২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মিতু হত্যার নির্দেশদাতা চিহ্নিত হয়নি, চলছে অপপ্রচার


মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে আরও ২ জনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ নিয়ে বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ৮ জনে। দুর্বল তদন্তের কারণে এর মধ্যে ২ জনকে এ মামলা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ সিএমপি কমিশনার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সর্বপ্রথম যে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তারা এ মামলায় সম্পৃক্ত নয় বলে জানিয়েছেন। তবে বর্তমানে হত্যা মামলার গ্রেফতারকৃত ৬ আসামির মধ্যে ২ জন ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে। এরপর গত মঙ্গলবার গ্রেফতার হওয়া ভোলা ও মনির হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত এ আবেদনের শুনানি আগামী ১৭ জুলাই নির্ধারণ করে আসামিদের জেলহাজতে প্রেরণ করেছে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সর্বশেষ গ্রেফতার করা হয়েছে শাহজাহান মিয়া ও সাইদুল ইসলাম সিকদার প্রকাশ সাকুকে। এই দু’জন আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার মোঃ কামরুজ্জামান। শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম আদালতের বিচারক নওরীন আক্তার কাকনের আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত ঈদের পর শুনানি হবে এমন সিদ্ধান্তে এ দুই আসামিকেও জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। গ্রেফতারকৃত শাহজাহান মিয়া গত ৫ জুন মিতু হত্যার ঘটনার আগ মুহূর্তে ওই এলাকায় অন্যান্য আসামিদের সহযোগিতায় রেকির কাজ করেছে। অপর আসামি সাইদুল এ হত্যাকা-ের ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সরবরাহ করেছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বরে মোটরসাইকেলটি তার ভাই কামরুল ইসলাম সিকদার প্রকাশ মুসাকে সরবরাহ করার বিষয়টি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবাবন্দীতে ওয়াসিম ও আনোয়ার এই দুই আসামির কথাও জানিয়েছে আদালতকে।

অভিযোগ উঠেছে, এসপি বাবুল আক্তার জঙ্গী, নাশকতা ও রাহাজানি এমনকি বিভিন্ন অপরাধ বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করায় এরই জের ধরে বাবুল আক্তারকে চক্রান্ত করে মামলায় অভিযুক্ত করার চেষ্টা চলছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, যেখানে গত ৫ জুন মিতু হত্যার পর থেকে বাবুল আক্তার ঢাকার খিলগাঁওস্থ শ্বশুরের বাসায় অবস্থান করছেন এমনকি শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও কোন ধরনের অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হয়নি বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠেছে, বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশারফ হোসেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এমনকি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবেও বাবুল আক্তারকে এখনও পর্যন্ত কোন ধরনের সন্দেহের চোখে দেখেননি। কিন্তু এরপরও পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে ফাঁসানোর জন্য একদিকে যেমন অপতৎপরতা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা বাবুল আক্তার এ ঘটনায় জড়িত রয়েছে কিনা এমন তথ্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটির সদস্যদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ মহল ধারণা করছেন, বাবুল আক্তার যেহেতু জঙ্গী ও নাশকতা দমনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশের পদকও অর্জন করেছেন যোগদানের মাত্র এগার বছরের চাকরি জীবনে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সহকারী কমিশনার থেকে পুলিশ সুপার হওয়ার মতো যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এমনকি প্রশাসনকে অপরাধী দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা দেখিয়েছেন। এ ধরনের দায়িত্বশীল ও চৌকস কর্মকর্তা পুলিশ বিভাগে রয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে ঈর্ষান্বিত হয়ে চট্টগ্রাম থেকে বাবুল আক্তারকে তাড়ানোর পাঁয়তারা করেছিল সিএমপির পুলিশ বিভাগের একটি চক্রÑ এমন অভিযোগও চাউর হয়েছে হত্যাকা-ের পর। এদিকে, চট্টগ্রাম আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দীতে ওয়াসিম ও আনোয়ার এমন কোন স্বীকারোক্তি দেয়নি যাতে বাবুল আক্তার এ ঘটনার সঙ্গে কোন না কোনভাবে জড়িত আছে। তাছাড়া ১৬৪ ধারায় মোট ২৪ পৃষ্ঠার জবানবন্দীতে ওয়াসিম ও আনোয়ার বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার বিষয়ে কোন ঈশারাও দেয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের একটি চক্র যারা ৫ কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন এবং ঢাকায় উর্ধতন কর্মকর্তাদের থেকেও একটি মহল বাবুল আক্তারকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে বা পদত্যাগপত্র নেয়া হচ্ছে এমনকি বাবুল আক্তারকে আসামি করার মতো সন্দেহের তীর রয়েছে বলে গুজব ছড়াচ্ছেন। এসব কর্মকর্তাদের কারণেই মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে বাবুল আক্তার তার স্ত্রী মিতুকে হত্যাকা-ে পরিকল্পনাকারী অথবা নির্দেশদাতা হিসেবে। এর মূল কারণ হচ্ছে হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা বাবুল আক্তারের সোর্র্স কামরুল ইসলাম সিকদার প্রকাশ মুসা জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায়। তবে মুসা শুধু বাবুল আক্তারেরই সোর্স ছিল এমন নয়, ২০০০ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসার পর মুসা ছিল মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মৃত্যুদ- পাওয়া সাকা চৌধুরীর একনিষ্ঠ কর্মী। যে কিনা ফটিকছড়ি এলাকায় বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জামায়াত-বিএনপির আমলে বিত্তশালী বনে গেছে। এছাড়াও মুসা ছিল বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সোর্স। সুতরাং কার নির্দেশে মুসা এ পরিকল্পনা করেছে তা এখন উদঘাটনের অপেক্ষায়। তবে এ পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য এসেছে তাতে মুসার সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে ঠিকই, এক্ষেত্রে বাবুল আক্তারের কোন বিষয় উঠে আসেনি। তবে জঙ্গী ও নাশকতার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিল তারা কোন নীলনক্সা করে বাবুল আক্তারের স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে বাবুল আক্তারকে ফাঁসানোর কোন চক্রান্ত করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, এ ধরনের চক্রান্তে যদি বাবুল আক্তার ফেঁসে যায় তাহলে পুলিশ বিভাগের যেমন বদমান হবে তেমনি প্রশাসনের প্রতি সাধারণের ঘৃণাও জন্মাবে।

এদিকে, সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের ৫ কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রথম দফায় মিতু হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে এমন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল হাটহাজারীর পশ্চিম ফরহাদাবাদ গ্রামের মুসাবিয়া দরবার শরীফের কেয়ারটেকার আবু নসর গুন্নুকে। এরপর বায়েজিদ থানাধীন শীতলঝর্না আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল শাহ জামান রবিনকে। তবে গত ২৬ জুনের প্রেস কনফারেন্সে সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার এ দুই আসামিকে মিতু হত্যার মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এ দুই আসামিকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে এমনকি তাদের কেন জেলে পুরে রাখা হয়েছে। কারণ, গুন্নু গ্রেফতারের পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের ডিসি মোস্তার হোসেনের বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ উঠে। এ অভিযোগের পর মোক্তার হোসেনকে এ মামলার তদারকি থেকে বাদ দেয়া হয়। সর্বশেষ গত বুধবার মোক্তার হোসেনকে সিএমপি থেকে ভোলায় এসপি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আগামী ১০ জুলাই মোক্তার হোসেন ভোলার এসপি হিসেবে যোগদানের কথা রয়েছে।

এদিকে, রবিনকে গ্রেফতার করা হলেও রবিনের বাবা কুমিল্লার লাসকাম এলাকার একজন ঠিকাদার। তার নাম শাহজাহান। ঠিকাদারের এ ছেলেও মিতু হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত নয় বলে মিডিয়াকে জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার। কিন্তু গত ১২ জুন আইজিপির নির্দেশে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে ৩৫ সদস্যের যে ৫টি টিম গঠন করা হয়েছে তাদের তথ্য উদঘাটন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, সঠিক তথ্য উপাত্ত না থাকার কারণে গুন্নু ও রবিনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে ঢুকিয়ে দেয়ার মতো অমানবিক ঘটনা সিএমপির ইতিহাসে নেই। তবে এ হত্যা মামলায় এই দুজনের সম্পৃক্ততা না থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের কেন ছেড়ে দেয়া হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্নের উত্তর দেননি সিএমপি কমিশনার।

অপরদিকে, ঘটনাস্থল থেকে মিতুর যে মোবাইলটি দুর্বৃত্তরা নিয়ে গেছে এমনকি শুলকবহর এলাকা থেকে মিতুর মোবাইল থেকে যে শেষ কলটি করা হয়েছিল তা ছিল হাটহাজারীর কোন এক ব্যক্তির কাছে। তদন্ত টিমের সদস্যরা এ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পেরেছে কিনা তা সন্দিহান। সর্বশেষ গত ২২ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত বাবুল আক্তারের বাসায় থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ কালেকশন করেছে গোয়েন্দা বিভাগের ওইসব টিমের সদস্যরা এমন তথ্য পাওয়া গেছে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ থেকে।

মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মিতু হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনে গোয়েন্দা বিভাগের ৫টি টিম ছাড়াও সিআইডি, পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। ঘটনার সঙ্গে ৭-৮ জন জড়িত থাকার বিষয়টি চিহ্নিত করেছে ৫ তদন্ত টিমের সদস্যরা। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ জনকে গ্রেফতার দেখালেও মিতু হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ৬ জনকে এ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এরা হলো- ওয়াসিম, আনোয়ার, ভোলা, মনির হোসেন, শাহজাহান মিয়া ও সাইদুল ইসলাম সিকদার প্রকাশ সাকু। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে রাঙ্গুনীয়া থানাধীন ইসলামপুর এলাকা থেকে মিতু হত্যা মামলার আসামি শাহজাহান মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তার সূত্র ধরে ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মোটরসাইকেলের সরবরাহকারী সাইদুলকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে মিতু হত্যাকা-ের সঙ্গে তারা জড়িত।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার মোঃ কামরুজ্জামান জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ভোলা, মনির হোসেন, সাইদুল ও শাহজাহান মিয়াকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ভোলাকে অস্ত্র ব্যবহারকারী ও মনিরকে অস্ত্র সংরক্ষক হিসেবে রিমান্ডে আনার আবেদন করা হয়। এছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার হওয়া সাইদুলকে মোটরসাইকেল সরবরাহকারী হিসেবে ও শাহজাহানকে ঘটনার সময় রেকি করার বিষয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হলেও আদালত ঈদের পর রিমান্ড শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: