২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জাতীয় বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন এসি রবিউল ওসি সালাহউদ্দিন


শংকর কুমার দে ॥ জাতীয় বীরত্বের স্বীকৃতি ও পুরস্কৃত করা হবে দেশের জন্য বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দেয়া দুই পুলিশ কর্মকর্তা এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিনকে। অসীম সাহসিকতায় জঙ্গী হামলা মোকাবেলার জন্য যে অনন্য নজির স্থাপন করে শহিদী মর্যাদা অর্জন করেছেন এজন্য গর্বিত সারা জাতি। রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নব্বর সড়কে লেকের পারে বিদেশীদের কাছে জনপ্রিয় হলি আর্টিজান বেকারিতে শুক্রবার রাতে ঢুকে পড়া সশস্ত্র জঙ্গী সদস্যদের মোকাবেলা করতে গিয়ে জঙ্গীদের ছুড়তে থাকা গুলি ও বোমার আঘাতে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ প্রশাসনে জনপ্রিয় দুই কর্মকর্তার অকালে ঝরে যাওয়ার বিয়োগান্তক ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সকল মহল। শ্বাসরুদ্ধকর বারো ঘণ্টার জঙ্গী সঙ্কট উত্তরণের আগেই প্রথম দফায় জঙ্গী হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উৎকণ্ঠার মধ্যে সর্বমহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। চোখের পানিতে চিরদিনের মতো বিদায় জানানোর হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্বজন ও সহকর্মীরা হাউমাউ করে কাঁদেন।

পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, শুক্রবার যখন গুলশানের লেকের পারে হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ঢুকে পড়েছে বলে খবর আসে তখন একযোগে পাঁচ থানার ওসির কাছে খবরটি পৌঁছানো হয়। ওয়্যারলেস সেটে ওসিরা একে অপরকে দোস্ত সম্বোধন করে ঘটনাস্থলে রওনা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে নিজেরাও রওনা দেন। জীবনে বহুবার অসীম সাহসিকতা দেখিয়ে পুরস্কৃত বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছেন এবং পরক্ষণেই আরেক দুর্ধর্ষ ডিবি অফিসার রবিউল তার সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে জঙ্গীদের তোপের মুখে পড়েন। দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের দল মনে করেছে, রমজান মাসের সাধারণ ডাকাত দল হয়ত হামলা করেছে এবং পুলিশ ও ডিবি দেখলেই তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিবৃত্ত হয়ে যাবে, যা সাধারণত অন্যান্য ক্ষেত্রে অহরহ ঘটছে। দুই পুলিশ কমকর্তা এতটুক আঁচ করতে বা বুঝতেই পারেননি যে, জঙ্গীরা বিভিন্ন দেশে যে কায়দায় হোটেল-রেস্তরাঁয় জিম্মি ও হামলা করে সহিংস সন্ত্রাসের মাধ্যমে রক্তাক্ত ঘটনা উপহার দিয়ে যাচ্ছে, তারই ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেও।

শুক্রবার রাতে এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিনÑদুই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের দল নিয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির সামনে যেতেই এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড-বোমা ছুড়তে থাকে জঙ্গীরা। জঙ্গীদের গ্রেনেড-বোমার স্পিøন্টারের আঘাতেই গুরুতর আহত হন ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন। তাদের গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেছেন, দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বোমার স্পিøন্টারের আঘাতে, গুলিতে নয়।

‘রবিউলের বুকের ডানপাশে স্পিøন্টারের আঘাত লেগেছে। তাতেই ফুসফুস ছিদ্র হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।’ রবিউলের শরীরে স্পিøন্টারের আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর ওসি সালাউদ্দিনের গলার ডানপাশে আঘাত লেগেছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার। দেশের স্বার্থে, মানুষের কল্যাণে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন বীরত্বের প্রতীক দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

জন্মের পর বাবার মুখ দেখবে না ॥ জন্মের পর পৃথিবীর আলো দেখলেও বাবার মুখ কোনদিনই দেখা হবে না গোয়েন্দা পুলিশের এসি রবিউল ইসলামের অনাগত দ্বিতীয় সন্তান। মাত্র মাসখানেক আগে গোয়েন্দা পুলিশে বদলি হয়ে আসার পর শুক্রবার রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত হন রবিউল ইসলাম।

রবিউলের ৭ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। স্ত্রী সন্তানসম্ভবা বলে জানিয়েছে তার পরিবার। শুক্রবার রাত এগারোটার দিকে পরিবারের সদস্যরা রবিউলের মৃত্যুর দুঃখজনক খবর পান। তারপরই তাদের গন্তব্য হয় ইউনাইটেড হাসপাতালের পথে। রবিউল নেই! এই খবর শুনে রবিউলের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী এখন পাগলপারা। কূটনীতিকপাড়ায় বিদেশী ক্যাফেতে হামলা চালিয়ে অনেককে জিম্মি করার খবর শুনেই ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিন। দু’জনই হামলায় নিহত হন। রবিউলের মৃত্যুর খবরে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। শোকে নির্বাক হয়ে গেছেন রবিউলের মা আর দাদি। তাদের সান্ত¡না দিতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশীরাও। রবিউল ইসলাম কাটিগ্রামের মরহুম আব্দুল মালেকের ছেলে। তার ছোট ভাই শামসুজ্জামান একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। গ্রামের বাড়িতে তার মা করিমুন্নেসা ও দাদি বসবাস করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে ইতালিতে পাড়ি জমান রবিউল। দুই বছর পর দেশে ফেরেন। ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। সামি নামে তার ৫ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী সালমা বেগম বর্তমানে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গ্রামের মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন রবিউল। কবি নজরুল ইসলামের নামে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘নজরুল ইসলাম বিদ্যাসিঁড়ি’র প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠান করেছেন ‘বুম বিশেষায়িত স্কুল’। এ স্কুলের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন রবিউল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষের প্রিয়মুখ রবিউল গত ২৪ জুন গ্রামের মানুষের মধ্যে যাকাতের কাপড় ও লুঙ্গি বিতরণ করেন। আগামী ৩ জুলাই ফের গ্রামে যাবার কথা ছিল তার। কিন্তু রবিউলকে তার গ্রামের মানুষের কাছে আসতে হচ্ছে শেষবারের মতো। রবিউলের বাড়ি মানিকগঞ্জের নয়াডিঙির কাটিগ্রামে। তার লাশ ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে জানাজা শেষে মানিকগঞ্জের গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

সালাউদ্দিনের স্বজনদের কান্না ও আহাজারি ॥ গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলায় নিহত বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে চলছে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের আহাজারি। শুক্রবার রাতেই ওসি সালাউদ্দিনের মৃত্যুর খবর পৌঁছে যায় গোপালগঞ্জ শহরের ব্যাংকপাড়ার বাসায়। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী ভিড় করতে শুরু করেন বাড়িতে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। ওসি সালাউদ্দিন গোপালগঞ্জ শহরের ব্যাংকপাড়ার মরহুম আব্দুল মান্নান খানের ছেলে। ৭ ভাই ৪ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই পরিবারের হাল ধরেন। সালাউদ্দিনের ছোট ভাই মোহাম্মদ আলী খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ভাই নিরপরাধ মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। আমরা এ হত্যার বিচার দাবি করছি।’

গোপালগঞ্জ জেলা উদীচীর সভাপতি নাজমুল ইসলাম বলেছেন, ওসি সালাউদ্দিন একজন সাহসী পুলিশ অফিসার ছিলেন। আর সাহসিকতার জন্যই তাকে অকালে জীবন দিতে হলো। এ জন্য শুধু গোপালগঞ্জ শহর নয়, জেলাবাসী শোকে কাতর। আমরা এ জঘন্য হত্যাকা-ের বিচার দাবি করছি।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ লুৎফর রহমান বাচ্চু বলেছেন, বিভিন্ন সময় সরকার উৎখাতের যড়ষন্ত্র প্রতিহত করতে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তাই এ হত্যায় জড়িত ও মদদদাতাদের বিচারের জন্য সরকারের কাছে দাবি করছি। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্টুরেন্টে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।

ময়নাতদন্ত ও জানাজা ॥ শনিবার বেলা এগারোটার দিকে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ও সালাউদ্দিনÑদু’জনের মরদেহ এ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে দুই পুলিশ কর্মকর্তার জানাজা বাদ আসর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অনুষ্ঠিত হয়। শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পৃথক দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইজিপিসহ পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিহত দু’জনের স্বজনরা অংশ নেন। দুপুর ২টার দিকে এ্যাম্বুলেন্সযোগে দু’জনের মরদেহ রাজারবাগে আনা হয়। পরে সেখানে মরদেহ দুটিকে গোসল করানো হয়।

নিহত রবিউল ইসলামের চাচা সামসুল ইসলাম মেহেদি বলেন, রাজারবাগে রবিউলের জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের কাটিগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আরও একটি জানাজা শেষে তার বাবার কবরের পাশে দাফন করা হবে। ওসি সালাউদ্দিনের প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ মোহাম্মদপুরের বাসায় নেয়া হয়। এরপর তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান তার বড় ভাই রাজিউদ্দিন খান।

সরকারের উচ্চ পর্যায় ও নীতিনির্ধারক মহলের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রবিউল ও সালাউদ্দিন-দুই পুলিশ কর্মকর্তা যে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন তাতে তাদের জাতীয় বীর হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে জঙ্গী মোকাবেলায় তাদের এই রক্তদান কোনদিনই যাতে বৃথা না যায় সেজন্য স্মরণীয়-বরণীয় করে রাখার সব ধরনের প্রয়াস গ্রহণ করা হবে।