১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক


বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর গুলশানে হোটেল হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে বলেছেন, এই বর্বর ও কাপুরুষোচিত আক্রমণ শান্তিপূর্র্ণ ও সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে নজিরবিহীন। সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে আমরা বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করবই ইনশাআল্লাহ। কোন ষড়যন্ত্রই আমাদের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে পারবে না। শনিবার রাত পৌনে আটটায় জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মুষ্টিমেয় বিপথগামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি, কমিউনিটি পুলিশ এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সন্ত্রাসী মোকাবেলায় এগিয়ে আসারও উদাত্ত আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যখন একটি আত্মমর্যাদাশীল এবং আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন দেশী-বিদেশী একটি চক্র বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বানচালের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। গণতান্ত্রিক পথে মানুষের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়ে এরা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ ষড়যন্ত্রকারীদের কৌশল বাস্তবায়িত হতে দেবে না। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে যে কোন মূল্যে আমরা ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত প্রতিহত করব। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আমরা যেকোন মূল্যে রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

রাজধানীর গুলশানে হোটেল হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসী হামলা এবং কমান্ডো অপারেশনের মাধ্যমে জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার পুরো রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেশী-বিদেশী নাগরিকদের জিম্মির ঘটনায় উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী সর্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, দফায় দফায় সামরিক-বেসামরিক উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে যেকোন মূল্যে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

গণভবনে গৃহীত কমান্ডো অপারেশন মাত্র কিছু সময়ের মধ্যে সফল হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তিবোধ করা প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কমান্ডো অপারেশন এবং জিম্মি উদ্ধারের ঘটনা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। এরপর বিকেল পর্যন্ত জিম্মিদের উদ্ধার, নিহত দেশী-বিদেশী নাগরিক এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে করণীয় সিদ্ধান্ত নিতেও সামরিক-বেসামরিক উর্ধতন কর্মকর্তা এবং সরকারের একাধিক মন্ত্রী-নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। সব শেষে সার্বিক পরিস্থিতি জাতির সামনে তুলে ধরতেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার এ ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বিপথগামীদের সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেন, অস্ত্রের মুখে নিরীহ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এরা দেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে চায়। গণতান্ত্রিক পথে ব্যর্থ হয়ে এরা কোমলমতি যুবক-কিশোরদের ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে মানুষ হত্যা করছে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনার সন্তানকে সুশিক্ষা দিন। তারা যাতে বিপথে না যায় সেদিকে নজর রাখুন। আর বিপথগামীদের প্রতি আহ্বান আপনারা সঠিক পথে ফিরে আসুন, ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখুন। পবিত্র ধর্মকে কলুষিত করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুক্রবার রাতে কতিপয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে হামলা চালায়। সেখানে অবস্থানরত নিরস্ত্র, বেসামরিক নাগরিকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং হত্যাকা- শুরু করে। পবিত্র রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যখন এশা ও তারাবির নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন এ হামলা ধর্ম ও মানবিকতাকে অবমাননা করেছে। এ বর্বর ও কাপুরুষোচিত আক্রমণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে নজিরবিহীন।

তিনি বলেন, হামলার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার সরকার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেয়। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত সেখানে পৌঁছায় এবং উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কমান্ডোরা অভিযানে অংশগ্রহণ করে আজ (শনিবার) সকালে জিম্মিদের মুক্ত করে আনে। তিনি বলেন, ৬ জন হামলাকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। তিনজন বিদেশীসহ ১৩ জন জিম্মিকে আমরা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সমর্থ হই।

প্রধানমন্ত্রী এ অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ারসার্ভিসসহ অন্যান্য বাহিনীর যেসব সদস্য অংশ নিয়েছেন তাদের ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ যারা একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এ নৃশংস হামলায় দুইজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আমি নিহত পুলিশ সদস্য এবং সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতরা দ্রুত আরোগ্যলাভ করুনÑ মহান আল্লাহ-তায়ালার কাছে এ প্রার্থনা করছি। নিহতদের স্মরণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করছি।

দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আমরা যেকোন মূল্যে রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মুষ্টিমেয় বিপথগামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি, কমিউনিটি পুলিশ এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সন্ত্রাস মোকাবেলায় এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব কোমলমতি যুবক-কিশোর বিপথে পরিচালিত হচ্ছে, যারা তাদের মদদ দিচ্ছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্নÑ মানুষকে হত্যা করে কী অর্জন করতে চান? ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের নামে মানুষ হত্যা বন্ধ করুন। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, আপনার সন্তানকে সুশিক্ষা দিন। তারা যাতে বিপথে না যায় সেদিকে নজর রাখুন। বিপথগামীদের প্রতি আহ্বানÑ আপনারা সঠিক পথে ফিরে আসুন। ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখুন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসীদের সমূলে নির্মূল করে আমরা বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করবই ইনশাআল্লাহ। কোন ষড়যন্ত্রই আমাদের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে পারবে না। আসুন আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করি।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: