২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গুলশানে বন্দুকধারীদের হামলা ॥ ডিবির এসি ও বনানী থানার ওসিসহ হত ৪


গুলশানে বন্দুকধারীদের হামলা ॥ ডিবির এসি ও বনানী থানার ওসিসহ হত ৪

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি বিদেশী রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসীদের হামলা ও জিম্মির ঘটনায় বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে রাজধানী গুলশান দুই নম্বরের ৭৯ নম্বর রোডের একটি রেস্তরাঁর ভেতর বিদেশী নাগরিকদের জিম্মির ঘটনায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ২০ জন বিদেশী নাগরিকসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন নাগরিক জিম্মি হয়েছেন। এছাড়া পুলিশ সদস্যসহ ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুর্বৃত্তরা ওই রেস্তরাঁয় ঢুকে অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে বলে জানা যায়।

ঘটনার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজ নিজ নাগরিকদের সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। জিম্মি উদ্ধারে রাত সোয়া একটার দিকে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডোরা অভিযানে নেমেছেন।

রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারি নামের একটি রেস্তরাঁয় রাত সোয়া নয়টার দিকে প্রায় ৮ থেকে ১০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল প্রবেশ করে। স্প্যানিশ এই রেস্তরাঁয় তারা প্রবেশ করে রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়া বিদেশী নাগরিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। এই সময় তারা আল্লাহু আকবার বলে ধ্বনি দেয়। খবর পেয়ে গুলশান ও বনানী থানা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রেস্তরাঁয় প্রবেশ করার সময় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম নিহত হয়েছেন। দুই বিদেশী নাগরিক মারা গেছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন।

গুলশানের রেস্তরাঁয় জিম্মি বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে চারজন জাপানী নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যান্য বিদেশী নাগরিকদের সঙ্গে এই চার জাপানী নাগরিকও সেখানে খেতে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। রেস্তরাঁয় জিম্মি উদ্ধারে রাত সোয়া একটার দিকে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডোরা ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অভিযানে নেমেছে। এতে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর কমান্ডোরা অংশ নেন। রাত দেড়টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় তারা জিম্মি উদ্ধারে অভিযানে নেমেছিলেন।

হলি আর্টিজান বেকারির সুপারভাইজার সুমন রেজা রাত পৌনে বারোটার দিকে গণমাধ্যমকে জানান, রাত নয়টার দিকে ৮ থেকে ১০ জন যুবক অতর্কিতে হলি আর্টিজানে ?ঢুকে পড়ে। তাদের একজনের হাতে ছিল তলোয়ার, বাকিদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র। ঢুকেই তারা কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে এবং আল্লাহু আকবার বলে চিৎ?কার করে। তখন ভেতরে ২০ জনের মতো বিদেশী না?গরিক ছিলেন। সুমন ও হলি আর্টিজানের আরেকজন কর্মী যিনি ইতালির নাগরিক দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে বাইরে আসেন।

সুমন রেজা জানান, আমি ছাদে ছিলাম। ওরা যখন বোমা মারতে ছিল, তখন বিল্ডিং কাঁপতে ছিল। ওরা ১০-১২টা বোমা মারছে। মারতেই আছে, মারতেই আছে। ওরা সামনের দিকে স্টেপ নিচ্ছিল মনে হচ্ছিল। তখন ছাদ থেকে লাফ দেই। তিনি বলেন, ভেতরে থাকা আমাদের কর্মীরা ফোন ধরতেছে না। আমাদের স্টাফদের মধ্যেও দুজন বিদেশী। আর্জেন্টাইন কর্মীর কোন খোঁজ নেই।

গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, খবর শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। গুলশান জোনের উপ-কমিশনারের (ডিসি) নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকাটিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশ ধীরে ধীরে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানে দুর্বৃত্তরা পুলিশের ওপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এছাড়া দুর্বৃত্তরা হামলার সময় আল্লাহু আকবার ধ্বনি দেয়।

রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহত হন। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হলে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানেই তিনি মারা যান। এদিকে সিএনএন-এর এক খবরে বলা হয়েছে, ঘটনায় তিনজন মারা গেছেন। এরমধ্যে দুই জন বিদেশী কূটনীতিক রয়েছেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রেস্তরাঁয় বিদেশী নাগরিকরা জিম্মি ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির খবর দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে গুলশান দুই নম্বরের কাছে হলি আর্টিজান বেকারি, লেকভিউ ক্লিনিক ও নর্ডিক ক্লাবের খুব কাছে গোলাগুলি শুরু হয়। হোটেল আর্টিজান বেকারির একজন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মচারী জানান, সন্ত্রাসী যারা ভেতরে প্রবেশ করেছে, তাদের মুখে কোন দাড়ি নেই। তারা ছিল ক্লিন সেভড। যখনই পুলিশ তাদের ওপর এ্যাকশন চালায়, তখনই তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে পুলিশের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায়।

সূত্র জানায়, হলি আর্টিজান হোটেল এ্যান্ড বেকারি কয়েকজন বিদেশী শেফ কাজ করেন। এছাড়া এই হোটেলে প্রায় ২০ জন বিদেশী কাস্টমার ছিলেন।

পুলিশ জানায়, সন্ত্রাসীরা সেখানে অবস্থান করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ রেস্তরাঁয় প্রবেশ করতে চাইলে সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপর আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি চালায়। এতে পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের দফায় দফায় গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে।

ওই এলাকায় থাকা একটি বিদেশী দূতাবাসের একজন কর্মী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনিও গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন। ৭৯ নম্বর রোডের শেষ মাথায় অবস্থানরত এক বাড়ির এক বাসিন্দা জানান, পুলিশ নিচ থেকে বলে উপরে কেউ থাকলে যেন বেরিয়ে আসে। এর কিছুক্ষণ পরই আবার লাউড স্পীকারে বলা হয়, সবাই যেন ভেতরে থাকে, বের না হয়। তবে কাদের বলেছে, কেন বলেছে সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। এই অবস্থার মধ্যে তারা আতঙ্কের মধ্যে আছেন বলে জানান।

রাত সোয়া ১১টার দিকে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, সন্ধ্যার পরে এখানে একটি স্প্যানিশ রেস্তরাঁয় অনেক লোকজন খেতে আসে। কয়েকজন অস্ত্রধারী ভেতরে প্রবেশ করেছে। আমাদের কাছে এটাই খবর। রেস্তরাঁর যেসব কর্মচারী বের হয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এবং আমরা এখন চেষ্টা করছি শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সমাধান করতে। এ বিষয়ে আমরা আপনাদের সহায়তা চাই। তিনি বলেন, যারা ভেতের আছে, রেস্তরাঁয় খেতে এসেছেন। তাদের জীবনের নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। যারা বিপথগামী লোকজন ভেতরে আছে, তাদের সঙ্গে আমরা কথাবার্তা বলতে চাই।

বেনজীর আহমেদ বলেন, আমি সবাইকে বলব আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সেখানে যারা অস্ত্রসহ ঢুকেছিল, আমি আবারও বলতে চাই তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে চাই, কন্ট্রাক করতে চাই। এবং তাদের সমস্যা আমরা শুনতে চাই। শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চাই। এটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি জীবন আমাদের কাছে মূল্যবান।

কতজন আক্রমণকারী জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদ সাংবাদিক?দের বলেন, আমি কোন আনুমানিক সংখ্যা বলতে চাই না। আমরা বলতে চাই রেস্তরাঁয় কিছু কাস্টমার খাওয়ার জন্য এসেছিলেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা আলোচনা করতে চাই। আমরাই আপনাদের টাইম টু টাইম আপডেট দেব। যারা জিম্মিকারী তাদের গুলি করা হয়েছে কি না এর জবাবে র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, এই পর্যায়ে আমি এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

সূত্র জানায়, গুলশানে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় পুলিশ কনস্টেবল আলমগীর (২৬) প্রদীপ (২৮) ও মাইক্রোবাস চালক আবদুর রাজ্জাক (৩২) মারাত্মক আহত হয়েছেন।

সূত্র জানায়, গুলশান দুই নম্বর এলাকা কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও বিদেশী নাগরিকের আবাস রয়েছে। এছাড়া এই এলাকায় বেশ কিছু বিদেশী রেস্টুরেন্টও রয়েছে। এই এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের জন্য বিদেশী কূটনৈতিকরা আগে থেকেই সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী ওই এলাকায় সরকার থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তবে শুক্রবার ঘটনার পরে গুলশান ও বনানীর পুরো এলাকা কর্ডন করে রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কতা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেস্তরাঁর ভেতরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন নাগরিক জিম্মি রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বিদেশী নাগরিক। তারা রাতের খাবার খেতে সেখানে ঢুকেছিলেন।

ঘটনার পর পরই গুলশান-এক নম্বরের চেকপোস্টে দায়িত্বরত এএসআই এরশাদ বলেন, আমরা খবর পেয়েছি, অবৈধ অস্ত্রধারীরা এ এলাকায় প্রবেশ করেছে। নিরাপত্তার খাতিরে আমরা রাস্তা বন্ধ করেছি, যাতে কোন অপরাধী পালাতে না পারে। স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, অন্তত প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছুড়ার শব্দ শোনা গেছে।

লেকভিউ ক্লিনিকের খুব কাছে ৭৯ নম্বর রোডের ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা। আকাশে টহল দেয় র‌্যাবের হেলিকপ্টার। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ১০ পুলিশ সদস্যকে আহত অবস্থায় সরিয়ে নিতে দেখা গেছে, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনায় আহত ১৫ থেকে ২০ জনকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হয়। এছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কয়েকজনকে ভর্তি করা হয়। ইউনাইটেড হাসাপাতালে মারা যান ওসি সালাহউদ্দিন। আর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়ার সময় মারা যান পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম।

শুক্রবার রাতে ওই ঘটনার পরপরই ঢাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে পৃথক বিবৃতিতে নিজ নিজ নাগরিকদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে গুলশানের এই ঘটনার দায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাসের কর্মী নিরাপদে ॥ গুলশানে সশস্ত্র বন্দুকধারীদের হামলার পর ঢাকার মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাসের সকল কর্মী নিরাপদে আছেন বলে এই দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জন কিরবি ওয়াশিংটনে এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ঢাকার গুলশানে একটি রেস্তরাঁয় বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনায় কারা জড়িত তা এখনও জানা যায়নি। কী উদ্দেশে তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে এখনো তথ্য মেলেনি। তিনি পরিস্থিতিকে ‘এখনও পরিবর্তনশীল’ বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে ভারতের বেসরকারী টিভি চ্যানেল এডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকায় তাদের দূতাবাসে সকল কর্মী নিরাপদে আছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমাদের হাই কমিশন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: