১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রধানমন্ত্রী শুনবেন কি বাবুল আক্তারের অব্যক্ত কথা?


দুঃখিত বাবুল ভাই, নিশ্চুপ থাকা সম্ভব হলো না। রবিবার সকাল থেকে হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, মধ্যরাতে বাসায় ফিরে তা যেন আরও বাড়ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছিলাম না। শুধুই কান্না পাচ্ছিল। চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছিল চমেক হাসপাতালে এক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আখতারের বুকফাটা আর্তনাদ।

ঘনিষ্ঠজনদের মতো আমার কাছেও জানতে চাওয়া ‘দিদার তোর ভাবি কই? তোর ভাবিরে আইনা দে।’ ঘুমোতে যাওয়ার চেষ্টার সঙ্গে কর্ণকুহর প্রকম্পিত হচ্ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর এ শীর্ষ কর্মকর্তার প্রিয়তম স্ত্রীকে হারানোর অভিব্যক্তি।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে বাবুল আক্তারের সঙ্গে পরিচয় বেশ ক’বছরের। পরিচয়ের সূত্রে কাছাকাছি আসার সুযোগও হয়েছে আমার। অনেক বিষয়ে কথাও হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যও পেয়েছি, যা দিয়ে দেশে, বিদেশে আলোচনায় আসার মতো ‘বড় সংবাদ’ হতে পারত। বিশ্বাস করে জানালেও বারণ করেছিলেন সংবাদ করতে। আজ কেন যেন আর নিজেকে ওই বারণের গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারলাম না।

কথাগুলো বলা দরকার, জানানো দরকার কাউকে না কাউকে। আমি চাইলেও সেটা তো আর সম্ভব নয়। সেজন্য পত্রিকার ‘মুক্তমতে’ দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আপনার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে বর্বরোচিত কায়দায় খুনের মাধ্যমে শুধু একজন মা, স্ত্রী কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে আক্রমণ করা হয়নি। এটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য একটি ক্লিয়ার ম্যাসেজ! সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই! দেশ কোন্দিকে যাবে? রাজনৈতিক যোগসূত্র খুঁজে সময় ব্যয় নাকি জঙ্গীবাদের মূল উৎপাটন?

জঙ্গীবাদের মূল উৎপাটনে চাই সাহসী, মেধাবী ও নির্লোভ কিছু কর্মকর্তা। সে রকমই এক কর্মকর্তা এসপি বাবুল আক্তার। সম্প্রতি জঙ্গীবিরোধী অভিযানে নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা। ওসব অভিযানে বৈরী পরিস্থিতি সম্পর্কে তার টিমের সদস্যরা বুঝেছেন সরেজমিনে সঙ্গে থেকে। দূরে থেকে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে কিছুটা অবগত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমারও।

জঙ্গীবিরোধী অভিযানে এ পুলিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে নির্ভীক এ পুলিশ কর্মকর্তা এগিয়েছেন। দেশকে জঙ্গীমুক্ত করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেয়া কঠিন। উন্নয়নের ও প্রগতির পথে জঙ্গীরা বাধার প্রাচীর গড়ে তুলতে চায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার ক্ষমতার মেয়াদের গত ৮ বছরে তা অনুধাবনও করেছেন। আপনার নেতৃত্বে দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আপনার সরকারের প্রতিনিধি হয়ে জঙ্গী নির্মূলের অন্যতম সৈনিক হিসেবে কাজ করে চলেছেন পুলিশের অকুতোভয় এ কর্মকর্তা।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর হাটহাজারীর আমানবাজারে আস্তানায় হানা দিয়ে জঙ্গীদের ব্যবহৃত বিশেষ কিছু পোশাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাবুল আক্তার। ‘উপরের মহলের’ কথা বলে পরে তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর পর বেশ ক’দফায় পদক্ষেপ নিয়েও চট্টগ্রামে জঙ্গীবিরোধী কোন অভিযানই করতে পারেননি তিনি। কারণটি খুঁজে বের করা দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রকৃত কারণ আপনার জানা দরকার। অবশ্য এটি পুরোপুরি বলতে পারবেন বাবুল আক্তার।

আমানবাজারের ঘটনায় নানামুখী চাপের মধ্যেও ওই জঙ্গী আস্তানায় পাওয়া আলামত ও জঙ্গীদের সঙ্গে মোবাইলে কথোপকথনের তথ্য- প্রমাণের ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তির নামের একটি তালিকা আইজিপিকে দিয়েছিলেন বাবুল আক্তার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া হবে আইজিপি তাকে আশ্বস্তও করেছিলেন। কিন্তু এরপর একটি বিশেষ অভিযান হয়েছে জানলেও মূল জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

চলতি বছরের শুরু থেকে বাবুল আক্তারেরই দেয়া সূত্র ব্যবহার করে দেশের উত্তরাঞ্চলে একাধিক জঙ্গী ধরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি শেরপুরে জঙ্গী আস্তানায় বোমা বানাতে গিয়ে নিহত দুইজনের মধ্যে একজনের পরিচয় মিললেও অজ্ঞাতনামা যাকে দাফন করা হয়েছে সেই জঙ্গীই যে জেএমবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ফারদিন সেটি নিশ্চিত করেছেন এই বাবুল আক্তারই। কেননা, ফারদিনকে বাংলাদেশ পুলিশের আর কেউ চিনতেন না।

দুই মাস আগে দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জেলায় জেএমি সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি চিঠিতেও চট্টগ্রামে অভিযানের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জাবেদের ‘হত্যার প্রতিশোধ’ নেয়াকে ঈমানি দায়িত্ব উল্লেখ করে জঙ্গীরা। ওই চিঠিতে চট্টগ্রামে জঙ্গীবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের হত্যা করার আদেশ দেয়া হয়। পুলিশ সদর দফতর হয়ে ওই চিঠি সিএমপিতে এলেও কেন নিরাপত্তা দেয়া হলো না হুমকিতে থাকা বাবুল আক্তারের পরিবারকে?

পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামে জঙ্গী দমন এবং চট্টগ্রামের প্রতি বিশেষ ভালবাসার কারণে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিসি-উত্তর) পদে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বাবুল আক্তারকে ঢাকা সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। কেন এ বদলি তাও জানা দরকার। তিনি নিজ এবং পরিবার নিয়ে সব সময় জঙ্গী আক্রমণের আশঙ্কা করতেন। তবে দেশ ও বাহিনীতে দায়িত্বরত সহকর্মীদের স্বার্থেই সেটি কখনও প্রকাশ করেননি। ঢাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় পাঁচলাইশ থানার ওসিকে মৌখিকভাবে পরিবারের সদস্যদের প্রতি নজর রাখতে বললেও কেন তা প্রতিপালন হলো না, জানা দরকার। যেটি চমেক হাসপাতালে স্ত্রীর মৃতদেহ দেখতে এসে বাবুল আক্তার পাঁচলাইশের ওসিকে খোঁজ করে জানতে চেয়েছেন। এসপির পরিবারের নিরাপত্তায় থানায় জিডি করলেই কি তার পরিবার সুরক্ষা পেতেন? আর সেটি কি তখন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সমালোচনাকে আর উসকে দিত না?

আর হ্যাঁ, যেটি বলতে চেয়েছিলাম। দেশের জঙ্গীবাদের প্রাথমিক লেভেল নিজের এ্যান্টেনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাবুল আক্তার দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছে গেছেন। এখন প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে তার মানসিক অবস্থা কি রকম সেটি বুঝে নেয়া কষ্টকর নয়। তবে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে বলতে পারি তিনি হারবেন না, ভাঙবেনও না। শুধু দ্বিতীয় স্তর নয়! কারা এই জঙ্গীবাদের মদদদাতা? কারা অর্থদাতা? কোন্ দেশের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত সেটিও হয়ত তার কাছে অজানা নয়!

তবে তিনি বার বার বলেছেন, সব জায়গায় আমার পক্ষে হাত দেয়া সম্ভব নয়! অনেককে আমি ধরলেও রাখতে পারব না! হয়ত উপরের মহলও বিস্মিত হয়ে যাবে তাদের মুখ দেখে! তবে কোন্ উপরের মহল? সেটি কখনও পরিষ্কার করেননি তিনি।

এ পুলিশ কর্মকর্তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, পুরো দেশ থেকে জঙ্গীবাদ নির্মূল করতে আপনাকে যদি বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়। যখন যাকে তাকে গ্রেফতার, যেখানে সেখানে অভিযানের অনুমতি ও সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া হয়। আর বিষয়গুলো সরাসরি পুলিশ প্রধানের সঙ্গে সমন্বয় করা ছাড়া অন্য কোন মাধ্যম থাকবে না। তা হলেই ভাল একটি আউটপুট আসবে বলে মনে হয়। জবাবে বাবুল ভাই বলতেন, ‘এটি সিনেমায় না হয় বিদেশে সম্ভব।’

জঙ্গী দমন করতে গিয়ে যিনি নিজের প্রিয়তমাকে হারিয়েছেন (বাবুল আক্তার)। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সদ্য স্ত্রী হারানো এ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা দরকার আপনার। জঙ্গী দমন করতে গিয়ে পদে পদে বাধার অজানা সব তথ্যও আপনার জানা দরকার। জঙ্গী দমন চাইলে সে অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে আপনার সরকারকে। প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তাকে মাঠে নামান। আমার বিশ্বাস, জঙ্গী নির্মূলে সফলতা আসবে।

আমি জানি না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার এ আবেদন আপনার দৃষ্টিতে আসবে কি-না। তবে আজকে সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেয়ার, দেশ কাদের? জঙ্গীদের, না আমার কিংবা আমাদের?

-বাংলা মেইলের সৌজন্যে

সম্পর্কিত: