মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আল বিদা মাহে রমজান

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৬

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক ॥ আজ মাহে রমজানের ২৬তম রজনী। পবিত্র ও মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর। রমজানের লাইলাতুল কদর মুসলিম জীবনে এক অতি পুণ্যময় ও অনন্য রজনী। যে পাঁচটি রাতকে মহান আল্লাহপাক অফুরন্ত বরকত প্রদান করেছেন, তার মধ্যে লাইলাতুল কদর এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। বিশেষত এ রজনী হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে সূরা কদরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রাতের ফযিলত ও মহাত্ম্য সম্বন্ধে হযরত সালমান হতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, মহানবী (স) শাবান মাসের সমাপনী দিবসে আমাদের নসিহত করেন এবং বলতেন, তোমাদের মাথার উপর এমন এক মর্যাদাশালী মোবারক মাস ছায়াপাত করেছে যার মাঝে রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’- মানে একটি রাত, যা হাজার মাস হতেও উত্তম। আজ দিনের অবসানে আমাদের সামনে সে মহিমান্বিত রজনী।

কোরান নাজিলের মহিমায় ভাস্বর এ রাত রমজানের শেষ দশকে অবস্থিত বলে এটা মাগফিরাত বা গুনাহ মাফের দশক হিসেবে বিঘোষিত হয়েছে। হযরত আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত বুখারী শরীফের হাদিস থেকে জানা যায় যে, হযরত রাসূলে মাকবুল (স) রমজানের শেষ দশকে শক্ত করে কাপড় বেঁধে রাতভর জেগে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন এবং তার পরিবারকেও জাগাতেন। হযরত কা’ব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, সপ্তম আকাশে জান্নাতের অদূরে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক গাছের মাঝামাঝি হযরত জিব্রাইলের (আ) নিবাস। আবার উক্ত গাছের শাখা-প্রশাখায় বাস করেন অসংখ্য অগণিত ফেরেস্তা। মু’মিনদের প্রতি স্নেহপরায়ন এসব ফেরেস্তা জিব্রাইলের (আ) নেতৃত্বে এ রাতে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক সুর্যাস্তের পরপরই পৃথিবীতে অবতরণ করেন; ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। কিন্তু মুশরিক, জাদুকর, নেশাখোর, জিনাকার, আত্মীয়ের প্রতি অনুদার প্রভৃতি খারাপ লোক এবং ময়লা আবর্জনাযুক্ত অপবিত্র স্থান থেকে দূরে থাকেন। পক্ষান্তরে মু’মীনদের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করে সারারাত দোয়া করতে থাকেন আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছাতে থাকেন ইবাদতে মশগুল সকল মু’মীনের কাছে।

বিশিষ্ট রাসূল প্রেমিক শ্রেষ্ঠ হাফেজে হাদিস হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রমজান মাসের শুভাগমন হলে আল্লাহর নবী (স) বলতেন, তোমাদের মধ্যে মোবারক মাস মাহে রমজান এসেছে। আল্লাহ জাল্লে জালালুহ তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন, বেহেস্তের দ্বারগুলো খুলে দিয়েছেন, দোজখের দরজায় তালা লাগিয়েছেন আর শয়তানদের করেছেন শিকলাবদ্ধ। এ মাসে এমন এক রজনী রয়েছে, যা সহস্র রজনী হতে উত্তম। যে ব্যক্তি এ মাসের খায়ের ও বরকত থেকে বঞ্চিত (যেন) সে সবকিছু থেকে বঞ্চিত। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হুজুর (স) এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান ও আত্মশুদ্ধির মনোভাব নিয়ে এ রাতে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকেন আল্লাহ তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর পৃ: ৫১৩)।

লাইলাতুল কদরের তারিখ নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও রমজানের শেষ দশকের যে কোন বিজোড় রাতেই যে ‘কদর রজনী’-সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক আলেমে দ্বীন ও নিরীক্ষকদের মতে, ২৭ শে রমজান রাতেই শবে কদর। বলাবাহুল্য, আল্লাহর অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বারিধারায় সিক্ত এ মহান রজনীতে যখন তামাম সৃষ্টিকুল করুণাময় আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে অবগাহন করে, তখনও এক শ্রেণীর মানুষের ভাগ্য থাকে অপ্রশস্ত বঞ্চিত তারা দুনিয়া ও আখিরাতের পাথেয় অর্জনে। ওসব দুর্ভাগা লোকদের তালিকায় রয়েছে বে-রোজাদার, গণক, ঈর্শা পরায়ন, দাবা-পাশার খেলোয়াড়, অন্যায়ভাবে শুল্ক আদায়কারী, পরোক্ষ নিন্দাকারী, কৃপণ, হত্যাকারী, গায়ক, বাদক, রেখা টেনে অথবা ফলনামা দেখে ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ণিতকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, পর-স্ত্রীগামী, গর্বসহকারে পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরনেওয়ালা, শত্রুভাবাপন্ন লোক, অত্যাচারী শাসক ও তাদের হোমরাচোমরা, ধোঁকাবাজ ব্যাবসায়ীÑ এ ধরনের আরও যারা মারাত্মক গুনাহের কাজে লিপ্ত। অবশ্য তওবা সহকারে এসব ঘৃণিত পথ ও অভ্যাস থেকে বাকি জীবন সরে দাঁড়াবার ও পরিত্যাগ করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক কান্নাকাটি ও মোনাজাত করলে দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়াপরবশ হন।

বর্ণিত আছে হযরত আয়েশা (রা) আরজ করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (স) কদর রজনীতে কিভাবে দোয়া করব? প্রতিউত্তরে হযরত রাসূলুল্লাহ (স) এভাবে দোয়ার প্রশিক্ষণ দিলেন- (আরবী আলাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন- তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফুআন্নী- হে মহান আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করাকে পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ আমাদের এখানে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, আল্লাহর নবী (স) হযরত আয়েশাকে (রা) কত সুন্দর মোনাজাত শিক্ষা দিয়েছেন। সম্পত্তি নয়, টাকা-পয়সা নয়, শুধু ক্ষমা চাই। কারণ আখিরাতের ব্যাপার এত জটিল ও কঠিন যে, সেখানে ক্ষমা ব্যতীত কোন গতি নেই। যদি আল্লাহর আদালতে ক্ষমা না মিলে এবং আজাবে গ্রেফতার হতে হয়, তবে দুনিয়ার সকল উপকরণ, ধনদৌলত এবং ভোগ-বিলাসিতা কোন কাজে আসবে না। আল্লাহপাক আমাদের এ মহামূল্যবান রজনীতে পূর্ণ গাম্ভীর্যসহকারে ইবাদত বন্দেগী করার তৌফিক দিন।

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৬

০২/০৭/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: