ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।

গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে বাংলাদেশ সরকার দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। নিহত দেশী-বিদেশী নাগরিকদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি।

চার লেনের মহাসড়ক

বহু প্রতিক্ষীত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনবিশিষ্ট জাতীয় মহাসড়কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শনিবার। এর মাধ্যমে সত্যি বলতে কী দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রায় একটি বিপ্লবের সূচনা হলো। এর আগের শনিবার প্রধানমন্ত্রী যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নতুন বিরতিহীন ট্রেন সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের উদ্বোধন করেন, সেটিও একটি প্রায় বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এসবই বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের পরিচায়ক। এতদিন পর্যন্ত সরকারের উন্নয়নের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল জ্বালানি তথা বিদ্যুত। নানা বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও সরকার নানাবিধ উদ্যোগ ও চেষ্টার মাধ্যমে বিদ্যুত সমস্যার সমাধানে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও নতুন কূপ খননেও নিয়েছে নানাবিধ পদক্ষেপ। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ২০১৯ সালের পর দেশে কোন গ্যাস সঙ্কট থাকবে না। অতঃপর ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেনবিশিষ্ট মহাসড়কে উন্নীতকরণের মাধ্যমে সরকার প্রবেশ করল স্থলপথে যোগাযোগের সুবর্ণ যুগে।

শুনতে সহজ মনে হলেও এ দুটো সড়ক চার লেনে পরিণত করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দুটি প্রকল্পের অধীনেই কয়েকটি স্থানে উড়াল সড়ক, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করতে হয়েছে। সর্বাধিক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দিয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ ও মামলা মোকদ্দমা নিয়ে। এ সবই মোকাবেলা করে শেষ পর্যন্ত যে মহাসড়ক দুটি চার লেনে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে, এর জন্য সরকার তথা যোগাযোগ মন্ত্রণালয় অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

যে কোন দেশের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো লাইফলাইন। যে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশ তত উন্নত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকার দিক থেকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনবিশিষ্ট মহাসড়কে উন্নীত হওয়ায় একদিকে যেমন যাতায়াতের সময় অর্ধেক কমবে, অন্যদিকে উভয় অংশেই বাড়বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। তবে সমস্যাও আছে বৈকি! অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশের সড়ক, মহাসড়কগুলোতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে বাসস্ট্যান্ড, হাটবাজার, টেম্পোস্ট্যান্ড, স্কুল-কলেজ ও নানাবিধ স্থাপনা। ফলে এসব স্থানে জনসমাগম অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে। অনেক স্থানের সড়কে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ছোট যানবাহন, স্কুটার, নসিমন, করিমন ইত্যাদি চলতে দেখা যায়। অনেক স্থানে ধান-পাট মাড়াই, শুকানোসহ গবাদিপশু চড়ানো হয়ে থাকে। অপরিকল্পিতভাবে গাছপালা লাগাতেও দেখা যায়। ফলে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় জানমাল ও সম্পদহানি হয়। এসবকে ঘিরে যানবাহন ভাংচুর, ধর্মঘটসহ সড়ক অবরোধ করতেও দেখা যায়। সার্বিকভাবে সড়ক মহাসড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও ভাল নয়। ব্রিজ-কালভার্টগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহের ক্ষেত্রে যেন এমনটি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ট্রমা সেন্টার নির্মাণ এবং হাইওয়ে পেট্রোল পুলিশ মোতায়েন করাও জরুরী।