১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মেয়ের জন্য সারারাত রাস্তায় মায়ের ছোটাছুটি


আজাদ সুলায়মান ॥ গুলশানের রেস্তরাঁয় জিম্মির ঘটনায় ভেতরে আটকে থাকা প্রিয়জনদের খোঁজখবর নেয়ার জন্য সারারাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে বেশ কয়েক পরিবারকে। এক মা তার মেয়ের জন্য ঘটনার পর থেকেই হন্যে হয়ে ছোটেন এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। মেয়েটির সঙ্গে মা যদি এক সঙ্গে ওই রেস্তরাঁয় ঢুকতেন তাহলে তাকেও করুণ পরিণতির শিকার হতে হতো। ঘটনাক্রমে আধ ঘণ্টা পরে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়াতেই তিনি বেঁচে গেছেন।

এক ভাই রাতভর জিম্মিদের কবলে থাকা ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইলে এসএমএস বিনিময় করে খবরাখবর নিয়েছেন। কিন্তুু সকাল থেকে ভাইয়ের মোবাইলে আর মেলেনি সাড়া। শুক্রবার রাত পৌনে একটা থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত ছিল ওই এলাকায় স্বজনদের ব্যাকুল ছুটোছুটি।

দেশের শীর্ষস্থানীয় এলিগ্যান্ট শিল্প গোষ্ঠীর কর্ণধার রুবা আহমেদের কন্যা অবিনতা (১৯)। ঘটনাস্থল আর্টিজান রেস্তরা থেকে কয়েক গজ দূরে ৫০ নম্বর রোডের ১নং হাউসে তাদের বসবাস। অবিনতা লেখাপড়া করেন যুক্তরাষ্ট্রে। মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় আসেন। অবিনতা তিন বান্ধবীকে (একজন ভারতীয় ও একজন মার্কিন নাগরিক) নিয়ে আর্টিজানে প্রবেশ করেন। রাত তখন ঠিক সাড়ে আটটা। তাদের পারিবারিক গেট টুগেদারের আয়োজন ছিল সেখানে। তার মায়েরও সেখানে হাজির হবার কথা ছিল রাত নয়টায়।

অবিনতা বান্ধবীদের নিয়ে সেখানে প্রবেশের পর তাদের ব্যক্তিগত দুই গানম্যান বাইরে অবস্থান করছিলেন। তখনই শুরু হয় গ্রেনেড নিক্ষেপ। তাতে আহত হন তারা দুজন। এরপর অবিনতার মা রুবা আহমেদ আর ওই হোটেলে ঢুকতে পারেননি। বাইরে থেকে মা ফোনে কথাও বলেন একবার মেয়ের সঙ্গে। রাত নয়টার পর আর মেয়ের মোবাইল খোলা পাননি। বার বার কল করার পরও মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। রাতভর তিনি ঘটনাস্থলের কয়েক গজ দূরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কাটান। ব্যাকুল হয়ে ছুটেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। যখনই আর্টিজান রেস্তরাঁর দিক থেকে কোন গাড়ি আসে- তখনই তা থামিয়ে মেয়ের খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ তাকে সুখবর দিতে পারেনি। শনিবার সকাল দশটার সময় সেখানে গিয়ে দেখা যায়-সংবাদকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তখনও তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল-অবিনতা বেঁচে আছেন। বেলা যতই গড়িয়েছে ততই তার শঙ্কা বেড়েছে। বেলা দুটো বাইশ মিনিটে যখন তার চোখের সামনে দিয়ে ওই রেস্তরাঁয় একের পর এক এম্বুলেন্স ঢুকতে থাকে-তখন তিনি নিরাশ হয়ে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে আরও দূরে সরে যান। সেখান থেকে এম্বুলেন্সযোগে মরদেহ বের করে সিএমএইচএস নেয়ার সময় তাকে জানানো হয় দুঃসংবাদ। তাকে মেয়ের মরদেহ গ্রহণ করার জন্য সেখানে হাজির হবার জন্য পরামর্শ দেন তার এক সেনা কর্মকর্তা আত্মীয়।

রুবা আহমদ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, অবিনতা ওই রেস্তরাঁয় প্রবেশের পর বন্দুুকধারীরা একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। রুবার অফিস কর্মী খোকন জনকণ্ঠকে বলেন, ম্যাডাম বেঁচে গেছেন ভাগ্যের জোরে। তিনি ওই রেস্তরাঁয় অবিনতার সঙ্গে একত্রে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ঘটনাক্রমে তার যাওয়া হয়নি। তিনি রাত নয়টায় সেখানে মেয়ের সঙ্গে ডিনারে যোগ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার আগেই খবর আসে ভেতরে সন্ত্রাসী ঢুকেছে। তারা বোমা ছুড়ছে। সেই বোমার আঘাতে রুবা আহমেদের দুই গানম্যান আহত হয়েছে।

ভাইয়ের অপেক্ষায় ভাই

জিম্মির ঘটনায় ভেতরে আটকে থাকা এক ভাইয়ের সঙ্গে অপর এক ভাই রাতভর মোবাইল ফোনে এসএমএস বিনিময় করেছেন। হতভাগ্য ওই দু’ভাই হলেন সমীর ও গোপাল। গোপাল তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী। তার বড় ভাই সমীর বাবুর্চির কাজ করেন ওই আর্টিজান রেস্তরাঁয়।

সমীর প্রতি মুহূর্তে জানাচ্ছিলেন- ভেতরে বন্দুুকধারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কিভাবে কোথায় লুকিয়েছিলেন। জঙ্গীদের হাতে জিম্মি থাকা সমীরের সঙ্গে শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটা থেকে শনিবার সকাল সোয়া ছয়টা পর্যন্ত যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হন গোপাল। তারপর থেকে সমীর রেস্তরাঁর বাইরে০ অপেক্ষমাণ তাঁর ভাই গোপালের ক্ষুদে বার্তার আর কোন জবাব দেননি। বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষমাণ ভাই গোপাল রায় তাঁদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য জানিয়েছেন।

গোপাল জানান, হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় কিচেনে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেন তাঁর বড় ভাই সমীর রায়। ভাগনে রিন্টু কীর্তনীয়া (১৬) একই রেস্তরাঁয় কাজ করে। তাঁরা দুজন একই সঙ্গে ভেতরে একটি টয়লেটে জিম্মি হন। তবে সকালে রিন্টুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও সমীরের বিষয়ে কোন তথ্য পাননি গোপাল। রাত সাড়ে নয়টায় গোপাল প্রথম ফোন দেন সমীরকে। সমীর ফোন ধরেনি। গোপাল দ্বিতীয়বার ফোন দিলেও সমীর তা ধরেননি। রাত ১টা ৪৪ মিনিটে সমীর গোপালের পাঠানো খুদে বার্তার প্রথম জবাব দেন।

রাত পৌনে দুটোর সময় সমীর ফোনে জানান-তিনি আর ভাগ্নে রিন্টু ভাল আছেন। কিন্তু বন্দুুকধারীরা দরজা লক করে দিছে বাইরে থেকে।

এতে গোপাল তাদের সান্ত¡¡না দিয়ে বলেন-ডোন্ট ওরি। র‌্যাব সব দেখতেছে, আপনাদের যাতে ক্ষতি না হয়, তাই কিছু করতেছে না।

জবাবে সমীর বলেন- ছোট সুমন জানে আমাদের টয়লেট কোথায়। আমরা সেখানে। পারলে ওয়াল ভাঙ্গো।

প্রতিউত্তরে গোপাল লিখেন- ফেসবুক অন করেন। প্লিজ গিভ মি ওয়ান পিকচার।

রাত ২টা ১৫ মিনিটে গোপাল আবার এসএমএস পাঠান।

তাতে তিনি লিখেন-আপনারা টয়লেটে এক সাইড হয়ে বসেন। ওরা ফায়ার করতে পারে।

এভাবে সারারাত দু’ভাই একে অপরের সঙ্গে আত্মরক্ষার কৌশল নিয়ে এসএমএস বিনিময় করেন।

সকাল ৬টা ২২ মিনিটে গোপাল সর্বশেষ বার্তা পাঠান। তাতে লিখেন-প্লিজ বলেন এখন কেমন আছেন? কিন্তু সমীর আর জবাব দেননি। সেটাই ছিল শেষ জবাব।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: