মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একের পর এক সংখ্যালঘু হত্যা!

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৬
  • মাদারীপুরের শিক্ষক রিপন হত্যা চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী খালেদ গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের হত্যা করলে স্বাভাবিক কারণেই ভারত, চীনসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত হবে। আর এতে করে একটা সময় আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হতে বাধ্য হবে। সুদূরপ্রসারি এমন পরিকল্পনা থেকেই দেশে একের পর এক সংখ্যালঘুদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী এবং সরকার বিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় শীর্ষ নেতা জড়িত। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মাদারীপুরের কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যার চেষ্টা করে জঙ্গীরা। রিপন চক্রবর্তী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী খালেদ সাইফুল্লাহ গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তাকে ৫ দিনের রিমা-ে পাঠিয়েছেন ঢাকার সিএমএম আদালত।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ জুন মাদারীপুরে সরকারী নাজিম উদ্দিন কলেজের গণিতের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে বাড়িতে ঢুকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা করে জঙ্গীরা। রিপনের চিৎকারে জনতা এগিয়ে গেলে হত্যাকারীরা পালাতে বাধ্য হয়। পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে প্রিন্স ফাইজুল্লাহ ফাহিম নামের এক হত্যাচেষ্টাকারী। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে মাদারীপুর পুলিশ। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ফাহিমকে নিয়ে মাদারীপুর পুলিশ অভিযানে যায়। অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে ফাহিমের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগেই ফাহিম রিমান্ডে মাদারীপুর পুলিশকে অনেক তথ্য দেয়।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম শুক্রবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ফাহিমের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেফতার হয় খালেদ সাইফুল্লাহকে।

বৃহস্পতিবার রাত দশটায় রাজধানীর ডেমরা থানাধীন মাতুয়াইলের বাদশা মিয়া রোড থেকে খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে জামিল ওরফে আফিফ কাইফি ওরফে পথভোলা পথিককে (২১) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত সাইফুল্লাহ নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবির অন্যতম সংগঠক। সে জেএমবির ঊনপঞ্চাশতম ব্রিগেডের শীর্ষ সংগঠক। সারাদেশে সাইফুল্লাহর সদস্যরা তৎপর রয়েছে।

সাইফুল্লাহর দীর্ঘ দিন ধরেই নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবির অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করছিল। জেএমবিসহ বেশ কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনকে স্বাধীনতা বিরোধীরা মাঠে নামিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গী সংগঠনগুলো বেশি তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। জেএমবির নীতি নির্ধারকদের পরিচালনা করছে যুদ্ধাপরাধীদের দোসর ও তাদের সহযোগীরা। এছাড়া কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় শীর্ষ নেতাও রয়েছে এসব অপতৎপরতার পেছনে। মূলত তারাই তাদের বুদ্ধি ও পরামর্শদাতা।

ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা একটি বিশেষ নীতি গ্রহণ করেছে। সেই নীতির মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘুদের হত্যা করা। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, পীর, মাজারের ফকির, পুরোহিত, সেবায়েতসহ সংখ্যালঘুরা। এদের হত্যার টার্গেট করার অন্যতম কারণ হচ্ছে, হিন্দুদের হত্যা করলে ভারত, বৌদ্ধদের হত্যা করলে চীন, খ্রীস্টানদের হত্যা করলে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারের উপর ক্ষিপ্ত হবে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে একটি পর্যায়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হতে বাধ্য হবে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশে একের পর এক সংখ্যালঘুরা হত্যার টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রিপন চক্রবর্তী হত্যার টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন। তারা অপেক্ষাকৃত সফট টার্গেট করে। কিন্তু টার্গেট সহজ হলেও যাতে এর প্রচার দেশে বিদেশে ব্যাপক হয়। এজন্য তারা বেছে বেছে সহজ ব্যক্তিদের টার্গেট করছে।

মনিরুল ইসলাম জানান, খালেদ সাইফুল্লাহর পিতা কাজী বেলায়েত হোসেন সরকারী নাজিম উদ্দিন কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান। হামলায় আহত রিপন চক্রবর্তীও ওই কলেজেরই একই বিভাগের শিক্ষক। কাজী বেলায়েত হোসেন মাসদেড়েক আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় রিপন চক্রবর্তী কাজী বেলায়েত হোসেনকে দেখতে বাড়িতে যান। ওই সময় খালেদ সাইফুল্লাহ বাড়িতেই ছিল। খালেদ সাইফুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই একজন হিন্দুকে হত্যার টার্গেট নিচ্ছিল।

খালেদ সাইফুল্লাহ তার মোবাইল থেকে জেএমবির একজনের পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় লিখে, পবিত্র মাহে রমজানে অনেকেই সংখ্যালঘু মেরে বেহেস্তের টিকিট নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সে এখনও কাউকে যেহেতু মারতে পারেনি তাই তার বেহেস্তের টিকিট নিশ্চিত হয়নি। কিন্তু কাকে হত্যা করলে ব্যাপক প্রচার পাবে তা স্থির করতে পারছিল না।

আচমকা রিপন চক্রবর্তীকে তাদের বাড়িতে দেখে তাকে হত্যা করলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম হবে এবং বেহেস্তের টিকেট নিশ্চিত হবে বলে সে ধরে নেয়। খালেদ সাইফুল্লাহ মনে করে, রিপন চক্রবর্তী যেহেতু সরকারী কলেজের শিক্ষক স্বাভাবিক কারণেই এ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হবে। এমন ভাবনা থেকেই খালেদ সাইফুল্লাহ রিপন চক্রবর্তীকে ঘটনার মাসখানেক আগে হত্যার টার্গেট করে। সে মোতাবেক রেকি করতে থাকে। এ সময় সে ফাহিমসহ আরও দুইজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। যোগাযোগ মোতাবেক ফাহিম ঢাকা থেকে মাদারীপুরে যায়। এদিকে খালেদ সাইফুল্লাহ মাদারীপুর জেলার পুরান বাজারের কামারপট্টি থেকে ২৭শ’ টাকা দিয়ে ২টি চাপাতি, ১টি চাইনিজ কুড়াল ও ১টি চাকু কিনে রাখে।

এরপর যথারীতি তারা অপারেশনে যায়। খালেদ সাইফুল্লাহ রিপন চক্রবর্তীর পূর্ব পরিচিত বিধায় খালেদ সাইফুল্লাহ রিপন চক্রবর্তীর বাড়িতে না গিয়ে ঘটনাস্থলের খুবই কাছেই অবস্থান করেছিল। হত্যাচেষ্টার আগে ফাহিম তার মোবাইলটি খালেদ সাইফুল্লাহর কাছে দিয়ে যায়। কিন্তু সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সেইসঙ্গে অপারেশনের জন্য শ্রম, মেধা ও টাকা সবই বিফলে যায়। খালেদ সাইফুল্লাহর বিশ্বাস, আখেরাতে সে এরচেয়ে আরও বেশি পাবে। এছাড়া দুনিয়াতে এ রকম কাউকে হত্যা করতে পারলে গণিমতের মালামাল হিসেবে এরচেয়েও অনেক বেশি টাকার মালামাল পাবে।

হত্যা মিশন ব্যর্থ হলে খালেদ ঢাকায় আত্মগোপন করে। রোজার মধ্যেই ঢাকায় সংখ্যালঘু এমনই একজনকে হত্যা করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়ে সরকারকে চাপে রাখতে এবং বেহেস্তের টিকেট নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার কারণে সে পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। রিপন চক্রবর্তী হত্যাচেষ্টায় অংশ নেয়াদের মধ্যে আরও দুইজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ফাহিম দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়নি। ফাহিমের শরীর থেকে যে বুলেট উদ্ধার হয়েছে, তা পুলিশের নয়। ফাহিম নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য ছিল। পরবর্তীতে সে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবিতে যোগ দেয়। জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর হত্যার তালিকায় পুলিশ, পীর, মাজারের খাদেম, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি, মুসলমানদের মধ্যে শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, খালেদ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে রাজধানীর ডেমরা থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া তাকে শিক্ষক হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মাদারীপুর পুলিশ।

ডিবির একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, খালেদ সাইফুল্লাহ কোরআনে হাফেজ। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় খালেদ। ফরিদপুরের মারকায মাদ্রাসায় মাওলানা পড়ছিল। সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলামসহ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৬

০২/০৭/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: